বলদর্পিতা সুশাসনের জন্য সহায়ক নয়

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
টাইম নিউজ বিডি,
১২ জুলাই, ২০১৮ ১৮:২০:৫৫
#

দেশে যে সুশাসন নেই একথা বুঝতে খুব একটা পান্ডিত্য অর্জনের দরকার নেই বরং এক্ষেত্রে গরু-ছাগল চেনার মত জ্ঞানই যথেষ্ঠ হবে। অবশ্য এই ফর্মূলাটা আমাদের অজানায় থেকে যেত যদি না আমাদের নৌমন্ত্রী মহোদয় বলতেন যে, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে গরু-ছাগল চেনার যোগ্যতাই যথেষ্ট’।


মূলত মোটরযান চালাতে যে ধরনের যোগ্যতার প্রয়োজন হয় তার চেয়েও সহজ কাজ হচ্ছে আমাদের দেশের সুশাসনের সূচক সম্পর্কে ধারণা লাভ। কারণ, যে অবস্থা চলছে তাতে দেশের সকল শ্রেণির নাগরিকের মধ্যে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, তারা প্রতিনিয়ত অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সরকার তাদের নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নিতে পারছে না বা দিচ্ছে না। ইত্যকার যত অভিযোগ এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।


মূলত নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষে যেধরনের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা তা কিন্তু হচ্ছে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বা পৃষ্ঠপোষকতায় গণমানুষের অধিকার ক্ষুন্ন করার অভিযোগ একেবারে উপেক্ষা করার মত নয়। নাগরিকরা নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় থাকছেন। বিষয়টি এখন আর কারো কাছেই অপ্রকাশ্য নেই। তাই দেশের হাল-হাকিকত সম্পর্কে সম্যক ধারণাটা প্রায় সকলেই কাছেই স্পষ্ট। তাই বিষয়টি তেমন রাখ-ঢাক করার খুব একটা প্রয়োজন নেই। আমরা যে প্রতিনিয়ত অধিকার বঞ্চিত হচ্ছি বা থাকছি একথা এখন মোটামোটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়।


সাংবিধানিকভাবে আমাদের দেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সঙ্গত কারণেই গণতন্ত্র আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। তাই শাসন ব্যবস্থার সকল পর্যায়েই জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কাম্য। বর্তমান বিশ্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব। মধ্যযুগের পরিসমাপ্তির পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শুণ্যস্থান পূরুণ করে নিয়েছে। সীমিত পরিসরে এর কুফল থাকলেও সুফলই বেশি। অতি প্রাসঙ্গিকভাবেই গণতান্ত্রিক ভাবধারার মধ্যেই বিশ্বের অপরাপর জাতিরাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। এক্ষেত্রে তাদের সাফল্য রীতিমত ঈর্শ¦নীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যা বর্তমান বিশ^ব্যবস্থার খোলনলচেই পাল্টে দিয়েছে এবং আমরা নতুন এক বিশ^ব্যবস্থার হাতছানিই দেখছি।


দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বিষয়ে আমরা অনেকটাই পশ্চাদপদ। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা হচ্ছে অবাধ গণতন্ত্রায়ন। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় ৫ দশক অতিক্রান্ত হলেও আমরা আজও জনগণকে শাসন ক্ষমতায় অন্তর্ভূক্ত করতে পারিনি। এমনকি তারা বরাবরই উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন। অথচ জনগণ ও গণতন্ত্রের নাম ভাঙিয়ে সব কিছুই করা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছও হচ্ছেন। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলে তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে নিচ্ছেন। কিন্তু আম জনতার ভাগ্যে জুটছে একেবারেই অশ্বডিম্ব। মূলত গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ছদ্মাবরণে যা চলছে তা গণতান্ত্রিক ভাবধারার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয় না।


অতীত পর্যালোচনায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, জনগণকে উপেক্ষা করে কোন জাতি উন্নতির মহাসড়কে উঠতে সক্ষম হয়েছে বরং এর উল্টোটায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যারা শাসনকাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে, তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির গ্রাফটা বেশ উর্দ্ধমূখী।


একথা অনস্বীকার্য যে, ফরাসী বিপ্লবের পর ফরাসী জাতি বিপ্লব পরবর্তী সমস্যা অতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। তারা শাসনকাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে সফল হয়েছিলেন। আর অতিদ্রুত তারা এর ফসলটাও ঘরে তুলতে পেরেছিল। কারণ, শাসনকাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা জাতীয় দায়িত্ব পালনে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ততা জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাদের কার্পণ্য ও উদাসীনতা বেশ চোখে পড়ার মত। আমরা আত্মপুঁজা করতে করতে এখন আত্মপুঁজারী জাতিতে পরিণত হতে চলেছি। আর আমাদের বেহাল দশার জন্য আমাদের এই নেতিবাচক মানসিকতাও অনেকাংশে দায়ি। কিন্তু এ বৃত্ত ভাঙার জন্য আমরা কেউই এগিয়ে আসছি না।


জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এটাই আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পৌণপৌণিক ব্যর্থতার কারণেই আমরা এখনও সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই এই হলো আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবস্থা। দেশে যে গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্চাচারিতা চলছে তা ক্ষমতাসীনরা ছাড়া আর কেউই হয়তো অস্বীকার করেন না।


মূলত যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের সাথে বাস্তবতার সম্পর্কটা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, তাদের চোখে ক্ষমতার রঙিন চশমা সোভা পায়। ফলে তারা এখন সব কিছুকেই রঙিন মনে করেন। কিন্তু কালের গতিধারায় যখন তা নাসিকার ওপরিভাগ থেকে নিসৃত হবে তখন সবকিছুই যথারীতি ফ্যাকাসে হয়ে উঠে। মহাত্মা ওমর খৈয়ামের ভাষায় , ‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যায়, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে।.....’ কিন্তু ততক্ষণে অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। তাই তা আম জনতার কোন কাজে না। কারণ, ক্ষতি যা হবার তা তো আগেই হয়ে যায়। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতির অবস্থা খুবই সঙীন।


আমাদের দেশের চলমান সংকট গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই। ভঙ্গুর ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রই আমাদের জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রেই একটা অনাকাঙ্খিত অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাই জাতিকে এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে হলে দেশে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গী খুবই নেতিবাচক।


কয়েকদিন আগে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিতে বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রীর একটা বক্তব্য শোনা গেল। কিন্তু এটি তার বার্ধক্যজনিত প্রলাপ কি না তা ঠিকমত ঠাহর করা গেল না। তিনি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে যা বললেন তা মানুষের জন্য বিনোদনেরও খোরাক হয়েছে বলেই মনে হলো। তার কথা শুনে কেউ কেউ মৃদু হাসলেন। কিন্তু মন্ত্রীবরের মধ্যে কোন ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না।


তিনি দাবি করলেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে হাজার হাজার লাখ লাখ নির্বাচন হয়েছে। তার সবগুলোই নাকি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। অবশ্য একথা ঠিক যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যত নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচন আওয়ামী লীগের কাছে অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কারণ, যেভাবেই হোক নির্বাচনে তারা বা তাদের দলই নির্বাচিত হয়েছেন। তাই এসব নির্বাচন দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও বা কেউ প্রশ্ন তুললে তো তেমন সমস্যা হবার কথা নয়।


একথা সত্য যে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে জনসম্পৃক্ততা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তাই এসব নির্বাচন নিয়ে জনগণের আগ্রহেরও ভাটা পড়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটাদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এরপরও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা যায়নি। তাই এই সরকারের আমলে দেশে লাখ লাখ নির্বাচন হয়েছে এসব কথায় মানুষেরও হাসির উদ্রেগ হওয়ার কথা। যদি কেউ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী না হয়ে থাকেন।


বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী মাঝে মাঝেই হাস্যরসের সৃষ্টি করতে বেশ করিৎকর্মা। তিনি কিছুদিন আগে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটকে তিনি তার জীবনের শেষ বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিন্দুকেরা তার একথা নিয়ে বেশ সন্দেহই পোষণ করেছিলেন। তাদের ধারণা অর্থমন্ত্রী শুধু কথার কথায় বলেছেন। বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় নিন্দুকদের কথায় সত্যে প্রমাণিত হলো।


তিনি নতুন করে ঘোষণা দিয়ে বললেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ যদি নির্বাচন করেন তাহলে তিনিও নির্বাচন করবেন। সাবেক রাষ্ট্রপতির নির্বাচন করার সাথে অর্থমন্ত্রীর অবসর গ্রহণের সম্পর্ক কী তা বিলক্ষণ আবিস্কার করা গেল না। তবে একথা বলা অত্যুক্তি হবে না ক্ষমতার মোহ যাদেরকে একবার পেয়ে বসে, তার সে মোহ ভঙ্গ হওয়ার তেমন একটা সুযোগ থাকে না। এমনটা কালেভদ্রেও দেখা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে। তাই অর্থমন্ত্রী যে কোন কিছু থেকেই অবসর নিচ্ছেন না একথার ওপর জোর দেয়ার সুযোগটা বিলক্ষণ থেকেই যাচ্ছে।


দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের ভোটাধিকার কী অবস্থা তা দেখতে খুব একটা পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। কারণ, অর্থমন্ত্রী ভাষায় দেশের লাখ লাখ নির্বাচনের মধ্যে সম্প্রতি দু’একটা নির্বাচন হলে গেল। বিশেষ করে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একেবারে তরতাজা ঘটনা। কিন্তু এসব নির্বাচনে যে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও ভোট ডাকাতির মহড়া প্রদর্শন করা হলো তা কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির আওতায় পরে? নির্বাচনে যদিও আগের মত সহিংসতা হয়নি। তবে ভোট চুরিতে যে অভিনব কৌশল আবিস্কৃত হয়েছে তা তো আর কেউ অস্বীকার করে না। মূলত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেই সর্বপ্রথম ভোট ডাকাতির অভিনব কৌশল প্রয়োগ করা হয়। খুলনার নির্বাচনে চরদখলের মত ভোট কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে। অধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছে।


প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দিয়ে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারা হয়েছে। ভোট কেন্দ্রের সম্মুখভাগে অহেতুক হৈ হল্লা ও অনাকাঙ্খিত জটলা সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।


ফলে খুলনার নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল সরকারি দলের দখলে এবং সরকারি দলের লোকজন ছাড়া সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিলনা বললেই চলে। তাই খুলনায় নির্বাচনের নামে এ যাবৎকালের বড় প্রহসনের ঘটনা ঘটেছে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। মূলত বর্ণিত এ নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলনের সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের বলদর্পী ভূমিকার মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের অনুকুলে নেয়ার একটা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। যা গণতন্ত্র ও নির্বাচনের নামে জনগণের সাথে পরিহাস ছাড়া কিছুই নয়।


খুলনা সিটির নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম কারো চোখই এড়াতে পারেনি। দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নির্বাচনে অনিয়মের বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। বিদেশী গণমাধ্যমগুলোতেও নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব কথায় আমল দেয়নি বরং নির্বাচন কমিশন সচীব নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে দাবি করেছেন। নির্বাচনে সকল অনিয়মের অভিযোগ কমিশনের পক্ষে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু গাজীপুর সিটির নির্বাচনের প্রাক্কালে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বীকার করলেন যে, খুলনা সিটির নির্বাচনে কিছুটা অনিয়ম হয়েছে। তাই গাজীপুরের নির্বাচনে কোন অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এমন ঘোষণার পরও গাজীপুরেও খুলনার ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটলো।


এমনকি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সদস্যরা সরকারি দলের ক্যাডার বাহিনীর ভূমিকা পালন অভিযোগও পাওয়া গেল। নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র ছবিও প্রকাশ করা হলো। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে কোন অভিযোগই প্রমাণ হলো না। খুলনার অভিযোগের কথা স্বীকার করা হলেও সে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হলো। এসব যদি নিরপেক্ষ নির্বাচনের নমূনা হয় তাহলে গণতন্ত্রের নতুন করে সঙ্গায়ন করার দাবি জোড়ালেও হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। যা আত্মসচেতন মানুষের ভাববার উপাদানে পরিণত হয়েছে।


সরকার সবকিছুতেই বল প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজছে। সরকারি চাকুরীতে কোটা সংস্কারের বিষয়টি মোটামোটি মিমাংসিতই ছিল। কারণ, এই আন্দোলনের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতার। কিন্তু এমন একটি মিমাংসিত বিষয়কে নতুন করে ইস্যু বানাতে সরকারকে কে বা কারা উদ্বুদ্ধ করলো তা মোটেই বোধগম্য নয়। বিষয়টি নিয়ে অহেতুক কালক্ষেপনের জন্যই শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণার দেয়ার পরই সার্বিক পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে গেল। হয়তো সরকার পক্ষ শিক্ষার্থীদের দাবি মানাকে নিজেদের পরাজয় মনে করেছিল। কিন্তু তা তারা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি।


তাই তারা এই পরাজয়ের ক্ষোভ ঝাড়তেই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পথ বেছে নিল। সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ পরিহার করে সরকার বলদর্পিতার আশ্রয় গ্রহণ করলো। সরকারের আস্কারা পেয়ে অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বাঁশের লাঠি, ধারালো ছুড়ি এমনকি হাতুড়ী ব্যবহার করলো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হামলাকারীদের কিছুই হলো না বরং ভিকটিমরাই গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডের নামে এখন নির্যাতন ভোগ করছেন এবং আর কতদিন অব্যাহত থাকবে তা এখন বলা বেশ দুষ্কর। এমনকি সরকারি হাসপাতালগুলো ভিকটিমদের চিকিৎসা দিতেও অস্বীকার করলো। রাষ্ট্র বা সরকার ভিকটিমদের প্রতি মানবিক আচরণও করলো না। এটা কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট হতে পারে না।


এখানেই শেষ হলো না বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি রীতিমত লোক হাসালেন। তার ছাত্ররা নির্মম হামলার শিকার হলেও তিনি তা স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। কিন্তু ভিকটিমদের আহাজারী ও কান্নাকে তিনি জঙ্গীবাদের সাথে তুলনা করে নিজের ব্যক্তিত্ব ও পদমর্যাদার সাথে অবিচারই করলেন বলেই মনে হলো। অবশ্য পরে তিনি এ বক্তব্য অস্বীকার করে যা বললেন তাতেও কোন অভিনবত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না বরং তার পূর্বের অবস্থানের পূনরাবৃত্তির মতই শোনালো। তিনি এঘটনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকসূলভ আচরণ করতে ব্যর্থ হলেন।


আত্মসচেতন মানুষরা তাকে বিশেষ গোষ্ঠীর তল্পিবাহক হিসেবেই দেখলেন। কম গেলেন না সরকার সমর্থক অন্যশিক্ষকরা। তারা ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জোর করে ক্লাসে নেয়ার জন্য পুলিশের ভয় দেখালেন। একথা সত্য যে, সরকার যেমন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের জন্য শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাদের বলদর্পিতার মাধ্যমেই সরকারের অবস্থানকে আনুকুল্য দেয়ার চেষ্টা করছে। যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল হতে জটিল করে তুলছে।


মূলত বলদর্পিতা রাষ্ট্রের পক্ষেই হোক বা অন্য কোন পক্ষে মাধ্যমে হোক তা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। এমনকি তা গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্যও সহায়ক হতে পারে না। অতীত তার অনুকুলে কখনোই সাক্ষ্য দেয় না বরং ইতিহাস পর্যালোচনায় আমাদের সামনে ভিন্নচিত্রই ভেসে ওঠে। একথা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে ততই সকলের মঙ্গল।


সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
সাংবাদিক ও গবেষক


(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)

Print