মাদকের পৃষ্ঠপোষক ৫ ওসিসহ ১৬ পুলিশ | timenewsbd.com

মাদকের পৃষ্ঠপোষক ৫ ওসিসহ ১৬ পুলিশ

স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
০২ জুন, ২০১৮ ১৫:৩৭:৩০
#

সীমান্তবর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এর সীমান্তবর্তী তিনটি থানা মাদক পাচারের অন্যতম রুট। এখানে সক্রিয় রয়েছেন শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যোগসাজশে এ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক ঢুকছে দেশে।


অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের টাকা মাসোয়ারার বিনিময়ে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় ওই মাদক নিরাপদে পাচার হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখানকার মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকের তালিকা তৈরি করেছে।


এতে রয়েছে ১২৭ জনের নাম। এর মধ্যে রয়েছে তিন থানার পাঁচ ওসিসহ ১৬ পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় ৭ জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাও।


মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বারবার পুলিশের নাম উঠে আসায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।


তারা মনে করছেন, মাদকের পৃষ্ঠপোষক পুলিশ, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় না এনে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ধরে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা যাবে না।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী এ জেলার তিন থানা বিজয়নগর, আশুগঞ্জ ও আখাউড়া দিয়ে প্রতিদিন মাদক ঢুকছে। এ তিন থানার পাঁচ ওসি এবং কসবাসহ চার থানার ১১ সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকেন।


তারা মাদক আনা, সারা দেশে পাচার ও স্থানীয়ভাবে বিক্রিতে মদদ দেন মাসোয়ারার বিনিময়ে। মাসোয়ারার পরিমাণ ২০ টাকা থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা।


স্থানীয়রা আরও জানান, এসব পুলিশ সদস্যের সহায়তাতেই সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় মাদক দেশে ঢোকে। পরে রেল ও বাসে চলে যায় বিভিন্ন স্থানে।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট এসএম ইউসুফ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। সেক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধানদের দায়িত্ব নিতে হবে।


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যদি তদন্তে পুলিশ সদস্যদের মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ বিভাগে তাদের চাকরি করার দরকার নেই।’


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, এ সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তালিকা হাতে পেয়েছি। পাঁচ ওসিসহ ১৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।


এ প্রসঙ্গে জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. বাহাউদ্দিন বলেন, মাদকের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে কোনো সদস্যই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, যদি পুলিশের কোনো সদস্য মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে বিভাগীয় প্রধানদের উচিত দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।


এ নিয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যুগান্তরকে বলেন, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। পুলিশের কোনো সদস্য মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে আমরা তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইয়াবা ও মাদক বিক্রির টাকাসহ এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।


১৬ পুলিশ সদস্য : মাদক কারবার ও সরবরাহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখায় পাঁচ ওসির নাম এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায়। সবার উপরে রয়েছেন আখাউড়া থানার ওসি মোশাররফ হোসেন তরফদারের নাম।


এরপরে পর্যায়ক্রমে রয়েছেন- বিজয়নগর থানার ওসি আলী আরশাদ ও ওসি (তদন্ত) কবির হোসেন, আশুগঞ্জ থানার ওসি বদরুল আলম তালুকদার ও ওসি (তদন্ত) মো. মেজবাহ উদ্দিন।


এছাড়াও তালিকায় নাম রয়েছে- আখাউড়া থানার এসআই আবদুল আহাদ, ছাদেক মিয়া, কামরুল হাসান, আশুগঞ্জ থানার এসআই আবুল কালাম (সম্প্রতি অবসরে গেছেন), আমজাদ হোসেন (সম্প্রতি কিশোরগঞ্জে বদলি), মোমেন মিয়া, মানিক মিয়া, কসবা থানার এসআই মুজিবুর রহমান-১, মুজিবুর রহমান-৩, সোহেল শিকদার ও মনির হোসেন-২।


জানতে চাইলে আখাউড়া থানার ওসি মোশাররফ হোসেন তরফদার বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার নাম দেয়া হয়েছে। মাদকের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তদন্ত কমিটির কাছে এ বিষয়ে আমি আমার বক্তব্য দিয়েছি।


আশুগঞ্জ থানার ওসি বদরুল আলম তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে যদি আমার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।


সাত জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা : মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তালিকায় নাম রয়েছে- আখাউড়া কুড়িপাইকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হান্নান ভূঁইয়া স্বপন, নুরপুর ইউপি সদস্য হান্নান মিয়া, কসবা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কমিশনার আবু সাঈদ, কসবা বায়েক ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আল আমিন, বায়েক ইউপি আওয়ামী লীগ সভাপতি মনিরুল হক মনিরের ভাই দুলু ও বাবুল হোসেন।


জানতে চাইলে কুড়িপাইকা চেয়ারম্যান হান্নান ভূঁইয়া স্বপন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি পরপর দু’বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। জনপ্রিয়তায় কারণে প্রতিপক্ষ মাদকের তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়েছে। এটা যড়যন্ত্র।


তিনি বলেন, মাদকসংশ্লিষ্টতার কারণে আমি আমার চাচাতো ভাইকেও জেলে দিয়েছি। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে এখন আমি মাদকের গডফাদার। আমি এ অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।


পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে বুধবার (৩০ মে) পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৪ মাদক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর বড় অংশই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত।


সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে এ পর্যন্ত এই জেলা থেকে ২৪৩ মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এছাড়া প্রথম রোজা থেকে বুধবার পর্যন্ত ১২ দিনে ৮৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মাদক মামলা হয়েছে ৬৫টি। এএস

Print