এখন কেবলই ভয় আর আতঙ্ক

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
টাইম নিউজ বিডি,
১০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৮:২৫:৪৬
#

এখন কেবলই ভয় আর আতঙ্ক। ঘরে থাকতে ভয়। রাস্তায় বের হতে ভয়। দোকানপাটে যেতে ভয়। ভোরবেলা হাঁটতে বের হতে আতঙ্ক। সন্তান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলে ভয় কিংবা কর্মস্থলে গেলেও ভয়। সে ভীতি শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতরে যে আছে, তাকে কেউ এসে তুলে নেয় না! বলবে না তো যে, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক, আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।


তার পর কেউ স্বীকার করবে না, কোন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে গেল। থানা র‌্যাব পুলিশ করতে করতে অভিভাবকেরা শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েন। চোখের পানিতে বুক ভাসান। কিন্তু সন্তান আর ফিরে আসে না। কালেভদ্রে যদি কেউ আসে, এসে আর মুখ খুলতে সাহস পায় না। কোথায় গিয়েছিল, কে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, কী তাদের আচরণ ছিল, কোনো কিছুই প্রকাশ করতে পারে না।


কারণ তাতেও ভয়। শহরে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে হাইপ্রোফাইল লোকেরা কেউই এর আওতামুক্ত নন। গ্রামে রাতে গিয়ে বাড়িঘরে হঠাৎ হানা দেয়া, তারপর তুলে নিয়ে যাওয়া, এরপর কখনো ক্রসফায়ার, কখনো বেহদিস। ভাগ্যজোরে কেউ কেউ ফিরে আসে হঠাৎ।


কে কাকে টার্গেট করেছে, সরকারের বাহিনী কাকে ‘সন্ত্রাসী’ ভাবছে, কেউ তা জানতে পারে না। হঠাৎ একদিন কর্মস্থল থেকে কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়ে যায়। তেমনি খুনের ঘটনাও ঘটে। অফিসে ঢুকে দিন-দুপুরে দুর্বৃত্তরা খুন করে চলে যায় বুক ফুলিয়ে। কেউ কেউ মুখোশ পরে আসে, কেউ বা মুখোশ ছাড়া। কিনারা হয় এর খুব সামান্য। কে কোথায় কাকে কখন তুলে নিয়ে যাবে, সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আতঙ্কিত হয়ে থাকি, আবার খবর পাই কী না। কিছু কিছু ঘটনায় স্তম্ভিত হতে হয়। এরকম পরিস্থিতিতে মানুষ যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হয়, কখনো কখনো দেখা যায়- তারাই দল বেঁধে কাউকে অপহরণ করছে, কাউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, কাউকে চাঁদা না দিলে এমন কি ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হচ্ছে। মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। কিন্তু বাধ্য হয়ে এই অসহায় মানুষ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন আইনশৃঙ্খলার আর অবকাশ কিছুই থাকে না। সম্প্রতি গুমের ঘটনা বেড়েছে। তেমনি বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের চাঁদাবাজি বা অপহরণের সময় গণধোলাই খাওয়ার মতো ঘটনাও, যা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। এ কথা সত্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুরোটাই এরকম অসৎ কাজে জড়িত নয়। কিন্তু উপযুক্ত বিচার না হওয়ায় তাদের অসৎ লোকদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখন এক প্রকার আতঙ্কেরই নাম।


সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কখনো কখনো এমন বক্তব্য দিয়ে বসেন, যা ভুক্তভোগী পরিবারের লোককে আরো বেশি মর্মাহত ও আশাহত করে তোলে। যখন তারা বলেন, অপহৃত ব্যক্তি বা গুম হওয়া লোক নিজেই আত্মগোপন করেছেন, কিংবা পুলিশের পক্ষে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়; এ ধরনের বক্তব্য দায়িত্বহীন। কিন্তু পরিবার তো জানে, আত্মগোপন করেছে নাকি গুম হয়ে গেছে, নাকি কেউ তুলে নিয়ে গেছে। সে কথার কোনো মূল্য থাকে না। এসব বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর আস্থা আরো কমে আসে। এ কথা এখন সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর অনেকেই বলতে শুরু করেছেন।


এর সর্বশেষ শিকার সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। ২০০৯ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। স্ত্রী মারা গেছেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন মারুফ জামান। ধানমন্ডির পৈতৃক বাড়িতে থাকেন তিনি আর তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মেয়ে। আরেক মেয়ে বেলজিয়ামে পিএইচডি করছেন। বাসায় আছেন দু’জন কাজের লোক। এই তার সংসার। থাকেন চুপচাপই। পড়ে এবং টিভি দেখে তার সময় কাটে। ‘বাইরে’ বলতে, যান শুধু মসজিদে। একই ভবনের অপর ফ্ল্যাটে থাকেন তার ভাই। গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছোট মেয়েকে আনতে বিমানবন্দরের উদ্দেশে নিজেই গাড়ি চালিয়ে যাত্রা করেছিলেন দুর্ভাগা মারুফ জামান। তার ছোট মেয়ে বড় বোনের সাথে দেখা করতে বেলজিয়াম গিয়েছিল। তার ঢাকায় ফিরে আসার কথা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়।


কিন্তু মারুফ বিমানবন্দরে পৌঁছেননি। মাঝপথেই কী যে ঘটে গেল, বোঝা দায়। রাত ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে অজ্ঞাত নাম্বার থেকে তার বাসার ল্যান্ডফোন বেজে ওঠে। কাজের মেয়ে সে ফোন ধরে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতেই তা কেটে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে আবারো ল্যান্ডফোনটি বাজে। ফোন করেছিলেন মারুফ জামানই। তার কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন কাজের মেয়ে। মারুফ তাকে বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় কম্পিউটার নিতে লোক যাবে। তাদের কম্পিউটার দিয়ে দাও।’ ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনজন সুঠামদেহী সুদর্শন ফর্সা লম্বা তরুণ তার বাসার গেটে হাজির হন। দারোয়ানকে বলেন, ‘মারুফ জামানের বাসায় যাবো, কথা হয়েছে।’ দারোয়ান ইন্টারকমে বাসায় জিজ্ঞাসা করেন, তখন তাদের আসতে বলা হয়। তারা এসে ল্যাপটপ, ডেস্ক টপের হার্ডডিস্ক, তার ক্যামেরা নিয়ে যায় এবং ঘরের বিভিন্ন ড্রয়ার তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখে। মিনিট দশেকের মধ্যে তারা বেরিয়েও যায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, তাদের তিনজনেরই মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ পরা ছিল এবং ক্যামেরার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। ফলে তাদের স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।


ছোট মেয়ে বিমানবন্দরে এসে বাবাকে ফোন করেন। কিন্তু মারুফ জামানের সেল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ছিল দক্ষিণখান এলাকায়। অর্থাৎ বিমানবন্দরের আশপাশে। তার গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় খিলক্ষেতের ৩০০ ফুট রাস্তার ধারে পার্ক করা। গাড়ি কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করেনি, সেরকম কোনো দাগ নেই। ভেতরে শুধু পাওয়া গেছে গাড়ির কাগজপত্র। আর কিছু নয়। এটাও বিমানবন্দরের আশপাশেই।


কিন্তু কোথায় গেলেন মারুফ জামান? এটা তো খুব স্পষ্ট যে, বাসা থেকেই কেউ তাকে ফলো করছিল এবং বিষয়টি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। এটা স্পষ্ট যে, আগে থেকেই ঠিক করা ছিলÑ ফলো করে কেউ তার পথ আটকাবে, তাকে তুলে নেবে এবং তাকে দিয়ে তার বাসায় ফোন করাবে যে, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক এগুলো দিয়ে দেয়া হোক। কাছেই লোক মোতায়েন ছিল। তারা এসে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, ক্যামেরা এসব নিয়ে চলে যাবে। হ্যাঁ, তারা কোনো ডাকাতি করেনি, কাউকে মারধরও করেনি, নীরবে সব নিয়ে চলে গেছে। এতে খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, ওরা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক? যদিও এ পর্যন্ত কোনো বাহিনীই স্বীকার করেনি যে, তারা মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গেছে। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন না। বাসাতেই থাকতেন বেশি। তার ভাই জানিয়েছেন, তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তারা কিছুই বলতে পারছেন না।


পুলিশের ভাষ্য হচ্ছে, তারা কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করেন। অন্যান্য সংস্থারও নিয়ম তাই। কিন্তু অন্য কেউ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেলে পুলিশকে অবহিত করার কথা থাকলেও সবসময় সেটা করা হয় না। ফলে পুলিশ অন্ধকারেই থাকে। এটাও কোনো গ্রহণযোগ্য বক্তব্য নয়। পুলিশ বা যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক হোক, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিলে তাকে তো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হবে অবশ্যই। কিন্তু সেরকম ঘটনা কমই ঘটে। এর আগে যারা ফিরে এসেছেন, তারা যেসব বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে দেখা যায়, একই ধরনের কক্ষে একই ধরনের পরিবেশে তাদের দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়ে ছিল। চোখ-হাত-পা বাঁধা। তবে তাদের খেতেও দেয়া হয়েছে। কোথায় এরকম জায়গা, যেখানে এভাবে একই পদ্ধতিতে লোকজনকে অবৈধভাবে আটকে রাখা যায়?


গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন ১৩ জন। তাদের মধ্যে আটজন ফিরে এসেছেন। বাকি পাঁচজনের আজো কোনো সন্ধান মেলেনি। যে পাঁচজনের সন্ধান মেলেনি তারা হলেন- নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মোবাশ্বার হাসান সিজার, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আমিনুর রহমান এবং কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইশরাক আর সাংবাদিক উৎপল দাস। এদের হারানোর বেদনা যে কত গভীর সেটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই জানে। মাঝে মাঝে তারা সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন, বলেনÑ তার স্বজনের লাশটি হলেও ফিরিয়ে দেয়া হোক। সেখানে মা কাঁদেন, বাবা কাঁদেন, শিশুসন্তান কাঁদে। এই জনপদ থেকে তবে কি হাসির বিলুপ্তি ঘটবে?


এরকম একেকটি ঘটনা ঘটে। আর সমাজের ভেতরে নতুন করে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ জানে না, কে কোথায় ওঁৎ পেতে বসে আছে, কাকে তুলে নেয়ার জন্য। যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে আইনি প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার বিচার হতে পারে। কিন্তু একটি লোককে নিখোঁজ করে দেয়ার অর্থ কার্যত আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া। এটা এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। আর সে অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হওয়া জরুরি।


বোঝার তো কোনো উপায় নেই যে, কে এই অপরাধ ঘটাল? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক, নাকি সাধারণ দুষ্কৃতকারী? সাধারণত দুষ্ককৃতকারীদের ক্ষেত্রে যা হয় তা হলো তারা মুক্তিপণ দাবি করে। তাদের ভিকটিম বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয় শিশুরা। মুক্তিপণ না পেয়ে নির্মমভাবে শিশুহত্যা যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মারুফ জামানসহ যাদের কথা আমরা উল্লেখ করলাম- তাদের কারো জন্যই কোনো মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি। অর্থাৎ এর পেছনে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে। সে উদ্দেশ্য গোপন না করে প্রকাশ করাই উচিত। আমরা নাগরিকেরা ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে ঘরে থাকতে কিংবা ঘর থেকে বের হতে চাই না। আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিরাপদে মধ্যরাতে, দিন-দুপুরে ঘরে ফিরতে চাই, ঘর থেকে বের হতে চাই। সেটা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সে দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। আমরা চাই, মারুফ জামান, মোবাশ্বার হাসান- তারও আগে চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী মুখের শত শত পরিবারে শোকের যে হাহাকার, যে দীর্ঘশ্বাস উঠেছে সেই দীর্ঘশ্বাস বন্ধ করা হোক। অবিলম্বে গুম হওয়া বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হোক। মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসুক।


লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক- ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)


এমবি  

Print