বঙ্গভঙ্গ, লাহোর প্রস্তাব ও উপমহাদেশীয় মুসলমান

-সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
টাইম নিউজ বিডি,
১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫৬:৪১
#

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাজনীতিতে একটা অনাকাঙ্খিত অস্থিরতার ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটা গুমোট বাধা আতঙ্ক কাজ করছে শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে। আর তা এ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। মূলত এসব অঞ্চলের মুসলমানরা ব্যাপকভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। গণচীনে ইউঘোর মুসলমানদের ওপর চলছে শতাব্দীর নিকৃষ্টতম দলনপীড়ন।


চীনা সরকার উইঘোর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকোচিত করতে করতে এখন তা প্রান্ত সীমায় নামিয়ে এনেছে। আমাদের নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও মুসলমানদের ওপর চলছে নির্মম ও নিষ্ঠুর জুলুম-নির্যাতন। কাশ্মীরের আজাদী আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে স্বাধীনতাকামীদের। ভারতীয় বাহিনীর জিঘাংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কাশ্মীরি নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও। পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে তথাকথিত পুশব্যাকের বিষয়টি অতিপূরনো। মনে হয় মুসলমান মানেই কোন ভিনগ্রহী প্রাণি। পৃথিবীতে তাদের বসবাসের কোন সুযোগই নেই।


পুশব্যাক-পুশব্যাংক খেলাটা ভারতের প্রযোজনায় মঞ্চায়িত হলেও তা আর এক নিকট প্রতিবেশী মায়ানমারও কাজে লাগাতে শুরু করেছে বেশ ভালভাবেই। তারা ‘পুকব্যাক’ কথাটা মুখে না আনলেও ভিন্ন আদলে মুসলমানদের ওপরে একবিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্ট হত্যা ও নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। মায়ানমার সেনা বাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে প্রায় ১০ লক্ষ্য রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।


যারা এখন খোলা আকাশের নিচে অনাহারে, অর্ধাহরে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব শরণার্থীরা মানুষ কিন্তু তাদের কোন মানবাধিকার নেই, নেই কোন স্থায়ী নিবাস এবং কোন রাষ্ট্রই তাদেরকে নাগরিক অধিকার দেয়নি। ফলে তারা এখন রাষ্ট্রহীন ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি। কিন্তু শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে বিশ্ব বিবেক অনেক ক্ষেত্রেই নিরব। যা কাম্য নয়।


অতিসম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্য আসামেও একই উপদ্রপ শুরু হয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৩০ লাখ বাঙালি মুসলিমকে ভিনদেশী আখ্যা দেয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ‘ বাংলাদেশী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এসব বাঙালি মুসলিমদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এ নিয়ে আসামজুড়ে প্রবল উৎকন্ঠা, আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।


একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আসামে ৬০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ, তারা যেকোন মূল্যে বাঙলী মুসলমানদের সে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চায়। কারণ, ভারতের ক্ষমতাসীনরা মুসলিম মুক্ত এক নতুন ভারতের দিবাস্বপ্নে বিভোর।


কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ‘আসামে বসবাসরত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের চিহ্নিত করতেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে যাদের নাম থাকবে না, তাদের ফেরত পাঠানো হবে।’ তবে যেসব হিন্দু বাংলাদেশে কথিত নিপীড়নের শিকার হয়ে আসামে আশ্রয় নিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুসারে তাদের আসামে আশ্রয় দেওয়া হবে বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আসাম রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্য বিদেশী সনাক্ত নয় বরং ‘মুসলিম খেদাও’ তাদের আসল উদ্দেশ্য।


কুটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে বিতাড়িত করার জন্যই নাগরিক তালিকাটি প্রকাশ হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বিজেপি সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপ আসামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, এনআরসিকে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের মতো তাদেরও রাষ্ট্রহীন করা হবে। সে প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার অনেকটাই অগ্রসর। যা ভারতের চানক্যবাদী রাজনীতিরই অংশ।


উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মুসলমানরা সব সময় অপাক্তেয়ই ছিল। আর ১৭৫৭ পলাশী ট্রাজেডি ও বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মম পরিণতি ছিল ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় এজেন্টদের মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রেরই ফসল। বিষয়টি আরও দিবালোকের মত ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে। মূলত বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


বাংলার প্রশাসনিক কাজে সুবিধার জন্য ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে ১ম বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। বাংলা বিভক্ত করে ফেলার ধারণাটি অবশ্য কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও উড়িষ্যা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারি প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং বৃটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই। কিন্তু বাংলার এই বিভক্তির ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কিছুটা হলেও আনুকুল্য পান। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে এগিয়ে যান অনেক ক্ষেত্রেই।


মূলত প্রশাসনিক কাজে সুবিধার জন্য ১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গ ঘটনা ঘটলেও তা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য সাপেবর হিসেবে দেখা দেয়। ফলে নতুন প্রদেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ বেড়ে যায়। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের জনগণ এই বিভক্তি মেনে নিতে পারে নি। কারণ, হিন্দুরা মুসলমানদেরকে তাদের অধিনস্ত প্রজা ভাবতেই বেশী পছন্দ করতো। তাই বঙ্গভঙ্গের কারণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানা কিছুই হলেও যে সুবিধা অর্জন করেছিল তা তাদের পছন্দ হয়নি। ফলে তারা বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলন শুরু করে।


তারা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজ লাগাতেও কুন্ঠাবোধ করে না। তারা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদন ঘটেছে ব্যাপক প্রচার চালায় এবং প্রচুর পরিমাণে জাতীয়তাবাদী লেখা এই সময় প্রকাশিত হয়। ফলে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় আবারও বাংলা বিভক্ত হলেও এ সময় অবিভক্ত বাংলার ধ্বজাধারীরা কোন টুশব্দও করেনি।


১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা লেখেন, যা অনেক পরে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়। মূলত পশ্চিম বাংলার জনগণ বঙ্গবঙ্গের কারণে পূর্ববাংলার মুসলমানরা যে আনুকুল্য পেয়েছিল তা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে এবং ফলশ্রুতি ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।


ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমীয়া অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়। এরই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নয়া দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন পরবর্তী অবিভক্ত ভারতের ধারণাটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। আর এজন্য মুসলমানরা দায়ি ছিলেন না বরং হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবই এজন্য প্রধানত দায়ি।


মূলত ভারতীয় রাজনীতিকদের এমন সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির কারণেই ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারতকে অখন্ড রাখা সম্ভব হয়নি। আর সে জন্যই মুসলিম নেতৃবৃন্দর ভারত থেকে বের হয়ে এসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের ধরণা উপস্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে। কারণ, ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উপস্থিতির কারণেই অখন্ড ভারতে যোগ দেয়া মুসলমানদের পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না।


তাই মুসলিম লীগের কর্মীদের একটি ক্ষুদ্র দল নিয়ে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অধিবেশনে যোগদানের জন্য বাংলার মুসলিম লীগ দলের নেতৃত্ব দেন এ.কে ফজলুল হক এবং তাঁরা ২২ মার্চ লাহোরে পৌঁছেন। বাংলার প্রতিনিধি দলকে বিপুল জয়ধ্বনি দিয়ে বরণ করা হয়। জিন্নাহ তাঁর দু‘ঘণ্টারও অধিক সময়ব্যাপী বক্তৃতায় কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সমালোচনা করেন এবং দ্বি-জাতি তত্ত¡ ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি দাবি করার পেছনের যুক্তিসমূহ তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তিসমূহ সাধারণ মুসলিম জনতার মন জয় করে।


পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াদ খান লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন, যা আলোচনা ও সংশোধনের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটি সমীপে পেশ করা হয়। সাবজেক্ট কমিটি এ প্রস্তাবটিতে আমূল সংশোধন আনয়নের পর ২৩ মার্চ সাধারণ অধিবেশনে ফজলুল হক সেটি উত্থাপন করেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামান ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি উপস্থাপনের সময় ফজলুল হক বক্তব্য রাখেন। লাহোর প্রস্তবটি ছিল নিম্নরূপ:


ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব এলাকাসমূহের মতো যে সকল অঞ্চলে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে সব অঞ্চলে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠন করতে হবে যার মধ্যে গঠনকারী এককগুলি হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।
বাংলার মুসলমানগণ, যারা উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে ফিরছিল, পরিশেষে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে তার সন্ধান পায়। লাহোর প্রস্তাব তাদেরকে একটি জাতীয় চেতনা প্রদান করে। তখন থেকে মুসলিম রাজনীতির প্রধান ধ্যানধারণা হিন্দুদের অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পরিবর্তে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব অর্জনের দাবির রূপ পরিগ্রহ করে।


২৪ মার্চ প্রবল উৎসাহের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবকে ক্যামব্রিজে বসবাসরত দেশত্যাগী ভারতীয় মুসলমান রহমত আলী কর্তৃক উদ্ভাবিত নকশা অনুযায়ী ‘পাকিস্তানের জন্য দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৪০ সালের প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তানের উল্লেখ নেই এবং ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের’ দাবি জানাতে গিয়ে লীগের মুখপাত্রগণ কি চাচ্ছেন সে সম্পর্কে মোটেও দ্ব্যর্থহীন ছিলেন না। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ মুসলিম নেতৃত্বকে একটি সুসামঞ্জস্য গান সরবরাহ করে, যা অবিলম্বে তাঁদেরকে একটি রাষ্ট্রের ধারণা জ্ঞাপন করে।


মুসলমান নেতাদের পক্ষে সাধারণ মুসলিম জনগণের নিকট লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা প্রদান এবং এর প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারত। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ কর্তৃক প্রস্তাবটিকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে নামকরণ হওয়াতে সাধারণ জনগণের মাঝে এর পূর্ণ গুরুত্ব জনে জনে প্রচার করার ব্যাপারে মুসলমান নেতৃবৃন্দের অনেক বছরের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। পাকিস্তানের ধারণাটির প্রতি জোর দেওয়ার মাধ্যমে হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ একজন আইনজীবীর অত্যধিক শব্দবহুল আচ্ছন্ন বর্ণনাকে উদাত্ত আহবানে পর্যবসিত করতে সাহায্য করে।


১৯৪১ সালের ১৫ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে একটি মৌল বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি লীগের প্রধান বিষয় ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪০ সালের পরবর্তী সময় থেকে ভারতীয় স্বাধীনতার বিতর্কের প্রধান প্রসঙ্গ ছিল পাকিস্তান। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করতে এবং স্বশাসনকে সহজতর করার সাহায্য কল্পে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে যখন মন্ত্রী মিশন ভারতে পৌঁছে, তখন ৭ এপ্রিল দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তাদের ‘পাকিস্তান দাবি’র পুনরাবৃত্তি করতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের তিন-দিনব্যাপী এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৪৬ সালে মুসলমান আইন প্রণয়নকারীদের দিল্লি সম্মেলনে যে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয় তাতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল:


ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে বাংলা ও আসাম সমবায়ে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্থান সমবায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে যে অঞ্চলসমূহ গঠিত, সে অঞ্চলসমূহকে নিয়ে একটি সার্বভৌম স্বাধীন ‘রাষ্ট্র’ গঠন করা হোক এবং কোন রকম বিলম্ব ছাড়াই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার প্রদান করা হোক। কমিটি এ পরিবর্তনের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলে নি। মূলত ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের পৃথক দু’টি জাতিসত্ত্বার উম্মেষ ঘটে।


কিন্তু মুসলিম নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতার কারণে ভারত বিভাজনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। মূলত লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ি আসামও পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কথা। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মানদন্ডে পুরো বাংলায় পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হওয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু মুসলিম নেতৃবৃন্দের তাড়াহুড়ার কারণেই আসাম ও বাংলার অংশ বিশেষ পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতি এখন আসাম ও পশ্চিম বাংলা সংকটের জন্ম দিয়েছে।


মূলত বাংলাদেশের জন্য সমস্যা ইতিহাস ও প্রতিবেশ উভয়ই। বর্তমান আঙ্গিকে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে অভিবাসন প্রবাহে বিধিনিষেধ ছিল না। জীবিকার সন্ধানে, বিশেষ করে গরিবরা শ্রমিক স্বল্পতা, জমি প্রাপ্তি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সুযোগ থাকা আশপাশের অর্থনৈতিক এলাকায় পাড়ি জমাত। গত দুই শ’ বছর ধরে এই এলাকার লোকজন উত্তর-পূর্ব প্রান্তগুলোতে পাড়ি দিয়েছে। আরাকানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমানে যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সীমানা রয়েছে, তাতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃআঞ্চলিক উভয় ধরনের প্রতিযোগিতাই রয়েছে। অভিবাসন এলাকায় এসব শ্রম অভিবাসীকে রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করার কারণেই মিয়ানমার ও ভারত উভয় স্থানে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।


সম্প্রতি বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্য থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। মূলত একটি ঐতিহাসিক সমস্যা সমাধানে এটিই সর্বোত্তম পন্থা হোক বা না হোক, আসাম থেকে বের দেওয়া মানে এ নিয়ে অপ্রস্তুতিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি করা। রোহিঙ্গা সঙ্কটে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সক্ষমতার অভাব আছে এবং বেশ অপ্রস্তুতও। ফলে বাংলাদেশের সামর্থ্য ও সম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


বহিষ্কার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সহায়তা কম পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ অন্তত একটি বিতর্কিত ভূখন্ড গত পরিচিতি থাকা রোহিঙ্গাদের তুলনায় তাদেরকে অনেক বেশি বাংলাদেশী মনে হয়। এর মানে হলো, বহিষ্কৃত লোকজনকে তাদের নিজেদের মতো করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা কেবল আর্থ-সামাজিক সমস্যাই সৃষ্টি করবে না, সরকারি সম্পদেও টানাপোড়নের সৃষ্টি করবে, রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ করা সম্পদ নিয়েও বিরোধের জন্ম দেবে।


পরিস্থিতি যেভাবে এগুচ্ছে তাতে আসাম থেকে যদি বাংলাদেশী মুসলমানদের বহিস্কার করা হয় তাহলে এ অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। একই সাথে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়বে এবং উত্তেজনাও সৃষ্টি হতে পারে। তৈরি পোশাকসহ যেসব খাতে ভারতীয়রা কাজ করছে, তাদের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু আসাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর বৈধ ও প্রায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি জোরদার হবে। যা নতুন সংকটের জন্ম দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।


উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আসাম থেকে গণহারে মুসলমানদের বহিষ্কার করা হলে প্রধানত মানবিক মাত্রায় থাকা রোহিঙ্গা সঙ্কটের চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে। আসাম থেকে বহিষ্কারের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আঞ্চলিক সঙ্কটও সৃষ্টি করতে পারে। আসলে ভারত বিভাজনে লাহোর প্রস্তাবের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের অভাবেই উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতার কারণেই এ অঞ্চলের মুসলমানরা এখনও বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার। আর এ অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের বিষয়টি আবারও সামনে আসতে পারে।



(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)


 


 

Print