উর্দুভাষীরা কেন বাংলাদেশের সমাজে মিশতে পারেনি?

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
১৮ আগস্ট, ২০১৭ ০৮:৩৫:২০
#

ঢাকা থেকে ২০০ কি.মি.দূরে উত্তরের ছোট শহর সৈয়দপুর।


সকাল নয়টা। হাতিখানা কায়েম ক্যাম্প। সকালের প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত নারী-পুরুষ-শিশু। সরু গলির দুইপাশে ছোট ছোট ঘরে এক- একটি পরিবারের বাস।


একটি মুদি দোকানের টিভিতে চলছে পাকিস্তানি একটি চ্যানেল। এখানকার সবাই কথা বলছেন উর্দুতে।


সৈয়দপুর শহরে হাতিখানা ক্যাম্পসহ ২২টি ক্যাম্প রয়েছে যেখানে উর্দুভাষীরা বাস করেন। স্থানীয়ভাবে তারা বিহারী নামে পরিচিত।


বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে বিহারীরা রয়েছেন তার মধ্যে বেশিরভাগের বসবাস সৈয়দপুরে।


১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই আলাদা রাষ্ট্র তৈরি হলে-উর্দুভাষী অনেকে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।


এদের বেশির ভাগ আসেন ভারতের বিহার রাজ্য থেকে। তেমনি একজন আব্দুল কাইয়ুম খান।


মি. খান বলছিলেন "ভারতে দাঙ্গা শুরু হলে আমরা এপারে চলে আসি। আমরা ছিলাম মুসলমান, উর্দু আমাদের ভাষা। পাকিস্তানকে নিজের দেশ মনে করে চলে আসি এইখানে। আমরা সব সময় পাকিস্তানেই যেতে চেয়েছি"।


আব্দুল কাইয়ুম খানের মত কয়েক লক্ষ মানুষ তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন।


তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের করা যাটের দশকের শেষাংশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে পূর্ব পাকিস্তানে ২০ লক্ষ উর্দুভাষী আসেন।


'শেকড়ের সন্ধানে গিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গে'


পূর্ব পাকিস্তানের স্থানীয় মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও ছিল। ফলে সব মিলিয়ে এই কয়েক লক্ষ লোকের আগমন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের কাছে আগন্তুকের মত ছিল।


আবার অন্যদিকে উর্দুভাষীরাও যুগের পর যুগ ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং এখনকার বাংলাদেশে বাস করলেও ঠিক বাংলাদেশের মুল সমাজে মিশতে পারেননি। এর কারণ কি?


সৈয়দপুরের আরেকটি ক্যাম্প-বালুরেস ক্যাম্প। ৭০টা পরিবারের বাস এখানে। উর্দুভাষী মুহাম্মদ এরফানের জন্ম বাংলাদেশে।


তিনি বলছিলেন "বিহারি বলেই আমাদের আলাদা করে রাখা হয়, আমরা কেন ক্যাম্পে থাকবো? আমার বাবা-মা না হয় বিহারী ছিল কিন্তু আমার তো জন্ম বাংলাদেশে তাহলে কেন এই বৈষম্য? আমার নিজেরো প্রশ্ন এটাই"।


বিহারীদের অনেকেই মনে করেন তাদের প্রতি বছরের পর বছর বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছে বাংলাদেশের মানুষ। তবে স্থানীয় বাঙ্গালীদের রয়েছে অন্য যুক্তি।


আমিনুল হকের স্থানীয় সাংবাদিক, সৈয়দপুরের বাসিন্দা তিনি। বলছিলেন প্রচন্ডভাবে এই বিভেদ লক্ষ করা যায়।


মি. হকের মতে "দীর্ঘদিন তাদের সাথে উঠা-বসা করে মনে হয়েছে-তারা মনে করে বাংলাদেশ সৃষ্টি সঠিক ছিল না। তাছাড়া ভাষাটা একটা বড় ব্যাপার। তারা সব সময় পাকিস্তান যেতে চেয়েছে। যারা বাংলাদেশকে মানে না, তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কিভাবে গড়ে উঠবে"।


১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পরেই যে সমস্যাটা প্রধান হয় সেটা হল পূর্ব পাকিস্তানে আসা উর্দুভাষীদের- মন-মানসিকতা।


" বাংলাদেশে ভারতীয় অভিবাসী" নামে একটি বিশ্লেষণধর্মী বইতে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলা ভাষা কে তারা আপন করে নিতে পারেন নি। ভাষা ছাড়াও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পার্থক্যের কারণে তারা স্থানীয় জনতা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেন।


বইটির লেখক এবং প্রবীণ উর্দু কবি আহমদ ইলিয়াসের সাথে ঢাকায় আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম।


তিনি বলছিলেন "উর্দুভাষীদের অনেকেই এক ধরণের শ্রেষ্ঠত্বমন্যতায় ভুগছিলেন তাদের দক্ষতা,শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে। এর ফলে আর্থিক বা সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেনি যা পড়ে বিহারী বা অবাঙ্গালীদের সাথে বাঙ্গালী জনসাধারণ থেকে তাদের পৃথক করে তোলে"।


শুরুটা সেখান থেকে হলেও পরে এর একটা রাজনৈতিক রূপ পায়। উর্দুভাষী মানুষেরা বেশিরভাগই চেয়েছিল পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের নাগরিক হতে।


তাঁদের একটি অংশ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। আর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানে তাদের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য তাদেরকে তথ্যদাতা বা সহকারী হিসেবে অনেকটা ব্যবহার করে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলছিলেন ১৯৭১ সালে বিহারীদের কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাঙ্গালীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে যেটাতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে।


"১৯৭১ সালে পরিষ্কার বিভেদ তৈরি হয়। কিছু কিছু উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের 'কোলাবরেটর' হিসেবে যে ভাবে কাজ করে সেটাকে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। স্বাধীনতার পরে তাদেরকে এক-পাক্ষিক ভাবে দেখা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে জন্ম নেয়া পরের প্রজন্ম এটাতে জড়িত ছিল না। কিন্তু তাদেরকেও এক কাতারে ফেলা হয়েছে। যেখান থেকে আজ পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারেনি" বলছিলেন মেজবান কামাল।


মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বিহারী জনগোষ্ঠীর একাংশের বাঙ্গালী-বিরোধী ভূমিকা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়।


এছাড়া বিহারীদের কর্মকাণ্ড বাঙ্গালীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পরে। ফলাফল হয় ভয়াবহ।


'রেপ অফ বাংলাদেশ' বইএর লেখক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী "হাজার হাজার মুসলিম যারা বিহার থেকে আগত তাদের নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল। চট্টগ্রাম, খুলনা ও যশোরের মত বড় শহরগুলোতে ২০ হাজারের বেশি অবাঙ্গালীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল"।


তবে ঠিক কি পরিমাণ বিহারী জনগোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় তার সঠিক কোন হিসাব পাওয়া যায় নি।


ফলে স্বাধীনতা উত্তর সময়কালে বিহারী ক্যাম্পগুলো উচ্ছেদের ব্যাপক চেষ্টা শুরু করে বাংলাদেশ। ততদিনে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার বিশ্বাস,আস্থা তলানীতে যেয়ে ঠেকেছে।


বর্তমানে বাংলাদেশে তেরোটা ভিন্ন-ভিন্ন অঞ্চলের ১১৬টা ক্যাম্পে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখের মতো উর্দুভাষী মানুষ বসবাস করছে।


সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকার উর্দুভাষীদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তাতে করে কি সমস্যার সমাধান হয়েছে?


ঢাকায় মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরে রয়েছে দুটি বড় ক্যাম্প।


যেখানে প্রায় তাদেরকে উচ্ছেদের অভিযোগ উঠে। উর্দুভাষী একজন মোহাম্মদ নাদিম বলছিলেন "আমরা এদেশের মানুষের সাথে থাকতে চায় কিন্তু শিক্ষা, চাকরি থেকে শুরু করে সব স্থানে আমাদের সাথে বৈষম্য করা হয়। এখনো কোন কিছুই হলেই বিহারীর বাচ্চা বলে গালি শুনতে হয়"।


বাঙ্গালী সমাজে মিশতে না পাড়ার ক্ষেত্রে উর্দুভাষী বিহারীদের রয়েছে তাদের নিজস্ব যুক্তি।


আর বাঙ্গালীদের রয়েছে তাদের ব্যাখ্যা। তবে এই যুক্তিতর্ক থেকে একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে- ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা বড় প্রভাব এখনো কাজ করছে দুই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে।খবর বিবিসি।


এমবি  

Print