আসাম কি আরেকটি আরাকান হবে? | timenewsbd.com

আসাম কি আরেকটি আরাকান হবে?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
টাইম নিউজ বিডি,
৩০ মার্চ, ২০১৮ ১৯:০৯:১৭
#

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় একটা মহাপ্রলয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মূলত এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে একটা ঝড়ের ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভাগ্য বিড়ম্বর কথা কারো অজানা নয়।


তারা বর্মীবাহিনী ও বৌদ্ধ জঙ্গীদের হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নিধনযজ্ঞে এখন ভিটেমাটি ছাড়া। এই ভাগ্যাহত বনী আদমদের স্থান হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে। তারা খোলা আকাশের নীচে, অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানব সভ্যতার যখন জয়জয়কার চলছে বলে উল্লাস প্রকাশ করা হচ্ছে তখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের এমন করুণ পরিণতি সব কিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।


রোহিঙ্গা মুসলমানদের অপরাধ হলো তারা ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। তাই তাদের কোন অধিকারই স্বীকার করা হচ্ছে না। এমনকি এ ক্ষেত্রে বিশ্ব এক প্রকার নিরব দর্শকের ভূমিকায় পালন করেছে। বিশ্ব ও আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং বিশ্বসংস্থাগুলো পক্ষে নিয়মরক্ষার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা হলেও তা শুধুই অন্তঃসারশূণ্য ছিল তা তার পরিণতির দিকে লক্ষ্য করলেই সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গা বিতারণে মিয়ানমার সফলতা লাভের পর এ প্রভাব পড়েছে সার্কভূক্ত দেশ শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের ওপর। সম্প্রতি সেখানেও ঠুনকো অজুহাতে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা হয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের নেতৃত্বে। এতে কয়েকজনের প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন-অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।


প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসাম রাজ্যে মুসলিম বিরোধী সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে বর্মী বাহিনী সফলতা লাভের পর প্রতিবেশী দেশের আসাম রাজ্যও অশান্ত হয়ে উঠেছে।


রাজ্য সরকার দাবি করছে যে, আসামে বসবাসরত অধিকাংশ মুসলমানই বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী। কিন্তু বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না বরং বিষয়টি রাজ্য সরকারের মুসলিম বিদ্বেষ এবং রাজ্য থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদের কুটকৌশল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহল।


দক্ষিণপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি ২০১৪ সালে যখন ভারতের ক্ষমতায় আসে, তখন এই নির্বাচনের সময় আসাম রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হয়েছিল। যা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। মারা গিয়েছিল ৪০ জনের বেশি।


নির্বাচনী প্রচারণার সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি জিতলে 'অবৈধ অভিবাসীদের' ব্যাগ গোছাতে হবে, তিনি তাদের ফেরত পাঠাবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদির সরকার বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে আসা শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রীষ্টানদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ করেছেন।


আইনে এমন সংশোধনী আনার প্রস্তাবও করা হয়েছে যে ২০১৬ সালের আগে যে হিন্দুরা, কিংবা মুসলিম ব্যতীত অন্য সংখ্যালঘুরা ভারতে এসেছেন, তাদের অবৈধ অভিবাসী বলে গণ্য করা হবে না। এতে প্রমাণিত হয় যে শুধু রাজ্য সরকার নয় বরং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা যেকোন মূল্যে আসাম থেকে মুসলমানদের বিতারিত করতে বদ্ধপরিকর। যা ভারত সরকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলেই মনে করা হচ্ছে।


ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান অঞ্চল মিলিয়ে অভিন্ন ভারত ছিল। এমনকি মিয়ানমারও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ ছিল। শাসন কাজের সুবিধার জন্য মিয়ানমারকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে লোক যাওয়া অবাধ সুযোগ ছিল। বসতি করাতেও আইনগত কোনও বাধা ছিল না। আসাম আর বাংলা তো বহুদিন একসঙ্গে ছিল। মূলত বাংলাদেশের মানুষই আসামকে বাসযোগ্য করেছে। নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অনেক কারণে বাংলা অঞ্চল থেকে ছিন্নমূল হয়ে হিন্দু মুসলমান আসামে গিয়ে বসতি গড়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে আসামে বা ভারতে কোনও মুসলমান যায়নি।


তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ পশ্চিমবঙ্গে, আসামে ও ত্রিপুরায় গিয়েছিল ও সেখানে বসতি গড়েছে। হিন্দু মহাসভার নেতা ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী তো পন্ডিত জওহর লাল নেহরুকে বাংলাদেশ থেকে সব হিন্দু নিয়ে সমপরিমাণ মুসলমান ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন।


এ প্রস্তাব না মানায় শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী নেহরু-লিয়াকত চুক্তির পর পদত্যাগ করেছিলেন। এক্সচেঞ্জ প্রস্তাব নেহরু-লিয়াকত চুক্তিতে না থাকায় অর্থ কমিশনের সভাপতি ক্ষিতিশ চন্দ্র নিয়োগী আর অর্থমন্ত্রী জন মাথাইও নেহরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এক্সচেঞ্জ কেন নেহরু চাননি, তার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তা ছিল বেশ উপভোগ্য ও চমকপ্রদ।


নেহরুর ধারণা ছিল, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ১৫/১৬ বছরের মধ্যে। আর বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা যখন আর্থিক কারণে নিজেকে এবং নিজের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না, তখন স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেবে। এমন একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতি যেখানে নিশ্চিত, সেখানে লোক এক্সচেঞ্জের মতো একটি বিরাট ঝামেলার দায়িত্ব নিতে যাবেন কেন?


নেহরুর ধারণা অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে সত্য, কিন্তু আর্থিক কারণে ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রস্তাব করেননি কখনও। বরং বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান ভারতের মানুষের চেয়ে ভালো। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষের কৃতিত্ব। আসলে বাংলাকে ভারতীয়রা দরিদ্র কৃষকদের বস্তি মনে করতো। এই বস্তির এত উন্নতি হবে, তা নেহরুর কল্পনায় হয়তো ছিল না।


প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি সম্প্রতি আসাম রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর তাদের ভাষায় 'রাজ্যের অবৈধ মুসলিম বাসিন্দাদের' বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৫১ সালের পর আসামে প্রথম বারের মতো পরিচালিত এক জনগণনার ভিত্তিতে এই 'ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স' তৈরি করা হয়েছে। ভারতের আসাম রাজ্যের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম। রাজ্য সরকারের বক্তব্য হলো, এই তালিকা তৈরির উদ্দেশ্য 'অবৈধ বাংলাদেশিদের' চিহ্ণিত করা।


'যাদের নাম এই তালিকায় থাকবে না, তাদের বহিস্কার করা হবে। তবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশি হিন্দুদেরকে তারা আশ্রয় দেবেন, কারণ বাংলাদেশে তারা নিপীড়নের শিকার হন।


বিজেপি নেতারা দাবি করেন যে ভারতের আসাম রাজ্যে প্রায় বিশ লাখ মুসলিম রয়েছেন যাদের পূর্বপুরুষরা বাংলাদেশের। ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চে আগে থেকেই যে তারা আসামে থাকতেন, সেরকম দলিল-প্রমাণ হাজির করলেই কেবল তাদের ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। আসামের মুসলিমদের পক্ষে বলা হচ্ছে, "আমার বাবা-দাদারা সবাই ভারতে জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু আমরা যে ভারতের নাগরিক, সেটি প্রমাণের দলিলপত্র আমরা যোগাড় করতে পারছি না। কারণ আমার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন নিরক্ষর। তারা কোন দলিলপত্র রাখেননি।"


মূলত অতীতে আসাম ছিল কমিশনার শাসিত এলাকা। ব্রিটিশেরা যখন আসামকে প্রদেশ বানাতে চাইলেন, তখন কোনোভাবেই তা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ একটা প্রদেশ গঠনের জন্য যে পরিমাণ রাজস্ব আয়ের প্রয়োজন হয়, সে পরিমাণ রাজস্ব আসামে আদায় হতো না। তখন আসাম সীমান্তের বাংলাদেশের সিলেট জেলা এবং রংপুরের গোয়ালপাড়া মহকুমাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ১৮৭৪ সালে আসাম রাজ্য গঠন করা হয়েছিল।


বাংলাকে ভেঙে তার আড়াইটা জেলা নিয়ে যাওয়া বেদনাদায়ক বিষয় হলেও কখনও বাঙালিরা ব্রিটিশের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।


ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনে নেহরু সরকার যখন টালবাহানা শুরু করে, তখন তেলুগুভাষী অঞ্চলের গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামুলু মাদ্রাজ থেকে তেলুগুভাষী অঞ্চল বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবিতে অমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। ৯৩ দিন অনশনের পর তার মৃত্যু হলে ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের জন্য লোকসভা বিচারপতি ফজল আলী কমিশন গঠন করেছিলেন। তার অন্য দুই সদস্য ছিলেন কে এস পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জুর। এই কমিশনের কাছে বিহারের বাংলাভাষী অঞ্চলকে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্য অনেক বাড়াবাড়ি হলেও আসামের বাংলাভাষীদেরকে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনও কথাই হয়নি। অথচ তখন বাংলাভাষীদের আসাম থেকে পৃথক করে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই সমীচীন ছিল।


‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন করছে আসামিরা বহুদিন থেকে। ব্রিটিশ সরকার মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ময়মনসিংহ ও পাবনা জেলা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তখন তিনি আসামের ধুবড়ীর ভাসানচরে গিয়ে বসতি করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি আসাম মুসলিম লীগের সভাপতিও হয়েছিলেন। ব্রিটিশের সময়ে আসাম সরকার ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনে সফল হয়নি মরহুম মওলানার দৃঢ় অবস্থানের কারণে।


১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মওলানা ধুবড়ী থেকে মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য হিসেবে পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আসাম পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। আর দীর্ঘ ৮ বছর পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে মওলানা ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন করেছিলেন।


আসামে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের যৌথ সরকার ছিল। মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন স্যার সৈয়দ মুহাম্মদ সাদউল্লাহ আর কংগ্রেসের নেতা ছিলেন গোপীনাথ বারদুলুই। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত স্যার সৈয়দ সাদউল্লাহ ও গোপীনাথ বারদুলুই আসামের পর্যায়ক্রমে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কী পূর্ব বাংলায় কী আসামে, মওলানার খুঁটির জোর ছিল সাধারণ গরিব কৃষক। তিনি সময়ে সময়ে কৃষক সম্মেলন ডেকে কৃষকদের ঐক্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে রাখতেন। ১৯৪২ সালে তিনি কাগমারিতে কৃষক ও অভিবাসী সম্মেলন করেছিলেন। উত্তর প্রদেশের মওলানা আযাদ সোবহানী এ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। লেখক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার এক লেখায় লিখেছেন, সম্মেলনে দুই লাখ কৃষক ও অভিবাসী উপস্থিত ছিলেন।


বস্তুত আসাম ছিল জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, রংপুর, কুচবিহার, ত্রিপুরা ও সিলেট থেকে লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক গিয়ে আসামে বসতি গড়ে তুলে এবং জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের ব্যবস্থা করেছিল। তেজপুর জেলায় তো কোনও উপজাতিও ছিল না। আর তেজপুর আবাদ করতে শত শত অভিবাসী কৃষক হিংস্র জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলো। আসাম পরিষ্কার হওয়ার পর যখন উদ্বৃত্ত এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো তখন লাইন প্রথা চালু করা হলো। এ প্রথা ছিল নির্মমতার, নিষ্ঠুরতার, জুলুমের শেষ নিদর্শন। মওলানা ভাসানী বলতেন মশা এত বড় বড় ছিল যে, সূতা দিয়ে মশার পা বাধা যেত। মশার কামড়ে কালাজ্বর হয়ে হাজার হাজার অভিবাসী কৃষক মরেছে। সময়ে সময়ে কালাজ্বল মহামারি হিসেবে দেখা দিতো।


মূলত আসামীয়রা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে এমন এক ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথম আসামীয় একশ্রেণির অসৎপ্রবণ বুদ্ধিজীবীরা’ই ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন গড়ে তুলে। বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের ফলে সরকার লাইন প্রথা চালু করেছিল। এই প্রথামতে নবাগত কৃষকদের অধিকারযোগ্য ভূমির সীমারেখার লাইন টেনে দেওয়া হলো। ফলে লাইনের বাইরে অ-আসামীয় কোনও কৃষক জমির বন্দোবস্ত পেতো না। আর এটাই ছিল কুখ্যাত লাইন প্রথা। এ লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আন্দোলন করেছিলেন।


স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন করেছিল আসামের ছাত্র সমাজ। আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন-এর এই আন্দোলনের পেছনে বিজেপির সমর্থন ছিল। ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার ছাত্রদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট লোক গণনার নির্দেশ দেয় এবং নাগরিক লিস্ট তৈরির কথাও বলেন। তখন এও স্থির হয়েছিল যে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত যারা আসামে ছিল, তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে।


সিদ্ধান্তটা ছিল সুবিবেচনাপ্রসূত কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা গিয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের সেখানে থাকা তো অন্যায়। তবে মুসলমানেরা শতাংশে ফিরে এসেছিল। হয়ত বা কিছু হিন্দু থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা দিয়েছে, যেকোনও হিন্দুধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ভারতে এসে নাগরিকত্ব চাইলে তারা নাগরিকত্ব পাবে। সুতরাং যে সব হিন্দু রয়ে গেছে, তাদেরও কোনও অসুবিধা হবে না। টার্গেট সেখানকার বাঙালি মুসলমান।


আসামে এখন বিজেপির সরকার। সবাই ভয় করছে লিস্ট তৈরিতে তারা কোনও হেরফের করবে কিনা! মুসলমানদের বাদ দেওয়ার দুরভিসন্ধি করা তো বিচিত্র নয়। আরএসএস তো ঘর ওয়াপসি আন্দোলন করছে। গরু নিয়ে এ যাবৎ ৭৪ জন মুসলমান হত্যা করেছে। সুতরাং লিস্ট তৈরির ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কারণ ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন আসামের বুদ্ধিজীবীরা আর আসামীয়া ছাত্ররা। আসামের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজও বিশৃঙ্খল চিন্তায় মোটামুটি অভ্যস্ত।


প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল কিছু দিন আগে। প্রকাশিত তালিকায় বহু এমপি এমএলএ-ও বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি অল-আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য্যে নামও বাদ পড়েছে। অথচ তারাই হচ্ছেন এ লিস্টের হোতা। আসলে আসামের মুসলমান নিয়ে কোনও নয়-ছয় করলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। বিষয়টা পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বুঝেছেন তাই তিনি আগুন নিয়ে না খেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ১৯৮৩ সালে আসামে ‘বাঙাল খেদাও’র দাঙ্গায় দুই হাজার মুসলমান মরেছে। গুজরাটের দাঙ্গাও দুই হাজার মুসলমান মরেছিল। বিজেপি শাসিত রাজ্যে মুসলমান হচ্ছে ঘরে রাখা মুরগীর মতো, যখন ইচ্ছে তখন জবেহ করা যায়।


‘বাঙাল খেদাও’ অভিযানের অংশ হিসবেই ভারতের আসাম থেকে নাগরিকত্ব হারাতে যাচ্ছেন প্রায় ৫০ লাখ বাসিন্দা যাদের বেশিরভাগ মুসলিম। দ্বিতীয় দফায় হালনাগাদ হয়েছে রাজ্যের জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন-এনআরসি। সম্প্রতি রাজ্যের অর্থ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, এনআরসি’র নাগরিকত্ব তালিকায় যাদের নাম থাকবে না তাদের আসাম ছাড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, খসড়া এই তালিকা প্রকাশের আগে সীমান্তে মোতায়েন করা হবে ৪০ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য। কেননা, সরকারের দাবি- অবৈধদের বেশিরভাগের পৈতৃকভিটা বাংলাদেশে।


সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের আসাম থেকে বহিস্কার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন রাজ্যটিতে বাস করা প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই আবার মুসলিম। সম্প্রতি ভারতের একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের আগে থেকেই যে আসামে বাস করছেন তার সপক্ষে কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ।


ভারতের নাগরিকদের তালিকা সংক্রান্ত দপ্তর ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন (এনআরসি) আসামের নাগরিকদের প্রাথমিক তালিকা হয়েছে সম্প্রতি। গত ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এমন একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। রাজ্য সরকার বলছে, এর উদ্দেশ্য হলো, কাগজ-পত্র বিহীন লোকদের শনাক্ত করা ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। কর্তৃপক্ষের দাবি মতে, প্রায় ৪৮ লাখ লোক নাগরিকত্বের জন্য যথাযথ প্রমাণ দেখাতে পারেনি।’ এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এ ধরনের একটি তালিকা প্রকাশ করা হলো। এর আগে তালিকাটি বছরের শুরুতে প্রকাশ করা হয়েছিল।


হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী দল বিজেপি ২০১৬ সালে আসাম রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর এ উদ্যোগটি নেয়া হয়। আসামের অর্থ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বাস শর্মা সম্প্রতি বলেছেন, ‘যাদের নাম এনআরসি’র তালিকা থাকবে না, তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে।’ কিন্তু তাদেরকে বহিষ্কার করে কোথায় পাঠানো হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি। রাজ্য সরকার কিছু না বললেও আসামের স্থানীয় রাজনীতিকরা বলছেন, কাগজ-পত্রবিহীন সকল নাগরিককে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। বিশ্লেষককদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আসামের বাসিন্দা বিশেষত মুসলিমদের জন্য রোহিঙ্গাদের মতে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। গত বছর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের কারণে রাখাইন থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।


উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে আসাম পরিস্থিতি। মূলত আসামীয় হিন্দুরা ক্রমেই সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত হচ্ছে যাচ্ছে এমন ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক অভিযোগের ভিত্তিতেই আসামের মুসলমানদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা করছে আসামের রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারও রাজ্য সরকারকে এ বিষয়ে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কোথায় ঠেলে দেয়া হবে বা তার পরিণামই বা কী হবে এনিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।


আসলে রাজনীতিকদের পৌণপৌণিক ব্যর্থতার কারণেই দক্ষিণ এশীয় পরিস্থিতি ক্রমেই আশান্ত হয়ে উঠছে। সে ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গারা আজ মাতৃভূমি থেকে বিতারিত। আর এর ঢেউ আছরে পড়েছে সার্কভূক্ত দেশ শ্রীলঙ্কায়। এর সাথে হালে যোগ হয়েছে আসাম পরিস্থিতি। রাজ্য সরকার সেখান থেকে ৪২ লাখ মুসলমান বিতাড়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সে লক্ষ্যে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। বাস্তবতা যদি তাই হয় তাহলে আসাম যে আরেকটি আরাকান হতে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ করার অবকাশ নেই।


 


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

Print