ইসি’র ইভিএম ম্যানিয়া

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
টাইম নিউজ বিডি,
২৯ জুলাই, ২০১৮ ২৩:০২:১৩
#

বিশেষজ্ঞরা ‘ম্যানিয়া’কে মনোরোগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানীরা বিষয়টির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তাই ‘ম্যানিয়া’ আক্রান্তদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয় বৈকি! কারণ, এটি এক ধরনের বিকারগ্রস্থতা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইসি’র ওপর তা ভাল ভাবেই আসর করেছে। কমিশনের সাম্প্রাতিক কর্মতৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি ম্যানিয়া আক্রান্ত হয়েছে। আর তা হচ্ছে ইভিএম ম্যানিয়া। কমিশনের ধ্যান, জ্ঞান ও কর্মতৎপরতা সবই এখন ইভিএমকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ইভিএম নামের এই ভোটিং মেশিন নিয়ে বিশেষজ্ঞসহ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক ও আপত্তি থাকলেও বর্তমান হুদা কমিশন কোন ভাবেই ‘ইভিএম ম্যানিয়া’ মুক্ত  হতে পারছে না। আন্তর্জাতিকভাবেও ইভিএম’এর গ্রহণযোগত্যা রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বত্ত্বেও কমিশন এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই মনে হচেছ। কমিশনের ঘাড়ে ইভিএমের ভূত যেভাবে চেপে বসেছে তাতে তা নামার মত কোন লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বাকিটা ভবিষ্যৎই বলতে পারে।  


ম্যানিয়া আক্রান্তদের অনেক সময় স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায়। ক্ষেত্র বিশেষে হিতাহীত জ্ঞানও থাকে না। একটা অনাকাঙ্খিত মোহ সবসময় তারা করে।  যেমনটি হয়েছিল মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ক্ষেত্রে। তাকে নাকি ‘মুন্সী ম্যানিয়া’ পেয়ে বসেছিল। জানা যায়, রাণী ভিক্টোরিয়ার গোল্ডেন জুবিলি উপলক্ষ্যে রাজপ্রাসাদ ভারত থেকে দু’জন সেবক নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এতে কপাল খুলেছিল আগ্রা কারাগারের করণিক মুন্সী হাফিজ আব্দুল করিমের। সার্ভেন্ট হলেও অতি অল্প সময়ের মধ্যে মহারাণী মুন্সী হাফিজ আব্দুল করিমের প্রতি অসম্ভব ধরনের অনুরক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি মহারাণীর শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। রাণী তাকে রাজকীয় খেতাব দিতে দিতে এক সময় নাইট উপাদি দেয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন। যদিও নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।


বয়সের বিন্যাসে মহারাণীর সাথে মুন্সীর ব্যবধান ছিল ৪০ বছরের। মুন্সী আব্দুল করিম একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। কিন্তু গোঁড়া খ্রীষ্টান রাণীর ওপর তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এক সময় রাণী মুন্সীর কাছে উর্দ্দু ভাষা ও কুরআন শিক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং মুন্সীর কাছে জীবনের শেষ মহুর্ত পর্যন্ত তালিমও গ্রহণ করেন। এই উপমহাদেশীয় ভৃত্য এবং পরবর্তীতে শিক্ষক যে তার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন তা রাণীর শেষ জীবনের পোষাক-পরিচ্ছদে বেশ স্পষ্ট।


রাণী মুন্সীকে পুরোপুরি ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এমনকি  মুন্সী ২ স্ত্রী নিয়ে যাতে আয়েশী জীবন যাপন করতে পারেন এজন্য তিনি প্রাসাদ অভ্যন্তরে করিম কটেজ নামে বাসভবনও নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। রাণী কখনো উচ্চপস্থ কর্মকর্তার বাড়ীতে না গেলেও করিম কটেজে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। এমনকি করিম একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে মহারাণী তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক সহ স্বয়ং উপস্থিত হয়ে মুন্সীর সেবা-স্বশ্রুষা করেছিলেন বলে জানা জায়। মুন্সী সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকা স্বত্ত্বেও রাণী প্রতিদিনই মুন্সীকে চিঠি লিখতেন। মুন্সীও যথারীতি  জবাবও দিতেন।


এমনকি যেসব অনুষ্ঠানে প্রাসাদের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের যোগদান করার সুযোগ থাকতো না সেখানেও মুন্সীর অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু এসব রাজপরিবার বা প্রাসাদের কেউই পছন্দ করতেন না। এজন্য মুন্সীকে অনেক বৈরি পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং রাণীর চরিত্রেও কালিমা লেপন করা হয়েছে। কিন্তু মুন্সী ম্যানিয়ার কাছে সবকিছুই পরাভূত হতে বাধ্য হয়েছিল। একবার এ বিষয়ে আপত্তি তোলায় মহারাণী তার শয়নকক্ষের আসবাবপত্র ভাঙ্গচুর করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। মহারাণীর মুন্সী ম্যানিয়ার বিষয়টি এ ঘটনার মাধ্যমেই সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে।


মহারাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল মুন্সীই তার মহদেহ দেখার শেষ ব্যক্তি হবেন। তারপর আর কেউ দেখতে পারবে না এবং রাণীর মুখায়ব মুন্সীই শেষ বারের মত ঢেকে দেবেন। ১৯০১ সালে মহারাণীর মৃত্যুর পর এসব আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু রাণীর মৃত্যুর কয়েকঘন্টার মধ্যেই মুন্সী পদচ্যুত হয়েছিলেন। তার কাছ থেকে রাণীর চিঠিপত্র জব্দ করে সেসব পুড়িয়ে ফেলে হয়েছিল। তাৎক্ষণিকবাবে তাকে ভারত ফিরতেও বাধ্য করা হয়েছিল। ম্যানিয়া-বাতিক বা বিকারগ্রস্থতা যে কখনো স্থায়ী সুফল বয়ে আনেনা তা মহারাণী ভিক্টোরিয়া আর মুন্সী হাফিজ আব্দুল করিমর জীবনই তার জলন্ত প্রমাণ। কিন্তু এসব থেকে আমরা খুব কমই শিক্ষা গ্রহণ করি না।


মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে যেমন মুন্সী ম্যানিয়ায় পেয়ে বসেছিল, ঠিক তেমনিভাবে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে ইভিএম ম্যানিয়ায় পেয়ে বসেছে বলেই মনে হচ্ছে। তারা এখন চারদিকে ইভিএম ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। একটা অনাকাঙ্খিত বাতিক নির্বাচন কমিশনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এর আগে ইসির সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংলাপ চলাকালে ও পরবর্তীতে গণমাধ্যমের মুখোমুখী হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার একাধিকবার বলেছিলেন যে, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে না। যা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ স্বস্তিদায়কই হয়েছিল। কারণ, রকিব কমিশন জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বর্তমান  কমিশনের এই ইউ-টার্ন সকলেই সন্দেহের চোখেই দেখছেন। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই এই কমিশনের অধীনে আগামীতে সকল নির্বাচনই প্রশ্নবৃদ্ধ হতে পারে।


আমাদের দেশে নির্বাচনে ইভিএম এর ব্যবহারের কথা উঠেছিল বিগত সংসদের শুরুর দিকে। শুরুতেই এ প্রস্তাব বিরোধী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বরং তারা এই যন্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধেই অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণের মতামতও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু কোন মতামতই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে যায়নি বরং এই যন্ত্রের মাধ্যমে সহজেই ভোট কারচুপী সম্ভব তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এক্সপার্টরা। কিন্তু এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অবস্থান ছিল খুবই জোড়ালো। তাই কোন কোন নির্বাচনে সীমিত পরিসরে ইভিএম এর ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের কাছে মোটেই জনপ্রিয় উঠতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনও অনেক চেষ্টা করেও এই বিষের বড়ি জনগণকে গেলাতে পারেনি।


বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের মানুষকে আস্বস্ত করা হয়েছিল যে, আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু এক রহস্যজনক কারণে কমিশন সে কথার ওপর স্থির থাকতে পারেনি। বরং তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহত পরিসরেই ইভিএম ব্যবহারের পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিরোধী দল ও বিশেষজ্ঞদের আপত্তি উপেক্ষা করে ইসির এমন অনাকাঙ্খিত সিদ্ধান্ত সকলকেই হতবাক করেছে। এটি নির্বাচন কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত, না কোন মহল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাটা বেশ তুঙ্গেই উঠেছে। জাতীয় সংসদে কথিত বিরোধী দল ছাড়া সকলেই দাবি করছেন যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীনদের বিশেষভাবে আনুকুল্য দেয়ার জন্যই ইভিএম উম্মাদনায় আক্রান্ত হয়েছে। এর আগে সরকারি দলকে আনুকুল্য দিয়েতেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রচারণা চালানোর অনুকুলে আইন পাশ করেছিল বলে অভিযোগ আছে এই কমিশনের বিরুদ্ধে। আর আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তার ধারাবাহিকতা বলেই মনে করা হচ্ছে।


সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচীব আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের অনুকুলে কথা বলেছেন। কিন্তু একমাত্র ক্ষমতাসীনরা ছাড়া অন্য কেউই নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না। বরং সংশ্লিষ্টরা এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। কারণ, ২০১৩ সালে সিটি নির্বাচনে বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটে কেবল দুটি করে কেন্দ্রে ইভিএমে নির্বাচন হয়। রাজশাহী সিটির টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্রে ইভিএমে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন হয়। ভোট গণনার স্বচ্ছতার প্রশ্নে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। যেহেতু ইভিএম এ ভোট গ্রহণের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তাই তা জোর করে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়া যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে না।


অভিযোগ উঠেছে যে, সরকারের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইলেক্ট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চালুর মাধ্যমে আরেকটি বড় ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথে এগুচ্ছে। শামসুল হুদা কমিশন ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২১ নং ওয়ার্ডে ইভিএম ব্যবহার করলে ভোট গণনায় ত্রুটি ধরা পড়ে। বর্তমান কমিশন দায়িত্বে এসে পুরনো ইভিএম পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন প্রবর্তিত ইভিএমে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৪১ নং কেন্দ্রে ব্যবহার করে। কিন্তু সেখানেও ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর গত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণে ত্রুটির ফলে ভোটাররা ভোগান্তিতে পড়ে।


বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের আপত্তির পরও তাড়াহুড়ো করে নির্বাচন কমিশনের ইভিএম স্থানীয়ভাবে কেনা ও আমদানি সন্দেহের চোখেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিতর্কিত মেশিন নিয়ে কমিশনের কেনো এতো তোড়জোড় সেজন্য জনমনে গভীর সংশয় দানা বেঁধেছে। ইভিএম ব্যবহারের ত্রুটি নিয়ে দেশ-বিদেশের নানা দৃষ্টান্তের কথাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কমিশন সেটিকে পাত্তা না দিয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রদর্শিত পথেই এগিয়ে যাচ্ছে যাচ্ছে বলে বিরোধী দলগুলোর পক্ষে জোরালো অভিযোগ করা হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করারও কোন সুযোগ থাকছে না।


সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনগুলো নিয়ে সফট ওয়ার প্রোগামাররা বলেছেন, ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনগুলো বিদ্বেষমূলক প্রোগ্রামিংয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং যে কোনো মুহূর্তে হ্যাকাররা মেশিনটিকে হ্যাক করে ভোট গণনাকে খুব সহজেই টেম্পারিং করতে পারে। যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে ব্যালট পেপারে ভোট গণনা সময় সাপেক্ষ বিষয় হলেও মানুষের এর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা আছে। কারণ উচ্চ প্রযুক্তি সর্বদায় হ্যাকারদের আক্রমণ দ্বারা ভেদ্য হওয়ার ঝুঁকি সম্ভাবনা থাকে। সঙ্গত কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইভিএমের ব্যবহার শুরু হলে তা ফলপ্রসু হয়নি।


জার্মানি, আমেরিকা, ভারতসহ অনেক দেশে ইভিএম মেশিন নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় এই মেশিন ব্যবহার বন্ধ আবার কোথাও সংস্কার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক দেশে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছে। আমেরিকায় অনেক স্টেট ইভিএম-এর ব্যবহার বন্ধ করেছে। আবার কিছু স্টেটে ইভিএমের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিও আছে। জার্মান আদালত ২০০৯ সালে এক রায়ে বলেছে, ইভিএম মেশিন খুব সহজেই টেম্পারিং করা সম্ভব। এতে ভোট পুনরায় গণনার সুযোগ নেই। তাই জার্মান আদালত ওই মেশিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। গত বছর ভারতে কীভাবে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট কারসাজি হয়েছে তার সচিত্র প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছে। সে সময় ভারতের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল দেশটির নির্বাচনে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


যুক্তরাষ্ট্রের  ফ্লোরিডা রাজ্যে এই ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন কিভাবে অপরাধীরা ইভিএম ‘হ্যাক’ করে অনায়াসে ভোট চুরি করতে সক্ষম। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও স্যান ডিয়াগো, মিশিগান ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘রিটার্ন ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং’ ব্যবহার করে ইভিএমকে দুর্ব্যবহার করার সক্ষমতা প্রমাণিত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের সামনে তারা দেখিয়েছেন কিভাবে একটা ‘ভাইরাস’ ব্যবহারের মাধ্যমে ইভিএম মেশিনে হ্যাকাররা ভোটের ফলাফল সহজেই ‘ম্যানিপুলেট’ করতে পারে।


ইভিএমের একটি ক্ষুদ্র অংশের নাম উবঃবপঃধনষব গবসড়ৎু গড়ফঁষব (উগগ) এর মধ্যেই নির্বাচনের ফলাফল সংরক্ষিত থাকে এবং এই অংশটি ইভিএম থেকে খুব সহজেই  খুলে নেয়া যায় এবং এভাবে অতি সহজেই নির্বাচনের ফলাফলকে পাল্টে দেয়া সম্ভব। আয়ারল্যান্ড ২০০৬ সাল থেকে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ২০০৯ সাল থেকে জার্মানি অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। ফিনল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালত ২০০৯ সালে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম-এর ফলাফল অবৈধ ঘোষণা করেছে। ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইভিএম-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইভিএম নিয়ে এতসব অভিযোগ নির্বাচন কমিশন কোন ভাবেই আমলে নিচ্ছে না বরং আগামীতে সকল নির্বাচনে এই বিতর্কিত মেশিন ব্যবহারের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। যা চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীরতর করতে পারে।


দেশে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্য নিয়ে এমনিতেই রাজনৈতিক সংকট চলছে। তার ওপর ইসির একগুয়েমী ও ইভিএম ম্যানিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল হতে জটিলতর করে তুলবে বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নির্বাচন পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার চেয়ে নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলায় নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। প্রযুক্তির ব্যবহার যদি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে তাহলে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে সনাতনী পদ্ধতির ব্যবহারই অধিক যুক্তিযুক্ত। প্রয়োজনে অতি সনাতনী পদ্ধতিও ব্যবহার করতেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। নির্বাচনে যে পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক না কেন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে আস্থায় নিয়ে তা করতে হবে। জোর করে কারো ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া ফলদায়ক হবে না। কোন ধরনের ম্যানিয়া ও বাতিক আশ্রিত হলে তা গণতন্ত্রের জন্যই খারাপ দৃষ্টান্ত হবে। নির্বাচন কমিশন এ দায় এড়াতে পারে না।


সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা/এসএম

Print