ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের আহবান: আল-কুদস দিবসে বক্তারা | timenewsbd.com

ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের আহবান: আল-কুদস দিবসে বক্তারা

স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
০৯ জুন, ২০১৮ ০২:০৯:৫২
#

মুসলমানদের প্রথম পবিত্র কেবলা জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদকে রক্ষার দায়িত্ব সব মুসলমানদের। যায়নবাদী ইসরাইলি দখলদারিত্ব থেকে এই পবিত্র বায়তুল মাকদিস  আল কুদস আল শরীফকে রক্ষায় ব্যর্থ হলে ইহুদিবাদী শক্তি আরো নির্মমভাবে মুসলমান বিশ্বকে ধ্বংস করে দেবে। তাই শিয়া-সুন্নীসহ ইহুদি-খ্রিস্টান চক্রের কুটকৌশলে সৃষ্ট সব ভেদাভেদ ভুলে গোটা মুসলিম বিশ্বকে একতাবদ্ধ হতে হবে।


আন্তর্জাতিক আল কুদস দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় “আল-কুদস ও ফিলিস্তিনের উপরে ইসরাঈলি দখলদারিত্বের ৭০ বছর : মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব“- শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এমন মন্তব্য করেন।


আজ (শুক্রবার) বিকেলে আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওর্য়ার্কাস পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। 


সেমিনারে বক্তারা বলেন, সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী চলছে ইহুদিবাদের নেপথ্যে সাম্রাজ্যবাদীদের মহানাটক। এ নাটকের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। মাঝে মধ্যেই ইউরোপ আমেরিকায়ও এর কিছুটা আঁচ লাগে। নাটকের উদ্দ্যেশ্য একটাই। মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং শান্তির ধর্ম ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বিতর্কিত করা।


ঐতিহাসিক নানা ঘটনার বিশ্লেষণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতেই আল-কায়েদার পরে ইসলাম ও খিলাফতের নাম ভাঙ্গিয়ে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে হাজার হাজার মুসলিমকে হত্যাকারী আইএস-এর মতো- সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজনেই তৈরি করছে ইসরাইল ও তাদের প্রধান দোসর সাম্রাজ্যবাদী ইঙ্গ-মার্কিন জোট।


বক্তারা বলেন, দখলদার ইহুদিরা ঐতিহাসিকভাবেই এমন এক জাতি যারা মহান আল্লাহকে গালি দেয়, এরাই একমাত্র জাতি যারা শত শত নবী-রাসূলকে হত্যা করেছে, নিজেদের ধর্মগ্রন্থকে বিকৃত করতে করতে এমনই এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে তার সিকিভাগও আর সঠিক অবস্থায় নেই।


তারা বলেন, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দালালি করে কোনো কোনো মুসলিম নামধারী দালাল ইসরাইল ফিলিস্তিনের পাশাপাশি অবস্থানের পক্ষে সাফাই গাইছে মন্তব্য করে বক্তারা বলেন, ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে ছরির মতো বসিয়ে দেয়া ইসরাইলের সাথে কখনো সহাবস্থান হতে পারে না। এই খুনী, লুটেরা ও দখলদাররা কখনোই মুসলমানদের শান্তিতে থাকতে দিবে না।


মুসলমানদের মুক্তির এখন একটাই পথ আর তা হলো পবিত্র কুরআনকে বুকে ধারণ করে সব ভেদাভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হয়ে পবিত্র জেরুজালেম তথা আল-আকসাকে পুনরুদ্ধার করা।


তারা বলেন, ইহুদীবাদী চক্রের এজেন্টরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদী জঙ্গী গোষ্ঠী সৃষ্টি করছে, যারা পরস্পরকে কাফির ফতুয়া দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।


ইহুদীবাদীদের এই ভয়ানক ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.) ফিলিস্তিনের মুক্তির লক্ষ্যে মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র রমযান মাসের শেষ শুক্রবারকে 'আল-কুদস দিবস' হিসেবে পালন করার আহ্বান জানান। সেই থেকে প্রতিবছর আল-কুদস দিবস পালিত হয়ে আসছে।


বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এতে আরো বলা হয়, একদিকে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গ ও ইহুদি চক্র ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে; অন্যদিকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইয়েমনসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে বেআইনিভাবে ড্রোন হামলা চালিয়ে মুসলমানদের হত্যা করছে।


পাশাপাশি ইহুদিবাদী চক্রের এজেন্টরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদি জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টি করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। আবার ইসলামের দোহাই দিয়ে মাযহাবি বিতর্ক চাঙ্গা করে ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে।


এ অবস্থায় মুসলিম উম্মাহকে ইহুদিবাদীদের গভীর ষড়যন্ত্র থেকে সতর্ক থেকে আল আকসা মসজিদ মুক্তি সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায় আল-কুদস কমিটি বাংলাদেশ।


বক্তারা বলেন,  বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে ইসলামের প্রথম কিবলা এবং মক্কা মুআয্যামাহ ও মদিনা মুনাওয়ারার পরে তৃতীয় পবিত্র স্থান। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মক্কার মসজিদুল হারাম, মদীনার মসজিদুন্নবী ও বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের উদ্দেশ্যে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা অন্য কোন মসজিদ সম্পর্কে করেন নি। হিযরতের পর বায়তুল মুকাদ্দাস ইসলামের প্রথম কিবলা।


তারা বলেন, বায়তুল মুকাদ্দাস দুনিয়ার জন্য অসংখ্য ভূখন্ডের মত কোনো সাধারণ ভূখন্ড নয়। এ পবিত্র ঘর থেকেই খাতামুন্নাবীয়ীন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মিরাজে গমন করেছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশে পাশের এলাকা বহু নবীগণের স্মৃতি বিজড়িত। এই পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সাথে জড়িত নয়; বরং এই নাম সকল মুসলমানের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলের মাযার। ওহী ও ইসলামের অবতরণ স্থল এ নগরী নবীগণের দ্বীন প্রচারের কেন্দ্রভূমি। তাই এ পবিত্র নগরীর প্রতি ভালবাসা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীর প্রোথিত।


সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্য প্রফেসর আ ন ম মেশকাত উদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা আহমাদ বদরুদ্দিন এবং বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আফতাব হোসেন নাকাভী।


সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক আজকের ভোলার সম্পাদক অধ্যক্ষ শওকাত হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ-এর সহ-সভাপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জনাব এ.কে.এম. বদরুদ্দোজা। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও আল কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ-এর সভাপতি প্রফেসর ড. শাহ কাউছার মুস্তফা আবুলউলায়ী।


সেমিনারে বক্তরা আরও বলেন, ফিলিস্তিন সমস্যার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও তাদের সহযোগিরা কখনো সরাসরি, কখনো জাতিসংঘের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘শান্তি শান্তি খেলা খেলেছে। চক্রান্তকারী ইহুদিরা নতুন নতুন নীল নকশা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাই আজ সময় এসেছে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বের সকল মানবতাবাদী মানুষকে এ সংগ্রামে সর্বাত্মক সমর্থন জানাতে হবে।


বক্তরা বলেন, বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের সূচনা করে মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। সেক্ষেত্রে কিছু কিছু মুসলিম দেশের আচরণ ইসরাইলকে সফল হতে সাহায্য করছে। মুসলমানদের এক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে ভুলে গেলে চলবে না। বরং এ অবস্থায় মুসলিম উম্মার দায়িত্ব আরো অনেক বেড়ে গেছে।


তারা বলেন, ফিলিস্তিনের ইস্যূ কেবল মুসলমানদের ইস্যু নয়, এটি একটি মানবতাবাদী ইস্যু। ফিলিস্তিন সমস্যা ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের সমস্যা নয়। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পূর্বে ফিলিস্তিনে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টানরা একত্রে শান্তিতে বসবাস করছিল। যখন ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিন দখল করে তখনই ফিলিস্তিন সমস্যা তৈরি হয়। ইসরাইল ফিলিস্তিন ইস্যুকে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সমস্যা হিসেবে চিহ্ণিত করতে চায় । এ কারণেই ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনী এটিকে বিশ্ব মুসলিমের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আল কুদস মুক্তির লক্ষ্যেই রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস ঘোষণা করেন।


এর আগে  বেলা ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় | মানববন্ধন থেকে ফিলিস্তিনে ইসরাইলী আগ্রাসন বন্ধের আহবান জানানো হয়। সকল নম্রতা ও নিয়ম-কানুনকে উপেক্ষকারী দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে এক হওয়ারও আহবান জানানো হয় মানববন্ধন থেকে।


কেবি 


 

Print