আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস

স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
১৬ মে, ২০১৮ ১৯:২৫:২৮
#

আজ ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সারাদেশের লাখ লাখ মানুষ রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে মরণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চে অংশগ্রহণ করেন।


দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনদুর্ভোগের জন্য তারা ওইদিন লংমার্চ করে ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানায়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন মহান নেতা মওলানা ভাসানী। তাই এ দিনটি আজও শোষণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং দাবি আদায়ের পক্ষে বঞ্চিতদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।


উল্লেখ্য, বাংলাদেশকে পানিশুন্য করতে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৭০ সালে শেষ হয় বাঁধটির নির্মাণকাজ। তখন পরীক্ষামূলকভাবে ভারত কিছু কিছু পানি ছাড়ে। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির মাধ্যমে ফারাক্কার বাঁধ চালু হয়।


আর ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেয় দেশটি, সেবারই মূলত চাহিদা অনুযায়ী পানি পেয়েছিল বাংলাদেশ, তারপর ১৯৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চাহিদানুযায়ী পানির নায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে বাংলাদেশ। অথচ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে, শীতকালের শুষ্ক মৌসুমেও পদ্মা নদী থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পেত বাংলাদেশ।


ওই দিন রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে লাখো লাখো প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারতবিরোধী নানা শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। বেলা ২টায় লাখো মানুষের স্রোত গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত যাপনের জন্য স দিনের মতো শেষ হয়। মাঠে রাতযাপন করে পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে।


ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এই লংমার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম মহান জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন।


মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’ মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লংমার্চ সমাপ্ত হলেও সেদিন ভারতীয় সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।


ভারতের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মায় আজ পানি নেই। ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্ধশত নদী বিলুপ্তির পথে। অন্য দিকে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে স্থানভেদে ২৫ ফুট থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।


ফারাক্কার অভিশাপে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়তই নিচে নামছে। এতে অগভীর কোন নলকূপ থেকে বর্তমানে কোন পানি উঠছে না। সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর স্থানভেদে ১-২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এরমধ্যে ২০১০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত = গোদাগাড়ী এলাকায় পানির স্তর ছিল মাটির ১৯ ফুট গভীরে। ২০১১ সালে স্থানভেদে ১৯-২১ ফুট। ২০১২ সালে ২০-২৩ ফুট এবং ২০১৩ সালে পানির স্তর ছিল স্থানভেদে ২৩-২৫ ফুট মাটির গভীরে।


চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রদান করবে। শুষ্ক মৌসুমের এ সময়ে ভারত বাংলাদেশকে চুক্তি অনুযায়ী পানি প্রদান করলে পদ্মায় অন্তত পানি প্রবাহ থাকার কথা। কিন্তু বান্তবতা একেবারেই ভিন্ন। গত নভেম্বরের প্রথম থেকেই পদ্মায় পানির প্রবাহ একেবারেই কমে গেছে।


জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মায় সর্বোচ্চ পানির পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ২৪ দশমিক ১৪ মিটার। গত কয়েক বছর থেকে পদ্মায় পানির পরিমাণ ১৩-১৪ মিটারে উঠা-নামা করে। তবে এক দশক পর গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপরে ১৮ দশমিক ৬২ মিটারে। পরদিন সকালে পদ্মার পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার নিচে এসে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৪৬ মিটারে।


গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির প্রায় ২১ বছর হতে চলল তবু পানি চুক্তি রিভিউ করা হয়নি। চুক্তি মতে ফারাক্কায় যে পানি জমছে তাই ভাগ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু গঙ্গা নদীর পুরো পানির ভাগাভাগির প্রসঙ্গ চুক্তিতে উল্লেখ নেই। তাই পদ্মা নদীতে চুক্তির পানি দিয়ে চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না।


সূত্র জানায়, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হলেও কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। এ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না। পালাক্রমে উভয় দেশের মধ্যে পানির ভাগ হয়ে থাকে।


১০ দিনের যেকোনো পালায় পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে দুই দেশের সরকার জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করে পানিবণ্টনে একটি সামঞ্জস্য বিধান করে থাকেন। ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক হলে বা তার কম হলে উভয় দেশ সমান সমান ভাগে পানি পায়। কিন্তু গঙ্গা নদীর পুরো পানির ভাগ দেয়া হচ্ছে না। অন্যান্য মাসে সমস্যা না হলেও মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে পানিসমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।


তাই বর্তমান সরকারের কাছে পানি চুক্তি রিভিউ করার দাবি তুলছেন ভুক্তভোগী মানুষ। শুকনো মওসুমে হার্ড্রিঞ্জ ব্রীজের উজান ও ভাটিতে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পদ্মা ও সব শাখা নদীর কঙ্কাল বেরিয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে। বিঘ্ন ঘটেছে সেচকাজে। সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে নৌপথ। পদ্মার দুই পাড়ের মানুষ আর্সেনিকসহ অজানা রোগে ভুগছেন। জলবায়ুতে সূচিত হয়েছে বড় ধরনের পরিবর্তন। বেড়ে যাচ্ছে তাপমাত্রা, বাড়ছে খরার আবহ।


থেকে থেকে রাজশাহী ও পাবনায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। লাখ লাখ মানুষ বহুমুখী সঙ্কটে ডুবে যাচ্ছে। পদ্মা নদী তার স্বয়ংক্রিয় পরিশোধনক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফারাক্কার প্রভাবে শুধু পাবনা জেলাতেই ২০ নদীতে পানি নেই। এর মধ্যে বেশ কিছু নদী এখন বিলীন হয়ে গেছে। এসব বিলীন হওয়া নদীতে বিভিন্ন মওসুমি ফসল উৎপাদন হচ্ছে। অনেকে জবর দখল করে বাড়ি নির্মাণ করছেন।


সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মা নদীর বুকে বিশাল বিশাল বালুচর পড়েছে। সেখানে ফুটবল খেলা হচ্ছে, গরু-মহিষের গাড়ি চলছে। হেঁটেই এখন নদী পার হওয়া যায়। পদ্মার মূল নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেক দূরে (প্রায় পাঁচ কিলোমিটার) সরে গেছে। পদ্মার সেই অপরূপ যৌবন ও সৌন্দর্য আর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে দেশের বৃহৎ এ অঞ্চলটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। মরুকরণ দেখা দেবে। অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


চলনবিল অঞ্চলের প্রবীণ লোকেরা জানান, চলনবিলসংলগ্ন ১৬টি ছোট নদী, ৩৯টি ছোট বিল ও ৩২টি খাল ছিল। এসব নদী ও খাল এখন শুধু প্রবীণ মানুষদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। বাস্তবে এর বেশির ভাগের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফারাক্কা বাঁধের পর এসব নদী ও খাল শুকিয়ে গেছে। এখন এখানে হচ্ছে বিভিন্ন মওসুমি ফসলের চাষাবাদ। এসব নদী খাল শুকিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার জেলে তাদের পেশা ছেড়েছেন। এদের কেউ রাজমিস্ত্রি হয়েছেন, কেউ সবজি বিক্রি করছেন আবার কেউবা রিকশা চালাচ্ছেন। আর যুগ যুগ ধরে সংসার চালানো এই পেশায় এখনো যারা রয়ে গেছেন, তাদের দিন কাটছে একবেলা খেয়ে না খেয়ে। পদ্মায় পানি না থাকায় কৃষিপ্রধান পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলে কৃষি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।


দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে ভারত থেকে ন্যায্য পানির হিস্যার দাবিতে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)।


এতে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট নেতা এবং পানি বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখবেন। এছাড়া, নাগরিক পরিষদ ফারাক্কা লংমার্চ দিবসকে জাতীয়ভাবে পালনের দাবি জানিয়েছে। আজ বিকাল ৩টায় ‘ডেমোক্রেটিক এ্যালায়েন্স’ “ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং-মার্চ দিবস” স্মরণে তোপখানা রোডের অ্যালায়েন্সের কার্যালয়ে একটি আলোচনা সভা করবে।


 


জেড

Print