‘গোপন বৈঠক’ করা কি অপরাধ? | timenewsbd.com

‘গোপন বৈঠক’ করা কি অপরাধ?

প্রভাষ আমিন
টাইম নিউজ বিডি,
০২ মে, ২০১৮ ১৮:৪২:০৯
#

প্রায় তিন মাস ধরে কারাগারে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।


অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে দেশে আগুন জ্বলবে। কিন্তু সে অর্থে তেমন কোনও সহিংস প্রতিক্রিয়া হয়নি। এটাকে বিএনপির ব্যর্থতা ধরে নিয়ে সরকারি দলের নেতারা বেশ আত্মপ্রসাদের ঢেকুর তুলছিলেন।


কিন্তু রাজপথে গণআন্দোলন গড়ে তোলার সামর্থ্য না থাকলেও অন্তর্ঘাত চালিয়ে পেট্রোলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার সক্ষমতা যে বিএনপির ভালোই আছে, সেটা তারা প্রমাণ করেছে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। কিন্তু আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালানো যে দলের জন্য ভালো নয়, সে উপলব্ধি তাদের আগেই হয়েছে।


তাই ২০১৫ সালের পর থেকে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চেষ্টা করে আসছে। এমনকি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসেনি বিএনপি।


কিন্তু বিএনপি যত নরম, সরকার যেন ততই গরম। দলের চেয়ারপারসন কারাগারে থাকলে নিয়মতান্ত্রিক হলেও বিএনপি তার প্রতিবাদ করবেই। কিন্তু সরকারের লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে প্রতিবাদও করা যাবে না। বিএনপির মানববন্ধন, লিফলেট বিতরণের মতো নিরীহ কর্মসূচিতেও পুলিশ বারবার হামলা চালিয়েছে।


প্রতিটি কর্মসূচি থেকেই নেতাকর্মীদের ধর-পাকড় করেছে। এমন একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে তারা ভয়ে কেউ আন্দোলনে অংশ নিতে না আসেন। পত্রিকার একটি খবর সে আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দেবে—‘গোপন বৈঠক’ থেকে বিএনপির ১৭ নেতাকর্মী আটক। খবরে জানা যায়, রবিবার রাতে বাংলামোটরের রূপায়ণ টাওয়ারে বৈঠক করছিলেন বিএনপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতারা।


পুলিশ সেখানে হানা দিয়ে ১৭ জনকে আটক করে। পুলিশের অভিযোগ, তারা সেখানে ‘গোপন বৈঠক’ করে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল। এর আগে গত ২০ এপ্রিল নড়াইল জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের গ্রামের বাড়ি নড়াগাতী থানার খাশিয়াল থেকে ‘গোপন বৈঠক’-এর সময় কেন্দ্রীয় নেতাসহ দলটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ৫৮ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ।


তাদের বিরুদ্ধেও ‘সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র ও নাশকতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির’ অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুলিশ কীভাবে জানলো এসব বৈঠকে বিএনপি নেতারা নাশকতার পরিকল্পনাই করছিল? বিএনপি একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। তাদের নিজেদের মধ্যে ঘরোয়া সভা-সমাবেশ করার অধিকার আছে।


এমনকি রাজপথে বা নির্ধারিত স্থানেও সভা-সমাবেশ করার অধিকার আছে। কিন্তু অনেক দিন ধরেই বারবার চেয়েও বিএনপি ঢাকায় কোনো সমাবেশ করার অনুমতি পাচ্ছে না। এখন পুলিশের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতরেও তারা বৈঠক করতে পারবে না।


এরশাদ আমলে মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়ে যেতো। ফিরে আসার প্রক্রিয়াটা শুরু হতো ঘরোয়া রাজনীতি দিয়ে। কিন্তু আমরা এখন গণতন্ত্রের এমন উৎকর্ষে অবস্থান করছি, ঘরোয়া রাজনীতিও যেন এখানে নিষিদ্ধ। পুলিশ বলছে, গোপন বৈঠকের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিএনপির নেতারা নিজেদের কৌশল ঠিক করতে বসবেন, সেটা তো গোপনেই বসবেন।


পুলিশকে জানিয়ে ঢাকডোল পিটিয়ে তাদের বৈঠক করতে হবে? এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ক’টা কর্মসূচি পুলিশের অনুমতি নিয়ে পালন করেছে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ? মানলাম এরশাদকে হটিয়ে পাওয়া গণতন্ত্রের স্বর্গরাজ্যে এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বা নয়াপল্টনে বা রাজপথে সভা-সমাবেশ করতে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে।


তাই বলে চার দেয়ালের মধ্যে বৈঠক করলেও তাদের অনুমতি নিতে হবে? এরপর কি পুলিশ বিএনপি নেতাদের বেডরুমেও হানা দেবে? কারণ, স্বামী-স্ত্রী দুজনই বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়, এমন অনেকেই আছেন।


আমি নিশ্চিত নড়াইল বা বাংলামোটরের বৈঠকে বিএনপি নেতারা উন্নয়নের জোয়ার নিয়ে গল্প করছিলেন না, শেখ হাসিনার প্রশংসা করছিলেন না। নিশ্চয়ই সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কীভাবে আরো বেগবান করা যায়, কীভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি ত্বরান্বিত করা যায়, কীভাবে খুলনা ও গাজীপুরে জেতা যায়, কীভাবে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসা যায়; তার কৌশল নিয়েই কথা বলছিলেন, শলা-পরামর্শ করছিলেন। তো এখানে অপরাধটা কোথায়? নাশকতা অপরাধ।


কিন্তু সরকারের বিরোধিতা করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়; এটা সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। সুনির্দিষ্ট মামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া, ঘরোয়া বৈঠক করার দায়ে কি পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারে? রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বৈঠক করা কি অপরাধ? যতক্ষণ তারা আইন হাতে তুলে না নিচ্ছে, নাশকতা না করছে; ততক্ষণ সেখানে পুলিশের ভূমিকা কী?


তিন বছর আগে বিএনপি পেট্রোল সন্ত্রাস চালিয়েছে; যারা সেটা করেছে, তাদের গ্রেফতার করুন, বিচার করুন। কিন্তু সেই অজুহাতে বারবার বিএনপির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা গলা টিপে ধরবেন; এটা হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়, এটা ঘোরতর অন্যায়। এ যেন সেই নেকড়ে আর মেষ শাবকের গল্প। পুলিশ বিএনপি নেতাদের ধরবে, সেটাই আসল কথা, অজুহাত যাই হোক।


কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন কোথাও বৈঠকে বসলে সেটা গোপন বৈঠক, সেটা অপরাধ। কিন্তু বিএনপি তো তেমন কোনো দল নয়। বিএনপি একটি নিবন্ধিত, নিয়মতান্ত্রিক দল। তারা দীর্ঘসময় ক্ষমতায় ছিল। এখনও দেশের মানুষের মধ্যে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। এমন একটি দলের সাথে আপনি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির মতো আচরণ করতে পারেন না।


২০১৫ সালের টানা ৯৩ দিনের অবরোধ আর পেট্রোল সন্ত্রাস যে ঠিক ছিল না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও তাদের আচরণে তা বুঝিয়ে দিয়েছে। সরকারের শত উস্কানিতেও তারা সংযত আচরণ করে যাচ্ছে। সরকারের উচিত বিএনপিকে নিয়মতান্ত্রিক পথে রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, বিএনপির এই ভালোত্ব কারো কারো ভালো লাগছে না।


আমরা ঠিক মনের সুখে বিএনপিকে গালি দিতে পারছি না। কিন্তু ঘরে-বাইরে নির্যাতিত, দমন-পীড়নে বাধ্য হয়ে বিএনপি যদি আবার পেট্রোলবোমা হাতে তুলে নেয়, তখন আমরা সবাই মিলে বলবো, এই দেখুন আগুন সন্ত্রাসীরা তাদের আসল রূপ নিয়ে আবার মাঠে নেমেছে। আর কারাগারে বসে নির্দেশনা দিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী হবে? বিএনপি না পুলিশ? আমরা কি নির্যাতন করে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিচ্ছি না?


শুধু গোপন বৈঠক করার দায়ে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে; অবিলম্বে তাদের মুক্তি দাবি করছি। বাংলা ট্রিবিউন।

Print