যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে কারাবন্দি রোহিঙ্গা নারীরা: ইউরোপীয় কাউন্সিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০৮ জুলাই, ২০১৮ ১৬:২৪:১৫
#

ইউরোপীয় রোহিঙ্গা কাউন্সিল অভিযোগ করেছে, শতাধিক রোহিঙ্গা নারী ও শিশুকে মিথ্যা অভিযোগে বুথিয়াডং কারাগারে আটকে রেখেছে মিয়ানমার। তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাউন্সিলের মুখপাত্র আনিতা শাগ দাবি করেন, নারী কারাবন্দিরা সেখানে সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের মুক্তি নিশ্চিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন শাগ।


গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে।


মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুড়তে থাকে সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা।


গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের এক তদন্ত দল তাদের অনুসন্ধানে জানায়, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারীরা ধারাবাহিকভাবে সে দেশের সেনাবাহিনীর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বেশিরভাগ রোহিঙ্গা পালিয়ে এলেও এখনও যারা সেখানে আছেন, তারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।


তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মুখপাত্র শাগ বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক অনাহারে রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা।


তাছাড়া, ১০২ জন রোহিঙ্গা নারী ও শিশুকে ‘মিথ্যা’ অভিযোগে বুথিয়াডং কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। নারী কারাবান্দিরে ওপর সেখানে যৌন নিপীড়ন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শাগ আরও জানান, গত পাঁচ বছর ধরে ৭০০ থেকে ৮০০ রোহিঙ্গা সৌদি আরবের কারাগার থেকে মুক্তির জন্য দিন গুনছে।


এর আগে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের অনাহারে রেখে বিতাড়নের কৌশলের কথা জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছিল,পশ্চিম রাখাইনের খাবারের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাধা দেওয়া হয়েছে ত্রাণ বিতরণেও।


২০১৮ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অ্যান্ড্রু গিলমোর বলেছিলেন,রোহিঙ্গা বিতাড়নে ‘সহিংসতা ও অভুক্ত রাখার’কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে।


মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠন ডক্টর্স উইদাউট বর্ডারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অন্তত ৯,৪০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংগঠনটি আরও জানায়, নিহতদের ৭১.৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬,৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছে সহিংসতার কারণে। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী ৩০টি শিশুও রয়েছে।


উল্লেখ্য,প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের।


এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র,কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ,কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড,কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।


গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও মিয়ানমার শুরু থেকেই তাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার।


তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা,কথিত বৈধ কাগজপত্রের অজুহাতসহ নানা কারণে প্রক্রিয়াটি এখনও বিলম্বিত করে যাচ্ছে মিয়ানমার। একজন রোহিঙ্গাও ওই চুক্তির আওতায় রাখাইনে ফিরেছে বলে জানা যায়নি।


এরইমধ্যে পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা আবাস বুলডোজারে গুড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। এক পর্যায়ে সেনা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও অব্যাহত রাখা হয়েছে জাতিগত নিধন। সামরিকায়নকে জোরালো করতে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে অবশিষ্ট ঘরবাড়িও।


 

Print