নেপালী প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বার্তা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
টাইম নিউজ বিডি,
১২ এপ্রিল, ২০১৮ ২১:৩২:২৮
#

সম্প্রতি ভারত সফর শেষ করলেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী মি. কে পি শর্মা অলী। বর্তমান মেয়াদে এটিই তার প্রথম ভারত সফর। নেপালী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বিভিন্ন দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নেপালে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ভারতপন্থী নেপালী কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে এবং প্রকাশ্য চীনপন্থী হিসাবে পরিচিত মি. কে পি শর্মা অলি কমিউনিষ্ট জোট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।


সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে এই বার্তা নিশ্চিত হয়েছে যে, নেপালী জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছে এবং তারা জাতীয় ইস্যুতে এখন বিকল্প মিত্রকেই ভরসা বাড়িয়েছে। কারণ, বৃহত্তর প্রতিবেশী ভারত এই অতিক্ষুদ্র প্রতিবেশীকে সমতার ভিত্তিতে মূল্যয়ন করেনি বরং ভারত দেশটির ওপর দু’দফা অবরোধ আরোপ করেছে। নেপালও পরাশক্তি চীনের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দিয়ে ভারতের বিষয়ে তাদের কঠোর অবস্থানের কথাও জানান দিতে মোটেই কসুর করেনি।  আর সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে এর পুরোপুরি প্রতিফলনও ঘটেছে।


এক ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন নেপালী প্রধানমন্ত্রী মি. কে পি শর্মা অলী। নির্বাচনের ফলাফল দেখে মনে হয়েছিল নেপাল ভারতের সাথে চিরবৈরিতার নীতিতেই অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু নেপালী প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিককালের ভারত সফর দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। মূলত ভারত এবং চীনের মধ্যবর্তী দেশ নেপাল। জাতিগত ভাবে নেপালীরা হিন্দু। এক সময়ে নেপালকে বলা হতো বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। নেপালে আইন ছিলো গো-হত্যা করলে মৃত্যুদন্ড হবে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশটাকে আগের নামে কেউ ডাকে না।


উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন পর নেপালের ফেডারেল পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো গত বছরের ডিসেম্বরে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত নেপালে এবারের কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে কমিউনিস্ট জোট সিপিএন এবং ইউএমএল পেয়েছে ৮০ আসন। মাওবাদী দল মাওয়িস্ট সেন্টার দখলে নিয়েছে ৩৬টি আসন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ২৩ আসন। ভারতপন্থী দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেপি)পেয়েছে ১১টি আসন, তাও মাধিসি অঞ্চলে। ভারতের বিহার রাজ্য সংলগ্ন নেপালের উত্তর-দক্ষিণ প্রলম্বিত সমতল অঞ্চলটিকে বলে মাধিসি। এখানে ভারতের বিহার এবং উত্তর প্রদেশের লোকজনের বসবাস বেশি।


নেপালের পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ২৭৫ টি। ১৬৫ আসনের ফলাফল নির্ধারিত হয় প্রত্যেক্ষ ভোটে আর ১১০ আসনের ফলাফল নির্ধারিত হয় আনুপাতিক হারে। শাসনতন্ত্র রচনা ও প্রদেশ বিন্যাসের সময় ভারত চেয়েছিলো মাধিসিকে একটা প্রদেশের মর্যাদা দেওয়া হউক। কিন্তু নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো একট্টা হয়ে ভারতের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলো। মূলত মাধিসিতে ভারতীয় মানুষের বসবাস হওয়ায় এটা স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা পেলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে- সে কারণে সম্ভবত নেপালিরা এতে রাজী হয়নি। মাধিসিকে চার ভাগে বিভক্ত করে চার প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে  পৌঁছতে নেপালকে বহু দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। নেপাল স্থলভূমি দ্বারা পরিবেষ্ঠিত দেশ। দীর্ঘ চারমাস ভারত আর মাধিসির লোকজন নেপালকে অবরোধ করে রেখেছিলো। নেপালের অভ্যন্তরে কিছুই পৌঁছতে পারেনি।


নেপালের এই চরম সংকটকালে বাংলাদেশ দেশটিকে মালামাল নেওয়ার জন্য সৈয়দপুর বিমানবন্দর ছেড়ে দিয়েছিলো। চীন ও অকাতরে সাহায্য করেছিলো হিমালয় দুহিতাকে। চীনের সঙ্গে নেপালের রোড কালেকশনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে ভারত অবরোধ আরোপ আর কঠিন কোনও দুর্যোগে পড়তে হবে না। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সস্ত্রীক নেপাল সফরে গিয়েছিলেন। কাঠমান্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দির দেখতে চেয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী হিন্দু না হওয়ায় পুরোহিতেরা তাকে মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়নি। এ অভিমানে রাজীব ভারতে এসে যোগাযোগের সব ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। এ অবরোধ দীর্ঘ চার মাস স্থায়ী ছিলো। যে কারণে তেলের অভাবে নেপালে গাড়ি-ঘোড়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।


ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর সময়ে প্রথমবার এবং নরেন্দ্র মোদির সময়ে দ্বিতীয়বার এই অবরোধের কারণে নেপালের জনগোষ্ঠী প্রচন্ড ভারত বিরোধী। অথচ বৃটিশেরা যখন ভারত ত্যাগ করে যাচ্ছিল তখন নেপালের রাজা ছিলেন ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ। নেপালীরাও বৃটিশকে একটা বার্ষিক কর প্রদান করতেন সত্য তবে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর চেয়ে তার মর্যাদা পৃথক ছিল। রাজা ত্রিভুবনের রাজদরবারে বৃটিশের কোনও রিজেন্ট ছিলো না। স্বাধীনভাবে রাজা ত্রিভুবন রাজ্য পরিচালনা করতেন।


বস্তুত রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি এখন নেপালে ভারতপন্থী একমাত্র দল। মাধিসিতে তারা ১১টি আসন পেয়েছে আর একটি প্রদেশে যৌথভাবে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি প্রথমে নির্বাচন বয়কটের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ভারতও চেয়েছিলো নির্বাচনটা স্থগিত হোক। রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নেপাল কংগ্রেসও নির্বাচন পেছানোর সুযোগ পেত। তখন নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতো।


নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক এটাই যে ভারতপন্থী বলে পরিচিত কংগ্রেস এবং আরজেপির ভরাডুবি হয়েছে। আর সমাজতন্ত্রীদের বিপুল বিজয় নেপালকে চীনের আরও খুব কাছাকাছি নিয়ে আসতে যাচ্ছে। কমিউনিষ্টদের বিজয়ের ফলে চীনই উপকৃত হবে। চীন নেপালে রেল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ করছে। কে পি ওলি ক্ষমতাসীন হওয়অর পর চীনের সাথে নেপালের গাঁটাছাড়াটা আরও মজবুত হবে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো নেপাল আগেই চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগে যোগদান করেছে।


নেপালের সঙ্গে চীনের সীমান্ত হলো ১৭৪৬ কিলোমিটার আর ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হলো ১২৩৬ কিলোমিটার। নেপালে বড় বড় ব্যবসায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেশী। ভারতীয় মুদ্রা রাষ্ট্রীয় মুদ্রার মতই চালু রয়েছে নেপালে। খুব সঙ্গত কারণেই ভারত-নেপাল শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং ঐতিহাসিকভাবে পরষ্পর আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু ভারতের অতিমাত্রায় দাদাগিরির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এতে ভাটির টান পড়েছে। নেপাল তার দক্ষিণের প্রতিবেশী ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উত্তরের প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর নীতিই গ্রহণ করেছে বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে। আর সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতপন্থী রাজনৈতিক দল নেপালী কংগ্রেসের ভরাডুবির কারণে বিষয়টি আরও সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই কারণে ভারতের অন্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি এবং পাক-চীন-রাশিয়া ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিষয়টিতে কিছুটা ভারসাম্য ফিরে আনার জন্য  ভারত সতর্ক কূটনীতিও শুরু করেছে সাম্প্রতিক সময়ে।


নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি আত্মস্বীকৃতভাবেই চীনপন্থী। নির্বাচনী প্রচারে নেপালের গ্রামে-গ্রামান্তরে ভারত বিরোধী কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল ওলির দলের জনসভাগুলিতে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর নিজের একাধিক পদক্ষেপ এবং কথাবার্তায় ওলি বুঝিয়ে দিয়েছেন, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নেপাল বাড়াবে। কিন্তু ভারত সফররত ওলি এখনও পর্যন্ত যা কিছু বললেন এবং করলেন, তাতে স্পষ্ট, নয়াদিল্লিকে সম্পূর্ণ দূরে ঠেলার পথে হাঁটতে পারছেন না তিনি। পর্যবেক্ষকমহল এমনটিই মনে করলেও সফর সমাপ্তির পর তাদের পর্যবেক্ষণ ভিন্নতরই মনে হচ্ছে।


সব দিক দিয়েই স্থলভাগে ঘেরা দেশ নেপাল। সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে নেপালের যোগাযোগ নেই। ভৌগোলিক কারণে নেপালের সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তা মেটানো চীনের পক্ষে কঠিন। চীনের কোনও বন্দর যদি ব্যবহার করতে চায় নেপাল, তা হলে যতখানি ঘুরপথে যাতায়াত করতে হবে, অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক হিসেবে তা লাভজনক নয়। পণ্য পরিবহণের জন্য নেপালের সামনে সবচেয়ে লাভজনক পথ ভারতীয় সমুদ্রবন্দরগুলি ব্যবহার করা। ভারত সফরে এসে নেপালি প্রধানমন্ত্রী সেই আশ্বাস পেয়ে গেলেন। ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ এবং সমুদ্রবন্দর নেপাল ব্যবহার করতে পারবে, দিল্লি এবং কাঠমান্ডু এমন সমঝোতায় পৌঁছল। সমঝোতা শুধু জলপথেই থেমে থাকল না, রেলপথেও দৌড়ল। ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ নেপালের রাজধানী পর্যন্ত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, এমনটাই স্থির হলো।


নেপালের সঙ্গে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার পথে পা বাড়িয়েছে চীনও। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের স্বপ্নের প্রকল্প ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-এ অংশগ্রহণ করছে নেপাল। কাঠমান্ডুর এই সব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে নয়াদিল্লির মাথাব্যথা বাড়িয়েছিল। এবার নয়াদিল্লি পদক্ষেপ বেইজিংয়ের মাথাব্যথা বাড়াবে। নেপালের জন্য ভারত নিজের জলপথ খুলে দেবে এবং ভারতীয় রেলকে নেপাল কাঠমান্ডু পর্যন্ত স্বাগত জানাবে, এমন খবর চীনের অস্বস্তি বাড়াবেই। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিবেশী চীনও বিষয়টি নিয়ে মোটেই নির্লিপ্ত থাকছে না।


সম্প্রতি নেপালী প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রেক্ষাপটে কোলকাতার আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত সফরে আসার আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার বিতর্ক বাড়িয়েছিল। কে পি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল ভারতের চেয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে থাকতেই বেশি পছন্দ করবে, এমন আভাস মিলেছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও তাই ঈষৎ শীতলতার বার্তা যায়। ওলিকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যাননি মোদি। পাঠান রাজনাথকে। বিমানবন্দরে রাজনাথকে পাঠানো যদি হয় শৈত্যের বার্তা, তা হলে বৈঠকে উষ্ণতা উপহার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন মোদি। অতএব দিনের শেষে ভারসাম্যের বার্তা গেল কাঠমান্ডুর কাছে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস নয়, আবার দূরে ঠেলাও নয় নেপালের জন্য ভারতের নীতি আপাতত এই ওলিকে তা বুঝিয়ে দেওয়া হলো।


দু‘টি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলো দিল্লি। প্রথমত, ভারত-নেপাল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। চীনের সঙ্গে নেপালের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিকে ভারত ভাল চোখে দেখছে না, কিন্তু দীর্ঘ দিনের আত্মীয়তাও ভুলে যাচ্ছে না। নয়াদিল্লি প্রথমত এই রকম অবস্থানই নিলো। দ্বিতীয়ত নয়াদিল্লি চীনকে বুঝিয়ে দিতে চাইল, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে অন্য সব দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা কোনওভাবেই সফল হওয়ার নয়। পশ্চিমে পাকিস্তান এবং উত্তরে চীন এই দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েন বিস্তর। কিন্তু বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানকেও ভারতের থেকে দূরে সরানোর যে চেষ্টা চীন চালাচ্ছে, তা সহজে সফল হওয়ার নয়। কারণ এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি ভারতের ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল এবং ভারত প্রয়োজন মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতেও থাকবে। এমনটা বুঝিয়ে দেওয়া হলো চীনকে। কারণ, দক্ষিণ এশীয় চীন এখন পরীক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত শক্তি।


চীনের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার উৎস হলো, ‘বোঝাহীন বিনিয়োগ’। এ অঞ্চলের দেশগুলো যেখানে ভারতীয় ঋণের সঙ্গে তাদের দুরভিসন্ধিমূলক রাজনৈতিক স্বার্থ দেখে, চীনের বিনিয়োগকে সেই তুলনায় অনেক নিরাপদ মনে করছে। চীনের এ সাফল্যের পেছনে কাজ করছে তাদের কূটনৈতিক সামর্থ্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং তথাকথিত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি।


চীনের বর্তমান সরকার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আগ্রাসী এবং উগ্র-জাতীয়তাবাদী। প্রেসিডেন্ট শির খোলামেলা ঘোষণা এখন এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক শক্তি হিসেবে বেইজিংয়ের উত্থানের সঙ্গে অন্যদের মানিয়ে  নিতে হবে। চীন এটা কখনই মেনে নেয়নি যে, দক্ষিণ এশিয়া ভারতের একচেটিয়া প্রভাবের অধীনে থাকবে। এখন তারা ধীরে ধীরে সে অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভারত যখন বড় দেশগুলোর সঙ্গে দফা-রফায় ব্যস্ত অথবা আঞ্চলিক নানা প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীন, চীন তখন এসব দেশের বাস্তব সমস্যায় নজর দিয়েছে, স্থানীয় দ্বন্দ্বগুলো কাজে লাগিয়েছে, যেকোনো সমস্যায় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একই নীতি নিয়ে কাজ করে চলেছে তারা। এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই এই অঞ্চলে চীন তার অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।


দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এখন কেবল ভূটান ও বাংলাদেশই ভারতের সবচেয়ে কাছের মিত্র। ভূটানের কোনো সেনাবাহিনী নেই, এক চুক্তি মোতাবেক ভারতই তাদের রক্ষাকর্তা। ফলে তারা কখনো ভারতের বলয় থেকে বের হবে, এটা কেউ ভেবেনি। কিন্তু গণচীন হাল ছাড়েনি। ক্ষুদ্র এই প্রতিবেশীর সঙ্গে সকল সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে গোপন কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে তারা। একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে ভূটানের সঙ্গে তারা ২৪ দফা আলোচনায়ও বসেছে। কিন্তু ভূটানের সঙ্গে কথা-বার্তা এগোলেও ভারতের বাধায় তা কার্যকর করা যাচ্ছে না বলে বছরের শুরুতে জানায় চীন। এর কিছু পরই দোকলাম নিয়ে শুরু হয় চীন-ভারত অচলাবস্থা। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভূটানের সঙ্গে গোপনে চীনের এই সম্পর্কোন্নয়ন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।


যদিও বাংলাদেশ এই মুহূর্তে নিবিড়ভাবে ভারতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তবু চীন উন্নতি করছে। বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, সহযোগিতার নানা ক্ষেত্র উন্মোচনে দুই দেশ একত্রে কাজ করছে। সম্প্রতি চীন  ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের শেয়ারমার্কেটে অংশীদারিত্ব পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেড়িয়েছে। হলে  বাংলাদেশ সরকার ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত রোহিঙ্গা বিষয়ক সমঝোতা চীনের প্রভাবেই ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। ওই অঞ্চলে চীনের প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে এ রকম কিছু দরকার ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেছে বললে, মিয়ানমারের পক্ষে পশ্চিমা চাপ কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য ছিল এ বিষয়ে একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি করা। কিন্তু সেখান থেকে চীনের প্রভাবেই সরে গেল দেশটি।


ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালে পিস অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিফ চুক্তি হয় নেপালের। সেই চুক্তির কিছু কিছু অংশ নেপাল যখন সংশোধন বা পরিবর্তন আনার  কথা বলছে তখনই চীন এমন প্রস্তাব দিয়েছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে ভারতকে জানাতে হবে অথবা ভারতের সম্মতি নিতে হবে নেপালকে। এখন চুক্তিটি সংশোধন করে এ সংক্রান্ত বিধিতে পরিবর্তন আনতে চাইছে নেপাল। একই সঙ্গে তারা এর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুগুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। এর আওতায় রয়েছে সামরিক সরঞ্জাম কেনা। নেপাল আর্মিতে সবচেয়ে বড় সামরিক সামগ্রীর যোগানদাতা এখনও ভারত। দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে রয়েছে চমৎকার সম্পর্ক। ১৯৫০ সাল থেকে দু’দেশের সেনাপ্রধানের মধ্যে সম্মানের সঙ্গে আলোচনার রীতি রয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।


দেশ দু’টির মধ্যে নিবির ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে চায় নেপাল। চীন যখন নেপালের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে তার ফলে এমন সিদ্ধান্তে ভারতে অসন্তোষজনক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। চীন ও নেপালের মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ আগেই। বিষয়টি নিয়ে ভারতে কুটনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করলেও তারা যে বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি তা বিভিন্ন ভাবেই জানান দিয়েছে।  ভারতীয় মিডিয়ার খবর ও বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিয়েছে, নয়া দিল্লি এমন সিদ্ধান্তে খুশি নয়।


যাহোক উভয় দেশের সম্পর্কের কিছুটা টানাপড়েনের মধ্যেই শেষ হলো নেপালী প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর। কুটনৈতিক মহলের তরফে বলা হয়েছিল যে, নেপাল বাস্তবতার কারণেই ভারতকে উপেক্ষা করতে পারবে না বরং তাদেরকে ভারতকে হাতে রেখেই সবকিছু করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে কিছু বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করেছিল। কিন্তু নেপালী প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ করে দেশে ফিরে যা বললেন তাতে দেশটি তাদের পূর্বের অবস্থানই শক্ত ভাবে জানান দিল। তিনি সফর পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে জানালেন যে, তিনি ভারতীয় পক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন, উন্মুক্ততা, পারস্পরিক সম্মান, হস্তক্ষেপহীনতা, পারস্পরিক সুবিধা, স্বাধীনতা, বৈধ পারস্পরিক স্বার্থ এবং মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে পররাষ্ট্র সম্পর্কের সূচনা করে নেপাল।


মূলত নেপালী প্রধানমন্ত্রী সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে যে বার্তা দিলেন ভারতের জন্য মোটেই কাঙ্খিত ছিল না বরং অলী সকল প্রকার আধিপত্যবাদ ও দাদাগিরির বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট বার্তাই দিলেন। যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের পক্ষে কাঙ্খিত এবং সম্মানজনকই মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহল। যা ভারতের অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

Print