তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের ভাগ আছে, এটা দিতে হবে

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০৭ এপ্রিল, ২০১৭ ১৭:১৩:০৮
#

অধীর রঞ্জন চৌধুরী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ও ভারতীয় পার্লামেন্টে (লোকসভা) মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। একাধিকবার ছিলেন বিধানসভা ও রাজ্যসভার সদস্য।


২০১২-১৪ সময়কালে ভারতের রেলওয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি প্রশ্নে বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার রাজনীতিবিদদের একজন অধীর চৌধুরী।
৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় বহরমপুরে জেলা কংগ্রেস কার্যালয়ে তিস্তা প্রসঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশের একটি বাংলা পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দেন অধীর চৈাধুরী।। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান আনু মোস্তফা।


প্রশ্ন : সম্প্রতি একাধিক ফোরামে আপনি তিস্তা চুক্তি প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন, এটা কি আপনার রাজনৈতিক অবস্থান?


অধীর চৌধুরী : এটা আমার রাজনৈতিক, দলীয় এবং একজন ভারতবাসী হিসেবে নৈতিক অবস্থান বলতে পারেন। এটাকে ভিন্নভাবে নেয়া বা ভাবার কোনো কারণ নেই। একজন প্রতিবেশী হিসেবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তিস্তার জলে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ আছে, এই ভাগ তাদের দিতে হবে। এতদিন দেয়া হয়নি সেটাই বরং আমরা ঠিক করিনি। বাংলাদেশ তিস্তার ভাটির দেশ। তিস্তার জল পাওয়ার অধিকার তাদের আছে। আমরা জল আটকে রাখলে তারা পাবে কোথায়? বাংলাদেশ আমাদের নিকট প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে কষ্টের মধ্যে রেখে আমরা ভালো থাকব- এমন স্বার্থপর ভাবনাকে আমরা সমর্থন করি না। মমতা ব্যানার্জির উচিত তিস্তা চুক্তিতে দ্রুত রাজ্যের সম্মতি জানিয়ে চুক্তি সম্পাদনে ভূমিকা রাখা।


প্রশ্ন : মমতা এখন বলছেন তাকে অন্ধকারে রেখে চুক্তি করার চেষ্টা করা হচ্ছে- বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?


অধীর চৌধুরী : এ অভিযোগ নিছকই একটি অজুহাত বলে আমরা মনে করছি। উনি (মমতা) একেক সময় একেক কারণের কথা বলেন, একেক সময় একেক অজুহাত খাড়া করেন। এটা করেন চুক্তিটি যাতে না হতে পারে সে জন্য। তবে এর পেছনে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে তার দলীয় রাজনীতির কু-প্রভাবের কথা অনেকেই বলেন। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থ ভাগাভাগি নিয়ে দরকষাকষি ও টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। হালে যুক্ত হয়েছে সারদা ও নারদ-কাণ্ড। এ দুটি ইস্যুতে মোদি সরকারের কাছ থেকে কিছু ছাড় চান উনি।


এসব অভ্যন্তরীণ কারণ তিস্তা চুক্তিতে বড় প্রভাব ফেলছে, এমনটা মনে করে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সচেতন মহল। আমরাও মনে করি। মমতা ব্যানার্জি নিজেও ভালো করে জানেন যে, তিস্তার জলের ভাগ বাংলাদেশকে দিলে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের বিশেষ ক্ষতি হবে না। এটা জেনেও তিনি তিস্তা চুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে ভারতের বিদেশনীতিতে টানাপোড়েন হচ্ছে, যা হওয়ার কথা নয়।


প্রশ্ন : মমতা ব্যানার্জি বলছেন প্রস্তাবিত চুক্তির বিস্তারিত তথ্য তার কাছে নেই, তাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে, এ অভিযোগের যথার্থতা কতটুকু?


অধীর চৌধুরী : আমার যতটুকু মনে পড়ে ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তির জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। ২০১১ সালে প্রথমে সম্মতি দিয়েও ভারতের ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকা সফরে যাননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। আমি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকা যাই। তিস্তা চুক্তিটি তখনই হওয়ার কথা চূড়ান্ত ছিল। বাংলাদেশের মানুষ চুক্তিটির আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। সেটা সম্ভব হয়নি মমতাদি’র প্রবল বিরোধিতা ও ঢাকা সফর বাতিল করার জন্য। বাংলাদেশের মানুষ ব্যথিত হয়েছিল, আমরাও ব্যথিত হয়েছিলাম।


পরে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী হিসেবে মমতাদি ঢাকা যান। কিন্তু তখনও তিনি রাজি হননি চুক্তিটির আলোচনায় যেতে। এখন আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন দিল্লি আসছেন এবং তিস্তা চুক্তির জন্য বাংলাদেশ-ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তিনি বলছেন তার কাছে তথ্য নেই। তার কাছে তথ্য না থাকলে সেটা তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চাইতে পারেন। রাজ্য প্রশাসনে তিস্তার জলের সব তথ্যই আছে। এটা নিছকই অজুহাত ছাড়া কিছু নয়। মমতাদি এখন তিস্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তার রাজনীতিকে চাঙ্গা করার কৌশল নিচ্ছেন।


প্রশ্ন : তিস্তা চুক্তি ভেস্তে গেলে দু’দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে?


অধীর চৌধুরী : বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্কটা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কটা আরও আত্মিক হয়েছে। পশ্চিম বাংলার মানুষ এখন অনেক কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কথা গভীরভাবে ভাবে। ভাষা এক সংস্কৃতি এক। সে ক্ষেত্রে এর ফলে দু’দেশের সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হবে না- এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবে শুধু একজনের জন্য বাংলাদেশকে একটা অধিকার থেকে বঞ্চিত করাটাকে ভারতবর্ষের মানুষ সমর্থন করে না। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখি, তিস্তা চুক্তি হবে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া পূরণ হবে। বাংলাদেশের কৃষক ভাইয়েরা চাষের জন্য জল পাবে। জেলেরা জলে নৌকা ভাসাতে পারবে।


ভারতের মানুষ ভালো করেই জানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গি মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে এমন শক্তিগুলোকে বাংলাদেশে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না- এটা ভারতের জনগণ গভীরভাবে বিশ্বাস করে। পারস্পরিক স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন হলে চীন এ সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারে। চীন শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। চীন চাইছে ভারতকে এ অঞ্চলে একঘরে করতে। এ ক্ষেত্রে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির কারণে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হোক- এটা আমরাও চাই না। আমরা চাই শেখ হাসিনার আসন্ন দিল্লি সফরেই চুক্তিটি আলোর মুখ দেখুক।


প্রশ্ন : তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আপনার দল কংগ্রেস এবং ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনোভাব কেমন?


অধীর চৌধুরী : মমতা ব্যানার্জি ছাড়া ভারতের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা মহল এখন পর্যন্ত নেতিবাচক কোনো মনোভাব দেখায়নি। বিষেজ্ঞরাও ইতিবাচক মনোভাবে মতামত দিয়ে চুক্তির পক্ষেই বলছেন। আমি মনে করি- ভারতবর্ষের মানুষ যারা বাংলাদেশের মানুষ, তাদের অগ্রগতি, অর্থনীতি, সাফল্যের খোঁজখবর রাখেন তারা এক বাক্যে চান চুক্তিটি হয়ে যাক। বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দেয়া হোক।
প্রশ্ন : মমতা ব্যানার্জি দাবি করছেন বাংলাদেশকে পানি দিলে পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা অববাহিকার কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে- দাবিটির যথার্থতা কতটুকু?


অধীর চৌধুরী : আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছি, তাতে বাংলাদেশকে তিস্তার পানির একটা অংশ দিলে তাতে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের বিশেষ ক্ষতি হবে না। তিস্তা পাহাড় থেকে বেরিয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ঢুকেছে। ঢাকা সফরের সময় তিস্তার বাংলাদেশ অংশের করুণ পরিস্থিতি নিয়ে কিছু সংবাদচিত্র ও প্রতিবেদন আমার নজরে পড়ে। নদীটির বাংলাদেশ অংশের শুকনো মরুময় চেহারা দেখে খারাপই লেগেছিল। অন্তত তিস্তার কিছু জল বাংলাদেশকে দিলেও পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা নেই- এটা আমাদের মত। বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন ৪০:৪০ অনুপাতে দুই দেশ পাবে আর ২০ ভাগ জল নদী প্রবাহে থাকবে। এর কমবেশিও হতে পারে তবে সেটা না দেয়ার পক্ষে আমরা নই।


প্রশ্ন : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতিকে কীভাবে দেখছেন?


অধীর চৌধুরী : বাংলাদেশের অগ্রগতিটা এখন আমরা নানাভাবে টের পাই। কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নতি করছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অগ্রগতি বিস্ময়কর। আমরা চাই পাশাপাশি দুই বাংলার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কটা অটুট থাকুক।


প্রশ্ন : আপনি একবার বাংলাদেশ সফর করেছেন, ব্যক্তিগত অনুভূতি কেমন?


অধীর চৌধুরী : বাংলাদেশের মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ। এত আন্তরিকতা আমি আগে কোথাও দেখিনি। ২০১১-তে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ঢাকায় গিয়ে ধানমণ্ডিতে যাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাড়িটিতে প্রয়াত হয়েছিলেন সেটা ঘুরে দেখেছিলাম।


বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের ব্যথিত করে। পরে হাসিনাদি পরিবারের সদস্যদের মতো করে নিজের হাতে তুলে তুলে আমাদের খাইয়েছিলেন, এই স্মৃতিটা জ্বলজ্বল করছে। তখনই মনে হয়েছে হাসিনাদি একজন অসাধারণ মানুষ, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর)


টাইমনিউজবিডি.নেট/ মাহমুদ

Print