সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন মুক্তিযোদ্ধা মকবুল তালুকদার

মোঃ জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহ করেস্পন্ডেন্ট
টাইম নিউজ বিডি,
২৩ মার্চ, ২০১৭ ২০:৫০:০৩
#

মহান মুক্তিযদ্ধে ঝালকাঠির রয়েছে বর্ণাঢ্য ইতিহাস। সদর উপজেলার নথুল্লাবাদ ইউনিয়নের চাচৈইর গ্রামে একটি সম্মুখ যুদ্ধে এক সাথে প্রায় একশ’র এর কাছা কাছি পাকসেনাদের বধ করার ঘটনা ছিল বিরল। ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের চামটা গ্রামে জন্ম গ্রহন করা মো. মকবুল হোসেন তালুকদার। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাজি রেখে শত্রুদের মোকাবেলায় ঝাপিয়ে পড়েছেন। অংশ নিয়েছিলেন চাচৈইর এর সেই সম্মুখ যুদ্ধে। বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল বাসন্ডা ইউনিয়ন শাখার কমান্ডারের দায়িত্বে রয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে শত্রুদের মোকাবেলায় তিনি সব সময় সামন থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের মত লাখো মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।


কথা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মকবুল হোসেন এর সাথে। তিনি জানান, ২৮ থেকে ২৯ বছর বয়সে আনসার বাহীনিতে চাকুরিরত অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ভাষন শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে যাবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন। স্বাধীনতা ঘোষনার পর পরই স্ত্রী ও তিন মাসের মেয়েকে রেখে যুদ্ধে যান মো. মকবুল হোসেন তালুকদার। স্থানীয় যুবকদের নিয়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষন দিতে শুরু করেন তিনি।


সদর উপজেলার পিপলিতা ও নলছিটি উপজেলার ভৈরবপাশা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করে যুদ্ধের প্রশিক্ষন দিতে শুরু করেন। হঠাৎ একদিন পাকসেনারা সেল মারতে মারতে ঝালকাঠি শহরে প্রবেশ করে ওই সময় তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য সকলে প্রস্তুতি ছিলনা। শত্রু মোকাবেলার জন্য ছিল না কোন অস্ত্র। তাই বাধ্য হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের নিয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে গ্রামে যান তিনি।


এমনি করে চলতে থাকে দিন। প্রশিক্ষনের সাথে সাথে অস্ত্র ও গুলি হাতে পেয়ে যান মকবুল হোসেন তালুকদারসহ অন্যরা। এমনি সময় সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের পেয়ারা বাগানের বিল অঞ্চল থেকে শত্রুদের মোকাবেলার জন্য মো. মকবুল হোসেন তালুকদারসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানো হয় সাতক্ষিরার বর্ডার এলাকায়। সেখান থেকে মো. মকবুল হোসেন তালুকদারসহ প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নৌকা যোগে পাঠানো হয় বরগুনার আমতলী ও তালতলি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। প্রায় পাঁচ দিন সময় নিয়ে ওই এলাকায় যেতে যেতে তাদের আরো ৪০ জনেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা যোগ হন। প্রায় তিন মাস এসব অঞ্চলে সাব সেক্টর কমান্ডার মেহেদী হাসানের অধীনে যুদ্ধ করে শত্রুদের মোকাবেলা করেন।


পরবর্তীতে ১২ নভেম্বর সন্ধ্যার দিকে মো. মকবুল হোসেন তালুকদার ও মালেক সুবেদারসহ কমপক্ষে ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা তালতলী থেকে ঝালকাঠিতে আসেন। তারাসহ প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা সদর উপজেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের সুগন্ধিয়া গ্রামের একটি স্কুল কক্ষে রাত কাটান। পরের দিন ভোর রাতে সকলে মিলে নথুল্লাবাদ ইউনিয়নের চাচৈর গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৩ নভেম্বর সকালে স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নেয়ার খবর পাকবাহীনিদের কাছে পৌছে দেয়। পরে প্রায় দেড় শতাধিক পাকসেনা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরে হামলা করা জন্য এগুতে থাকে। এমন খবর পেয়ে সাব সেক্টর কমান্ডার ব্যারিষ্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তমের নেতৃত্বে মো.মকবুল হোসেন তালুকদারসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধার পাকবাহীনিদের মোকাবেলার জন্য সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়।


সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে চলে আক্রমন পাল্টা আক্রমন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে প্রায় একশত এর কাছা কাছি পাকসেনাদের হত্যা করা সম্ভব হয়। পাকসেনা ও রাজাকার মিলে গুলিবৃদ্ধ হয় কমপক্ষে ছয় জন। নথুল্লাবাদারে খালের পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। এসময় পাকবাহীনিদের গুলিতে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আউয়াল হোসেন। এর পরে শাহজাহান ওমর বীর উত্তমের সাথে রাজাপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেন। এমনি করে ৭১ এর ৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়। এর পরে ঝালকাঠির প্রধান বিডিআর এর সুবেদার মুজিবুল হক এর দেহরক্ষি ছিলেন মো.মকবুল হোসেন তালুকদার। উত্তাল ৭১ এর মার্চ মাসে ঘর থেকে বের হয়ে টানা নভেম্বর মাস পর্যন্ত রনাঙ্গনে ছিলেন মো.মকবুল হোসেন তালুকদার।


এসময় মো.মকবুল হোসেন তালুকদারের পরিবারের সদস্যরা ভেবেছেন তিনি আর বেঁচে নেই। তার স্ত্রী তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে কান্না করতে থাকেন। পরে নভেম্বর মাসের শেষের দিকে বাড়ি লোকদের সাথে দেখা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শত্রুদের বুলেট লাগে বাম হাতে পাঁচ আঙ্গুলে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.মকবুল হোসেন তালুকদার ৭৫ বছর বয়সে বর্তমানে ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডরের দায়িত্বসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিয়ে সময় কাটান।


স্বাধীনতার পর থেকে টানা ৩৫ বছর সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্ত্রী, চার ছেলে, দুই মেয়ে ও নাতী-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। জবীনের শেষ প্রান্তে এসে এখনও স্বপ্ন দেখেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা একদিন বাস্তবায়ন হবে। যেখানে থাকবে না কোন দূর্ণীতি, থাকবে না কোন স্বজন প্রিয়তা। দালালরা এদেশের যেন কোন ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য প্রতিটি সচেতন নাগরিকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।


জারিফ


 

Print