প্রশ্নপত্র ফাঁস ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা | timenewsbd.com

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
টাইম নিউজ বিডি,
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:১৬:১৭
#

‘পরীক্ষা’ মেধা ও মনন যাচাইয়ের অন্যতম মাধ্যম। তাই পরীক্ষা পদ্ধতি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্চনীয়। আর পরীক্ষা গ্রহণে ক্ষেত্রে কোন অনিয়মই গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত সুপ্ত প্রতিভার স্ফুরণ ও মেধা বিকাশে প্রাচীনকালেই শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। পরীক্ষা পদ্ধতিরও প্রচলন হয়েছিল প্রায় একই সাথে। তবে কালের বিবর্তনে ও সমায়ের প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়েছে।


পরীক্ষা পদ্ধতিতেও এসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শিক্ষাকে সময়োপযোগী করার জন্য নানা পদ্ধতি ও কলা-কৌশলও অবলম্বন করা হয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের পরীক্ষা পদ্ধতি এখনও স্বচ্ছ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর এ জন্য রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই অনেকাংশেই দায়ি করা যায়। যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে।


সময়ের সাথে তাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিতে অতীতের তুলনায় গতিশীলতা এসেছে। কিন্তু আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা এখনও কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারিনি। শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমেই অনেক জাতিরাষ্ট্র উন্নতি উচ্চমার্গে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা কাঙ্খিত মানের না হওয়ায় আমরা বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি। তাই আমাদের উন্নতি-অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ের নয়। সঙ্গত কারণেই আমাদের পশ্চাদপদতা কোন ভাবেই আমাদের পিছু ছাড়ছে না। কারণ, আমরা শিক্ষা পদ্ধতিকে কাঙ্খিত মানে উন্নীত করতে পারিনি এবং আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি শুধু সনাতনী নয় বরং অনেকাংশে ত্রুটিপূর্ণও।


আসলে যে জাতি যত উন্নত সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থাও তত উন্নত। তাই দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা উন্নয়ন ও সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও এ কথার অনুকুলে প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবতা কিছুটা হলেও আলাদা। বিষয়টি যে অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র প্রচার সর্বস্ব একথা বললে অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। কারণ, আমাদের দেশের নতুন নতুন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলেও পাঠদানের যথাযথ মান এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আমাদের সীমাবদ্ধতা সহ এর নানাবিধ কারণও রয়েছে।


দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গাণিতিকহারে বাড়লে শিক্ষার যথাযথ মান এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাবও বেশ প্রকট। কারণ, শিক্ষা ও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অন্য পেশার চেয়ে বেশ কম। তাই মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা অনাকাঙ্খিত দুর্বলতার সৃষ্টি হয়েছে। আর এ থেকে উত্তরণের সহসায় কোন পথ দেখা যাচ্ছে না বা এ বিষয়ে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপও গ্রহণ করছি না। এছাড়াও সনাতনী ও অবৈজ্ঞানিক পাঠদান পদ্ধতি, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং শিক্ষা সহায়ক পরিবেশের অভাবও এজন্য কম দায়ি নয়। আর আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতার জন্য প্রধানত দায়ি হলো পরীক্ষা ক্ষেত্রে মারাত্মক অনিয়ম ও স্বচ্ছতা। যা আমাদের জন্য শুধু আত্মঘাতিই নয় বরং দেশ ও জাতিস্বত্ত্বার জন্য মারাত্মক হুমকী।


নিকট অতীতে আমাদের দেশের পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রবণতা প্রচলিত ছিল ব্যাপকভাবে। এমন সময়ও সময় গেছে যে তখন পরীক্ষা আর নকল প্রবণতা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিল। তবে এখনও দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে পুরোপুরি নকলমুক্ত করা সম্ভব না হলেও এই প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধ্যবসায়ের মানসিকতা ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পাবলিক পরীক্ষায় নতুন ফেৎনার আবির্ভাব ঘটেছে। আর তা হলো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধবংসের মুখোমুখি করেছে।


অতীতে যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি এমন কথা বলা পুরোপুরি যৌক্তিক হবে না। তবে সাম্প্রতিককালে যে এই প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে তা একেবারে নিশ্চিত করে বলা যায়। দেশের পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষা কোন ক্ষেত্রই এ প্রবণতার বাইরে ছিল না বা এখনও নেই। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রণালয়, শিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে খুবই উদাসীন। মাঝে মধ্যে এসব দপ্তরের পক্ষে অনেক লম্বা লম্বা কথা বলা হলেও তা যে শুধুই অন্তসারশূণ্য তা চলমান এসএসসি পরীক্ষার সকল বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়।


মূলত পাবলিক পরীক্ষা সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অনিয়ম ও দূর্নীতির কারণেই। আসলে সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকার কারণেই পরীক্ষা থেকে এই অনিয়ম দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিভাগের যোগসাজস ছাড়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এসব অপকর্ম প্রতিরোধ করা যাদের দায়িত্ব তারাই যদি এমন গর্হিত কাজের সাথে জড়িত হন তাহলে তা প্রতিরোধ করার কোন সুযোগ থাকে না।


আর এ জন্য সংশ্লিষ্টদের মানসিকতাও মোটেই ইতিবাচক নয়। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী তার বিভাগের কর্মকর্তাদের সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ গ্রহণের পরমর্শ দিয়ে প্রকারান্তরে দূর্নীতিকে উষ্কে দিয়েছেন বলেই মনে করছেন আত্মসচেতন মহল। সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান নির্বাহীই যদি অনিয়ম ও দূর্নীতিকে এ ভাবে উস্কে দেন তাহলে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার চিন্তা শুধু কল্পনাবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়।


মূলত সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরগুলোর অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ‘পরীক্ষা’ এবং ‘প্রশ্ন ফাঁস’ যেন একেবারে গাঁট ছাড়া বেধেছে। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কোন ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। যেখানেই পরীক্ষা সেখানেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা, এখন প্রতিটি স্তরেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। শুধু পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায়ও। আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এখন নতুন কিছু নয়। ফলে আমাদের দেশের কমলমতি শিক্ষার্থীরা ক্রমেই মেধাহীনতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।


দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এটি বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ দেশের আত্মসচেতন মানুষ ও অভিভাবকরা। প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন তারা। চলমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতি নিয়েও উদ্বিঘ্ন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষামন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য শিক্ষক সহ অন্যদের দায়ি করলেও দেশের আত্মসচেতন মানুষরা একথা মানতে রাজী নন। তারা মনে করেন প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। কিন্তু সরকার উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। যা কেউই গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না বা যৌক্তিকতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।


সংশ্লিষ্টরা খেদোক্তি করে বলছেন, যেখানে ফেসবুক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ্যে প্রশ্ন কেনা বেচা হচ্ছে সেখানে দায়িদের বিরুদ্ধে কেন যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না? ফেসবুক পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এসব ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ কে চালায় তাদের কেন বের করা যাচ্ছে না এর কোন সদুত্তর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে নেই। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অবস্থানে আশাহত অবিভাবক সহ শিক্ষা সংশ্রিষ্টরা। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। অপরাধী সনাক্ত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ার বিষয়টিও বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।


অভিভাবকরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তারা জীবনের প্রারম্ভিক সময়ে অসদুপায় অবলম্বনের কারণে তাদের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ  প্রজন্ম শুধু মেধাহীনই হবে না বরং তাদের নৈতিক চরিত্রের স্খলন ঘটবে। মূলত কতিপয়  ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ভুয়া প্রশ্ন দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গেও এক ধরনের তামাশাও করা হচ্ছে। যা প্রতিরোধ করে দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব সরকার সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা চর্চায় আসল উদ্দেশ্যে। দেশ ও জাতির প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই।


জানা গেছে, চলমান এসএসসি পরীক্ষার যে কয়টি বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে তার সবকটির প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়েছে। ফেসবুক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে যে প্রশ্নপত্রের নমূমা প্রচার করা হয়েছে তার সাথে মূল প্রশ্নপত্রে হুবহু মিল পাওয়া গেছে বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি, এইচএসসি, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠেছিল। অনেক অভিভাবক প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণও দেখিয়েছিলেন।


এখন অভিভাবক ও পরীক্ষার্থী যুগপৎভাবেই পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র খোঁজে। এসব অভিভাবকদের যুক্তি হচ্ছে, যারা প্রশ্ন আগে পায় তারা শুধু সেগুলোই প্রাকটিস করে পরীক্ষা হলে যায়। ফলে শতভাগ প্রশ্নের উত্তর নির্ভুল দেয়। আর তার সন্তান কষ্ট করে লেখাপড়া করে পরীক্ষা দেবে। এই দুয়ের মূল্যায়ন এক হবে না। তাই তারা এমন অনৈতিক কাজে জড়িত হয়ে পড়েন।


আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের বিরুদ্ধে অতীতে কোন শাস্তিমূলত ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় সে প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এমনকি এখন তা অপ্রতিরোধই বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এসব ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের যোগসাজসের বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও পরীক্ষা বাতিল করার উদাহরণ আছে মাত্র দু’একটি। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো সাজেশন বলেও বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো উদাহরণ নেই।


২০১২ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের খবর আলোচনায় ছিল। একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় ঘটতে থাকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। অবাধে শিক্ষার্থী, অবিভাবক সহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নপত্র। কোনটা ভুয়া আবার কোনটার অধিকাংশ মিলে যায় প্রশ্নের সঙ্গে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী এবং অবিভাবকরা বিভ্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ দায়িদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।


এখন দেশব্যাপী প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ইনবক্সে কেনাবেচা হচ্ছে। অস্পষ্টভাবে প্রথমে প্রশ্নটি আপলোড করা হয়। বলা হয়, পুরো ও স্পষ্ট প্রশ্ন পেতে হলে ইনবক্সে যোগাযোগ করুন।  পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ২০১৭, ‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি অল ঢাকা বোর্ড কোয়েশ্চেনস ২০১৭’‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি কোয়েশ্চেনস সাজেশন অল বোর্ড এক্সামিন ২০১৭ + ২০১৯ + ২০ + ২১ বিডি, ফাঁস হওয়া প্রকৃত প্রশ্নপত্র ব্যাংক, প্রশ্ন ফাঁস, ‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি সাজেশন + কোয়েশ্চেনস ২০১৭-১৮ ইত্যাদি নামে একাধিক ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপ রয়েছে। এসব পেজ এবং গ্রুপে পরীক্ষার আগেই সাজেশন এবং প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়।


পাবলিক পরীক্ষা সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রশ্নপত্র ছাপানোর স্থান বিজি প্রেস থেকে এখন প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আগে বিজি প্রেস (সরকারি ছাপাখানা) ছিল প্রশ্ন ফাঁসের জন্য খুবই রিস্কি জায়গা। এখন সেখানে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই।


প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর সিলগালা করে জেলাগুলোতে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে যায় থানায় থানায়। ওই পর্যায়েও প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। কেবলমাত্র সকাল বেলা ওই দিনের প্রশ্ন প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর এমন দাবি সংশ্লিষ্টরা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। কারণ, যতগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোই শিক্ষামন্ত্রী বর্ণিত সময়ের অনেক আগেরই ঘটনা।


মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের বক্তব্য দায়সারা গোছের। সংশ্লিষ্টরা এজন্য অন্যদেরকে দায়ি করে তাদের দায় শেষ করতে চান। কিন্তু রাষ্ট্র এই দায় কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ, দেশের সকল কিছুই দেখভাল দায়িত্ব সরকারের। তাই অন্যদের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা হালকা করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। মূলত ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন, করে রাষ্ট্রে সার্বিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সরকারের। কারও ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে এই দায়িত্ব সরকার এড়াতে পারে না।


রাষ্ট্রের কার্যাবলীর সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকআইভার ( Maciver )  বলেন, ÔThe state is an association which through law as promulgated by a government endowed to this end with coercive power, maintaining within a community territorially demarcated, the universal external condition of social order.’ অর্থাৎ রাষ্ট্র এমন এক সংঘ যা সরকারের ঘোষিত আইন অনুসারে কার্য করে। সরকার আইন ঘোষণা করার এবং তা পালন করার শক্তির অধিকারী। ঐ শক্তির সাহায্যে সরকার নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলার বাহ্যিক ও সর্বজনীন অবস্থা বজায় রাখে।


শিক্ষাব্যবস্থা সর্বাধুনিক ও সময়োপযোগী করার মাধ্যমে বিশ্বের অপরাপর জাতি-রাষ্ট্র যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সহ মেধা যাচাইয়ের সকল ক্ষেত্রেই অনিয়ম আমাদেরকে পশ্চাদপদ করে রেখেছে নিঃসন্দেহে। তাই পরীক্ষা ক্ষেত্রে এই সর্বনাশা ফেৎনা দূর করতে রাষ্ট্রকেই কার্যকর ও যুৎসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আমাদেরকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করবে। তাই এই বিষয়ে রাষ্ট্রের শৈথল্য প্রদর্শন ও ব্যর্থ হওয়ার কোন সুযোগ নেই।


সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা-()


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)


এমবি     

Print