যে কারণে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে ঢাকাবাসী

ডাঃ জাহিদুল বারী
টাইম নিউজ বিডি,
০৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৮:০৫:০৮
#

বিশ্বের অন্যতম বড় এই মেগাসিটি এখন ছেয়েগেছে সুউচ্চ অট্টালিকা, সারিসারি দোকানপাট, অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা এবং লক্ষ লক্ষ গাড়িতে। বলার মত, দেখার মত ও করার মত আরো অনেক কিছুই আছে ঢাকা শহরে। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো শোনার মত এখন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়না ঢাকাতে।  শহরের মানুষ এখন যা শুনছে বা শুনতে বাধ্য হচ্ছে তার কোনটাই আদৌ শ্রুতিমধুর নয়; বরং প্রায় সবই শব্দ দূষণের পর্যায়ে চলে গেছে।  যেমন- ঘরে বসে টেলিভিশন দেখা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে যানবাহনের অযাচিত হর্ণ, লাউড স্পীকারে গান বাজনা, মাইকে প্রচারণা, মিছিল, সভা সমাবেশ, নানাবিধ যান্ত্রিক শব্দ প্রভৃতি সবই আমাদের কানে অসহনীয় শ্রবনাভূতির সৃষ্টি করে।


এটি যে কেবল ঢাকা শহরে হয় তা নয়; বরং দেশের অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোর চিত্রও প্রায় একই রকম। আবার আরো বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে এটি শুধু বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়; বরং বিশ্বের আরো অনেক অনুন্নত দেশেই শব্দদূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঘোষিত মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণসমূহের একটি হলো শব্দদূষণ।


শব্দ এক প্রকার শক্তি যা আমাদের শরীরে বিশেষ স্নায়ুবিক প্রক্রিয়ায় কানে শ্রবণের অনুভূতির সৃষ্টি করে। তবে সকল শব্দই আমরা শুনতে পাইনা।  শ্রাব্যতার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে যে শব্দগুলো থাকে কেবল সেগুলোই আমরা শুনতে পাই। সাধারণত: ৭০-৮০ db পর্যন্ত শব্দ পূর্ণবয়স্ক মানুষদের তেমন একটা ক্ষতি করে না। ৯০ db এর উপরের যে কোন শব্দই  বৈজ্ঞানিক ভাবে  Noise বা শব্দদুষন হিসেবে বিবেচিত। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য আমরা এখন রাস্তায় বেরুলেই যে শব্দগুলো শুনতে পাই তার প্রায় সবই ১২০ db এর উপরে! তাহলে এবার এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে শব্দবাজি করছি তাতে আমরা আমাদের জন্য কেবলই ক্ষতি ডেকে আনছি।


এবার আসা যাক এই শব্দবাজি তথা শব্দদূষণ আমাদের শরীরে কি কি ক্ষতি করে তার একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য বিবরণের দিকে। ৯০ db শব্দ নিয়মিত শ্রবণ করলে আমাদের কানের অভ্যন্তরীণ শব্দ পরিবহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের কানের বিভিন্ন টিস্যু নষ্ট হয়ে যায় এবং আরো তীব্র শব্দ শুনলে এক পর্যায়ে মানুষ শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে বেশি বেশি শব্দ শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমাদের স্নায়ু সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে যার ফলে শরীরের অন্যান্য তন্ত্র বা সিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে  শরীরের নার্ভাস সিস্টেম, কার্ডিও ভাস্কুলার সিস্টেম, রেসপিরেটরী সিস্টেম, গ্যাস্ট্রো ইন্টেস্টিনাল সিস্টেম প্রভৃতি খুব বেশি প্রভাবিত হয়। শব্দের তীব্রতা বাড়লে মানুষের রক্ত চাপ বেড়ে যায়।


যুক্তরাষ্টের বিখ্যাত টেক্সাস হার্ট ইন্সটিটিউট তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে নয়েজ বা শব্দদূষণ মানুষের হার্টের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যহত করে এবং আইএইচডি(IHD)  নামক জটিল রোগের সৃষ্টি করে যা সময়ের ব্যবধানে হার্ট ও কিডনী নষ্ট করে ফেলে। সেই গবেষনায় আরো বলা হয় উচ্চ মাত্রায় শব্দ মানুষের হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ শব্দ মানুষের ঘুমের অভ্যাসকে পরিবর্তন করে; বাড়িতে ও অফিসে কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। এর ফলে  মানুষের মধ্যে স্ট্রেস বাড়ে ও বিষন্নতার সৃষ্টি হয়। এই সকল মানসিক রোগ মানুষকে কর্ম ও সমাজ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।


আমেরিকান একাডেমী অব নিউরোলজীর তথ্যমতে যারা প্রতিদিন উচ্চশব্দের মুখোমুখি হয় তাদের ৪২ শতাংশ  মানুষ  মাইেগ্রেনে ভোগেন।  অন্যদিকে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় বলা হয় উচ্চশব্দে কাজ করে অভ্যস্ত মানুষেরা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন এবং এদের ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। শব্দদূষণের ফলে মানুষের হজমে ব্যাঘাত  ঘটে এবং পাকস্থলীতে আলসারের সৃষ্টি হয়। শব্দদূষণ মানুষের  মেজাজ খিটখিটে করে তোলে; সহনশীলতা লোপ পায়; স্নায়ুবিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।


বাচ্চাদের উপরও শব্দ দূষণের অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে যা শিশুর মানসিক ও শারীরিক বেড়ে ওঠাকে মারাত্মক বাধাগ্রস্থ করে। এটি বাচ্চাদের শেখার ক্ষমতা ও আগ্রহকে কমিয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় গর্ভস্থ ভ্রুনের ডেভেলপমেন্টাল এনোম্যালির অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চ শব্দে দীর্ঘদিন থাকা।  উচ্চ শব্দের কারণে গর্ভের বাচ্চার  হৃদরোগ ও স্নায়ুরোগ পর্যন্ত হতে পারে। এরফলে বাচ্চারা পরবর্তিতে বোকা ও নির্বুদ্ধি হয়। এমনকি এরকম বাচ্চারা জন্মের পরে শ্বাস কষ্টজনিত সমস্যায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।


শব্দদূষণ নিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অত্যন্ত সচেতনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, গ্রেটব্রিটেন, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানী, ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশেই শব্দদূষণ প্রতিরোধে শক্ত আইন ও এর কার্যকর বাস্তবায়ন রয়েছে। এছাড়া আরো অনেক উন্নয়নশীল দেশেই শব্দদূষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন রয়েছে। অপ্রয়োজনে গাড়ীর হর্ণ বাজালে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় পর্যন্ত ঐসব দেশে।


পক্ষান্তরে বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বিপরীত।  শব্দদূষণ যে আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এটিই তো এদেশের বেশিরভাগ মানুষের নিকট অজানা! আরো স্পষ্ট করে বললে শব্দও যে দূষণ করতে পারে সেটাও হয়তো আমাদের দেশের অনেকেই জানে না! আর আইন তো কাগজ কলমের ব্যাপার মাত্র! সেটা কি আবার মানতে হবে; বাংলাদেশ বলে কথা!! নাহ্! বাংলাদশেও আইন রয়েছে, আইনের  প্রয়োগও রয়েছে। তবে পরিবেশ এবং  জনস্বাস্থ্য বিষয়ক আইনগুলো এদেশে ততটা কঠোরভাবে প্রয়োগ হয় না। তার থেকে বড় কথা আমাদের দেশে এ বিষয়ে জনসচেতনতা তেমন একটা নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সারাদেশে জনসচেতনতা সৃষ্টির অর্থবহ কোন উদ্যোগও সরকারীভাবে নেয়া হয় না। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক গণমাধ্যমে সরকারীভাবে সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না থাকায় আশানুরুপ ফলাফল পাওয়া যায় না।


শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য  সবচেয়ে  কার্যকরী পদক্ষেপ হচ্ছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এর জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী আইন ও আইনের বাস্তব প্রয়োগ। আরো প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের উন্মেষ ঘটানো। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এ শব্দ প্রয়োগের মানমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। একইসাথে এই আইন লঙ্ঘনের অপরাধে বিভিন্ন দন্ডের বিধানও রয়েছে। এটি অনেক পুরাতন আইন। পরবর্তীতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৬ এ আরো কিছু সংশোধনী আনা হয়। এ আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাকেন্দ্র এবং অফিসের  ১০০ মিটারের মধ্যে হর্ণ দেয়া যাবে না।


তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে এদেশের মানুষের আইন মেনে চলার অভ্যাস সেই অর্থে এখনো গড়ে  ওঠেনি। তাই বারবার আইনের সংশোধনীর চেয়ে আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে সরকারকে আরো বেশি সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে সহযোগীতার জন্য বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা, পরিবেশবাদী সংগঠন, বিদগ্ধবুদ্ধিজীবি এবং গণমাধ্যমকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থানে আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি তবেই জাতীয়ভাবে এই সকল বিষয়ে গণজাগরণ সৃষ্টি সম্ভব হবে।


১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম যুদ্ধবিদ্ধস্ত যে বাংলাদেশকে আমরা পেয়েছি কালের পরিক্রমায় এই ছোট্ট দেশ আজ পৃথিবীর বুকে অনেক মানদন্ডেই সমাদৃত, প্রশংসিত এবং অনুকরণীয়। বাংলাদেশের মানুষদের রয়েছে বুকভরা সাহস, উদ্যম, দেশপ্রেম ও কর্মস্পৃহা যা এদেশকে উত্তরোত্তর সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি আমাদের দায়িত্বও সংগত কারণেই অনেক বেশি। জাপান, নরওয়ে, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই পরিবেশ, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার আন্দোলনে  পরিবেশবাদীদের বড় ভূমিকা ছিলো। আমরাও সঠিক ও সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে এদেশের মানুষদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারি। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং দেশপ্রেম আমাদেরকে সকল প্রতিবন্ধকতার অবসান ঘটিয়ে লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়ে যাবে এই হোক আমাদের  অঙ্গীকার।


আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে অনুন্নত দেশগুলোর (বিশেষ করে বাংলাদেশ) পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে অত্যন্ত জোড়ালো ভূমিকা  পালন করে আসছেন। এ জন্য তিনি বিশ্ব মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃতও হয়েছেন। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার পরিবেশ দূষণ জনিত স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে এদেশের প্রায় সতের কোটি মানুষের যোগ্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন।


লেখকঃ চিকিৎসক ও পরিবেশবিদ

Print