যে কারণে বৃদ্ধ মাহাথিরকেই বেছে নিলেন মালয়েশিয়ার জনগণ

মো: কামরুজ্জামান
টাইম নিউজ বিডি,
১২ মে, ২০১৮ ০৬:০৩:২৬
#

তথ্য-প্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিশ্বায়নের এই যুগে নতুন প্রজন্ম সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন প্রত্যাশী যার ছোঁয়া লেগেছে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়াতে। যে কারণে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা ছয় দশকের একক ক্ষমতার পালাবদল চাচ্ছিলেন। দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতি তথা রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিও এই প্রজন্ম ছিল দারুণভাবে ত্যক্ত বিরক্ত। এই পটভূমিতেই কি শেষ মেষ সব চেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন করে আরেকবার নাম লেখালেন মাহাথির মোহাম্মদ (Mahathir Mohamad)? এমনই নানা জটিল সমীকরণ চলছে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন জোটের জয়কে ঘিরে।


ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যারা একটানা শাসন করলেন তারা কিভাবে হেরে গেলো? হয়তো বা এর জবাবে অনেকে মালয়েশিয়ার সব শেষ ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করবেন। কারণ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে একটানা মানুষ যাদের পক্ষে রায় দিলেন কেন হঠাৎ করে তাদের দিক থেকে মুখ ফেরালেন? এই সময়ের মধ্যে কী এমন ঘটলো যে সব কিছু অন্যরকম হয়ে গেলো?


ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দেশ শাসনকারী সেই ঐতিহাসিক দলটির স্থপতিদের কথা ধরলে এখনো সবার আগে যার নাম আসবে তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন মাহাথির মোহাম্মদ। এক্ষেত্রে তার বয়স যে ৯২ বছর তা কোনো বড় বিষয় হয়ে দেখা দেয় না। এই দলের কর্ণধার হিসেবে যার রয়েছে বিশাল অভিজ্ঞতা এবং যিনি এই দলের হয়ে একটানা ২২ বছর দেশ শাসন করেছেন।


এবার সেই দলেরই বিপক্ষে গিয়ে জোট গড়লেন মাহাথির এমনই ছোট দলের সাথে যারা এ যাবত ক্ষমতার মুখ দেখেনি। নিকট অতিতেও হয়তো কেউ ভাবেননি যে এই দল শিগগিরই ছয় দশকের ক্ষমতাসীন দলকে ধরাশায়ী করবে। আঁতাত করলেন নিজের এককালের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের (Anwar Ibrahim) সঙ্গে যাকে এক নজীরবিহীন মামলায় এখনো কারাবরণ করতে হচ্ছে। একটানা বিশ বছর ধরে কারাগারে আটক থাকা আনোয়ার ইব্রাহিমের এই পরিণতিরও মূল নায়ক ছিলেন মাহাথির। আর সেই আনোয়ারকেই বা কিভাবেই ফের বাগে আনলেন মাহাথির? মাহাথির-আনোয়ার দ্বন্দ্ব যেন এখন কেবলই ইতিহাস।


১৯৯৮ সালে যখন মাহাথির মালয়েশিয়ার দোর্দন্ড প্রতাপের প্রধানমন্ত্রী তখন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা আনোয়ার ইব্রাহিম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে দাঁনা বাধতে থাকা রিফর্মাসি (Reformasi) হিসেবে খ্যাত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। আনোয়ার ইব্রাহিমের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা রীতিমতো হুমকি হয়ে ওঠে মাহাথিরের জন্য। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কবলে পড়েন আনোয়ার ইব্রাহিম। শেষমেষ মাহাথিরের জটিল কলকাঠিতে যৌন কেলেংকারির মতো লজ্জাজনক ও দীর্ঘ কারাভোগকারী মামলার দায়ে কারাগারে যেতে হয় আনোয়ার ইব্রাহিমকে যা বরাবরই অস্বীকার করছেন আনোয়ার। একটানা ২০ বছর ধরে চলছে সেই কারাভোগ। আজও যার অবসান হয়নি। সত্যিই এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার সেই আনোয়ার ইব্রাহিমকে সাথে নিয়ে কিভাবে জোট করলেন ৯২ বছরের বৃদ্ধ মাহাথির।


এশিয়া বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক প্রভাবশালী বিশ্লেষণধর্মী অনলাইন পোর্টাল নিউমান্ডালার (newmandala.org) একজন বিশ্লেষক কিয়ান ওং (Kean Wong) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, “আমার ধারণা মালয়েশিয়ার বিপুল সংখ্যক মানুষ দুই দশক আগের যেই সংস্কারকে ঘিরে মাহাথির-আনোয়ার দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছিল তাকে এক গভীর বোকামি বলেই মনে করেন। 


কিন্তু সেই সংস্কারেরই কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মাহাথির মোহাম্মদ যিনি দুর্নীতি পরায়ন সরকারব্যবস্থা (kleptocracy) এবং অন্যান্য নানা ইস্যুর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিয়ান ওং মনে করেন, আনোয়ার মাহাথিরের সেই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও এই দুই শক্তির একতাবদ্ধ হওয়া ছিল খুবই জরুরী। আর সেটা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন মাহাথির।


ক্ষমতার বাইরে থাকা বিগত ২০ বছরে অনুষ্ঠিত ৫টি সাধারণ নির্বাচন এবং সেক্ষেত্রে মানুষের চাওয়া প্রধান প্রধান সংস্কার বা পরিবর্তনগুলো খুব ভালোভাবে নখদর্পনে রয়েছে মাহাথিরের। রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত এই নেতা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছিলেন যে দেশটির একেবারে পশ্চাদপদ অঞ্চল (Malay Hinterland) ও কেন্দ্রভাগ বা শহরাঞ্চল (Heartland)- এর কোনটাতেই আনোয়ার ইব্রাহিমের একচেটিয়া প্রভাব অর্জন সম্ভব নয়। এসব অঞ্চলের ভোট ব্যাংক (crucial vote bank) যা নির্বাচনের হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে খুবই কার্যকর তা শুধুমাত্র মাহাথিরের ক্যারিশমা ও ইমেজকে ঘিরেই বাক্সে বন্দী করা সম্ভব।  


নাটকীয় উত্থান


মাহাথির তার এককালের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আনোয়ার ইব্রাহিমকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে তাকে যতই নির্যাতন করুক বা শাস্তি প্রদান করুক না কেন এখন তাদের জোটবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তিনি বোঝাতে সক্ষম হন যে তারা একসাথে কাজ করলে তাদের উভয়ের যে অভিন্ন শত্রু অর্থাৎ ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনালকে (Barisan Nasional) ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব।


এভাবেই এককালের প্রতিপক্ষকে সাথে নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মাহাথির বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ও সরকার কাঠামো যা এরই মধ্যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে তার বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেমে পড়েন। যদিও ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এই সরকারব্যবস্থা ও প্রথার জন্ম দিয়েছিলেন মাহাথির নিজেই এবং অদ্যাবদী সেই ব্যবস্থাই চালু রয়েছে। 


এদিকে, ক্ষমতাসীন বারিসন ন্যাশনাল ও এর নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক (Najib Razak) বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তর অর্থ কেলেংকারীর অভিযোগে রীতিমতো বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন। বিলিয়ন ডলারের (৭০ কোটি ডলার) এই মহা কেলেংকারী ওয়ানএমডিবি (1MDB-1Malaysia Development Berhad Scandal) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।


বিশ্লেষকরা মনে করেন এমনই পটভূমিতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এক ঝড়ো পরিবর্তনের (Seismic shift) জন্য মুখিয়ে ছিলেন। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক নেতাদের ফাঁকা বুলি ও দুর্নীতির কারনে নতুন প্রজন্ম ছিল খুবই বিরক্ত যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পর্যালোচনা করলে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়। আর এই সুযোগটিই দারুণভাবে কাজে লাগান পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ।


মাহাথির-আনোয়ার জোট যেন মানুষের মনের একেবারে গভীরে নাড়া দেন তাদের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে পাকাতান হারাপান (Pakatan Harapan) তথা আশার ঐক্য (The Alliance of Hope) এই বুলির মাধ্যমে।


বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাহাথির-আনোয়ার ঐক্য ছাড়া এই ঝড়ো পরিবর্তন কখনই সম্ভব হতো না। কারণ এটি এমনই এক জোট যা পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে যেমন আকৃষ্ট করতে পেরেছে তেমনি এককালের পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রোষ্টা আনোয়ার ইব্রাহিমকেও ফের ক্ষমতায় দেখতে চান এমন জনগোষ্ঠীকেও আকৃষ্ট করে এই জোট। চার বছরের জন্য নির্বাচিত এই জোটের দুই নেতা দুই বছর করে ভাগাভাগি করে দেশ শাসন করবেন বলে নানা সূত্রে জানা গেছে। তবে, চলমান বিশ্বব্যাবস্থায় বিদ্যমান অস্থিরতা ও কলহপ্রবন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির গতিকে আরো বেগমান করে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে শেষমেষ মাহাথির-আনোয়ার জোট কতটা সফল হবে তা বোঝা যাবে সামনের দিনগুলোতে। (সহায়ক সূত্র: আলজাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম)

Print