মোহাম্মদ বিন সালমান, জেরুসালেম দখলকারীদের সঙ্গে নিয়ে আপনি কাবা রক্ষা করতে পারবেন না | timenewsbd.com

মোহাম্মদ বিন সালমান, জেরুসালেম দখলকারীদের সঙ্গে নিয়ে আপনি কাবা রক্ষা করতে পারবেন না

ইবরাহিম কারাগুল
টাইম নিউজ বিডি,
১৩ মার্চ, ২০১৮ ২৩:১২:১৬
#

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইসরাইল, মিশর, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি "তুরস্ক-বিরোধী" জোট প্রতিষ্ঠা করেছে। যদিও বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে এ ফ্রন্ট টার্গেট করেছে ইরানকে বাস্তবে নতুন অক্ষটি খোলাখুলিভাবে অবস্থান গ্রহণ করছে তুরস্কের বিরুদ্ধে। তাদের প্রধান লক্ষ্য তুরস্ককে এগুতে না দেয়া। তারা তুরস্কের হাতকে দুর্বল করার জন্য সিরিয়া থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের প্রতিটি কোণে সব ধরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।


আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে জানি, তার সমস্যাটা বুঝি যে, মুহাম্মদ বিন যায়েদ তুরস্কের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তিনি যে ১৫ জুলাই ২০১৬ তারিখের হামলার জন্য ফতেহউল্লাহ গুলেন সন্ত্রাসি নেটওয়ার্ক (ফেটো) এর পেছনে ছিলেন, তাদের সাথে চুক্তি করেছেন, এ কাজে অর্থ দিয়েছেন, তা আমরা ডিসেম্বর ১৭-২৫ ফাইল থেকে জানি। আমরা জানি তুরস্ক এবং প্রেসিডেন্ট রেসেপ তায়িপ এরদোয়ানের প্রতি তার শত্রুতা এখন এক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।


এ শতাব্দীর নাটক তৈরি হচ্ছে, আরব বিশ্ব তছনছ করা হচ্ছে


তবে আমরা সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে বলতে চাই যিনি তুরস্ক-বিরোধী অক্ষের উপর ভর করেছেন এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে যে কোন কাজে সমর্থন দিচ্ছেন।


প্রিয় রাজকুমার,


আমাদের অঞ্চলে শতাব্দীর পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে বড় অভিযান এবং আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশগুলো বিভক্ত হচ্ছে, মিথ্যা হুমকির কথা বলে আক্রমণ করা হচ্ছে, যখন কোন ফ্রন্ট গঠিত হচ্ছে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে এবং আরব ভূখণ্ড লুটপাট হচ্ছে।


তিন দশক আগে, আরব-ইরান সীমান্ত ইরাকের পূর্ব প্রান্তে ছিল। আপনি ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন এবং ২০০৩ সালে ইরাকে অভিযান সমর্থন করেছেন। আর এখন আরব-ইরান সীমান্ত ইরাক-সিরিয়া সীমান্ত পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকার অর্থে বলতে কি এটি আপনার কারণেই হয়েছে। আপনি এখন যাদের উপর নির্ভর করছেন সেই যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেন এই দেশটিতে ধ্বংসলীলা চালিয়ে সেটিকে ইরানের কাছে হস্তান্তর করেছে।


ইয়েমেন থেকে সিরিয়া অথবা লিবিয়া ও ইরাকে যেখানেই সংঘর্ষ চলছে তার সবটাই আরব অঞ্চল। আর যারা এটি করছে তারা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং বৃটেন । তাদের সাথে আপনি আজ একটি "অক্ষ" গঠন করেছেন। আর এভাবে চললে আরব সীমান্ত ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সরে যাবে। এ সীমান্ত আপনারই সীমানা হতে যাচ্ছে।


যারা আপনাকে ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে তারা আপনার জন্য একটা বড় ফাঁদ তৈরি করেছে।


প্রিয় প্রিন্স,


আপনি নিশ্চিত হতে পারেন পরের যে ভূখন্ডটি ভাগ করা হবে সেটিও আরব ভূমি। আপনার দেশটি আমাদের অঞ্চলে। আমাদের লোকই আমাদের বিপর্যয় ডেকে আনছে, যে সব নগরি ধ্বংস হবে সেগুলো আমাদেরই। এর পর থেকে পারস্য উপসাগর এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে, আরো থাকবে সৌদি আরব। আরব ভূখন্ডই লুটপাট করা হবে। এসব দেশ ধ্বংস হবে ইসরাইল আর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা যাদেরকে এখন আপনি সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।


অনেক বড় ফাঁদ আপনার জন্য তৈরি হয়েছে, এবার চোখ খুলুন


জনাব প্রিন্স, এই হলো ২১ শতকের চুক্তি, বন্টন এবং প্রদর্শনী। আমরা দাঁড়িয়ে থাকব, কিন্তু আপনি পারবেন না অন্তত এই মনোভাব বা নীতি নিয়ে কোনভাবেই নয়।


যারা ইরানের বিরুদ্ধে আপনাকে দাঁড় করিয়েছে তারা তিন দশক ধরে ইরানকে কিছুই করেনি; তারা তাকে রাষ্ট্র উপহার দিয়েছে। কিন্তু তারা আপনাকে ও আপনার স্বজনকে অব্যাহতভাবে ধাক্কা দিয়ে চলেছে যুদ্ধের দিকে। আর আপনি আর আপনার স্বজনরাই সব সময় হেরেছেন।


আপনি কখনও ভেবে দেখেননি কেন অনারব মুসলিম দুনিয়ার যখন উত্থান ঘটছে তখন আরব বিশ্ব হচ্ছে বিপর্যস্ত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে তারা শক্তিশালী হয়েছে। যারাই প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যশালী ব্যবস্থা থেকে বেরুতে পেরেছে তারাই উন্নতি করেছে।


এটি হবে আপনার জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত অন্ধতা


প্রিয় প্রিন্স,


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ হয়ে তুরস্ক-বিরোধী মনোভাব নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর মুহাম্মদ বিন যায়েদের জন্য তুর্কিদেরকে টার্গেট করে আপনি কিছুই পাবেন না, তবে আপনাকে অনেক কিছু হারাতে হবে। তুর্কি বন্ধুত্বের হাত ফিরিয়ে দিলে আপনি বন্ধুহীন হবেন এবং আগামীকাল এই ভূখন্ডের সমর্থন ও প্রতিরক্ষার জন্য কাউকে কাছে পাবেন না।


তুর্কিদের বিরুদ্ধে কোন মন্দ অক্ষকে সমর্থন করবেন না। মুহাম্মদ বিন যায়েদের সন্ত্রাসী এজেন্ডার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না; সেই দিন আসবে যেদিন আপনি হেরে যাবেন। একবার নজর দিয়ে দেখুন এখন কি চলছে, এর ভবিষ্যত দেখতে চেষ্টা করুন এবং আপনি তা বুঝতে পারবেন।


আপনি যদি তুরস্ক ও ইরানকে একই লক্ষ্যবোর্ডে স্থান দেন, তাহলে আপনি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অন্ধত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাচ্ছেন। আপনি তুরস্ক-বিরোধী মনোভাব জাগানোর মাধ্যমে এই অঞ্চলে কিছু অর্জন করতে পারবেন না।


যারা জেরুসালেম দখল করে নিয়েছেন তাদের সাথে রেখে আপনি কাবা রক্ষা করতে পারবেন না।


ইরানের ব্যাপারে প্রদর্শনীতে আমরা আপনাকে সমর্থন করেছি। তেহরান সৌদি আরবকে ঘিরে ফেলতে পারে মর্মে আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। এটাকে আমরা ফার্সিয়ান আক্রমণ-মানচিত্র হিসাবে দেখেছিলাম। কিন্তু জনাব প্রিন্স, আপনি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক তথ্যকে বিভ্রান্ত করছেন। যারা আপনাকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সুরক্ষা গ্রহণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং যারা আপনাকে ইরানের ব্যাপারে হুমকি দিচ্ছে, তারা একই দেশ, একই শক্তি; তারা আপনার বন্ধু, আপনার মিত্র।


এইসব হুমকির বিরুদ্ধে আপনি দাঁড়াতে পারবেন না, আপনার নিজ দেশকে রক্ষা করুন, এই অঞ্চলকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইল অন্য যাদের নিয়ে নতুন আক্রমণের তরঙ্গ সৃষ্টি করতে চাইছেন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুন। যারা জেরুসালেম দখল করে রেখেছে, যারা এটিকে জিম্মি করে নিয়েছে, তাদের সাথে নিয়ে আপনি পবিত্র কাবা, মক্কা ও মদিনাকে রক্ষা করতে পারবেন না মিস্টার প্রিন্স।


মুসলিম বিশ্বকে ইতিহাস থেকে বের করে দিতে চাইছে, দেখুন সেটি!


ইসরাইলী গোয়েন্দা তথ্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার উপর ভিত্তি করে তৈরি উপসাগরীয় নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিয়ে আপনি একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন চালাতে পারবেন না। আপনি ইহুদী লবির সুরক্ষার অধীনে থেকে মুসলমানদের রক্ষা করতে পারবেন না, মিস্টার প্রিন্স।


আপনার বন্ধু মুহাম্মদ বিন যায়েদ বর্তমানে এবং খোলাখুলিভাবে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) কাছে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করছে এবং তুরস্ককে অবরুদ্ধ করার বিষয়কে সমর্থন করছে। ১৫ জুলাই তিনি বিদেশী হস্তক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নেন। আমরা জানি যে, যারা আমাদের জনগণের উপর গুলি ছোড়েছে তাদের তিনি সমর্থন করেছিলেন, যারা আমাদের সংসদে বোমা মেরেছিল, যারা আমাদের লোককে ট্যাংক দিয়ে পিষ্ট করেছিল তিনি তাদের সমর্থন করেছেন। আমরা জানি যে তিনি এখনও সেই একই অবস্থানে রয়েছেন। তিনি এখনও নতুন করে নেয়া মন্দ প্রকল্পগুলি অনুসরণ করছেন এবং এখনও সন্ত্রাস ও নোংরা সম্পর্কের মাধ্যমে তুরস্ককে টার্গেট করছেন।


জনাব প্রিন্স, শুধুমাত্র আপনার দেশ নয়, একই সাথে এই পুরো অঞ্চলে আক্রমণ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র আপনি নন, মুসলিম বিশ্বকে ইতিহাসের বাইরে বের করে দেয়া হচ্ছে। যারা এটি করছে তারা আপনার এখনকার বন্ধু, অংশীদার। মুসলিম বিশ্ব এটি জানে, এই সম্পর্কে সচেতন, আপনারও এটি জানা প্রয়োজন।


যে পথে আপনি আছেন সেই পথ আপনার দেশকে আত্মাহুতির দিকে নিয়ে যাবে রাজকুমার


মিস্টার প্রিন্স, আজ আমরা পশ্চিমা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছি, আমরা ইতিহাসে তাই করেছি। আমরা কেবল তুরস্কের জন্যই লড়াই করছি না, লড়াই করছি পুরো অঞ্চলের জন্য। আজকের শোডাউন এমন যা ভুলে যাওয়া হবে না; এই জাতি ভুলে যাবে না, এটি আপনি মনে রাখুন।


আমরা একসময় তুরস্ক-ইসরাইল অক্ষ তৈরি করেছিলাম কিন্তু আমরা বুঝতে পারি এই অক্ষ আমাদের মাতৃভূমিকে, আমাদের জনগণকে, আমাদের অঞ্চলকে আঘাত করছে। এখন আপনি একই পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছেন। আপনি এর মাধ্যমে নিজেকে নিরাপদ করতে চাইছেন। আমরা যা করেছি, আপনি সে একই জিনিষের পুনরাবৃত্তি করছেন।


আমি বললাম যে, পরে একটি সময় আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন আপনার দেশকে তারা আসলেই ধ্বংস করতে চায়। ২০ শতকে ক্ষমতায় থাকার জন্য পশ্চিমের কেন্দ্র দিতে পারতো গ্যারান্টি, এখন সেই যুগ পেরিয়ে গেছে। এখন এমন একটা ব্যবস্থা বিরাজ করছে যা পশ্চিম নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই যেখানে অবস্থা সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের গোয়েন্দাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া আপনার জন্য আত্মহত্যার নামান্তর মিস্টার প্রিন্স।


আপনার তুরস্কের প্রয়োজন হবে, দুয়েক বছরের মধ্যেই আপনি এটি উপলব্ধি করবেন


জনাব আমীর


যেভাবেই হোক আমরা বিশৃঙ্খলা, বিষণ্নতা এবং উত্তেজনার শতাব্দী থেকে পরিত্রাণের একটি উপায় খুঁজে পেয়েছি। আমরা নিজ বাড়িতে প্রসারিত, আমরা নিজেরা দাঁড়িয়ে আছি; আমাদের এমন এক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক জিন আছে যাতে আমরা হাজার হাজার বছর ধরে এগিয়ে যাচ্ছি, আমরা হাজার বছরের জন্য এই অঞ্চলে যুদ্ধ করছি। আমরা আবার একটি উপায় পাবো। আমরা আবার আমাদের পথ চালিয়ে যেতে পারবো। আপনি আপত্তি করুন বা না করুন, আপনি বন্ধু হোন বা না হোন, আমরা আবার সে পথে এগুতে যাচ্ছি। আমরা দাঁড়িয়েই থাকবো এমনকি যদি এটা আমাদের মৃত্যুও ঘটায়।


তবে যারা সমগ্র অঞ্চলটিকে লুণ্ঠন করছে তাদের কাছে আশ্রয় নিয়ে আপনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। আপনার দেশকে আজ যারা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে সে দেশ ইরান নয়, ইরানের বিরুদ্ধে তারা আপনাকে উসকানি দিচ্ছে। তারা আপনাকে ধ্বংস করতে চায়। তারা এসব আরব জমিকে রক্তে রঞ্জিত করে শুকিয়ে ফেলতে চাইছে মিস্টার প্রিন্স।


তারা চূড়ান্ত আঘাত করতে চায় মক্কা ও মদিনাতে, ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর । আমরা মাথা তুলে দাঁড়াই সেটি তারা চায় না। এটি হলো নতুন অক্ষের লক্ষ্য, আপনাকে সাথে নিয়ে তারা যে অক্ষটি তৈরি করেছে । এটা আপনাকে বুঝতে হবে।


আপনার তুরস্ককে প্রয়োজন, তুরস্ক ছাড়া আপনি কিছু করতে পারবেন না। এটি আপনি কয়েক বছরের মধ্যে বুঝতে পারবেন মি প্রিন্স।


তুর্কি পত্রিকা থেকে অনুবাদ মাসুমুর রহমান খলিলী


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই)

Print