জামায়াতের দেড় শতাধিক বই পড়েছি: ব্যারিস্টার তুরিন

একে আজাদ
টাইম নিউজ বিডি,
১৫ মে, ২০১৪ ০৮:২০:১৬
#

তুরিন আফরোজ। আদালত পাড়ায় পরিচিত নাম। দাবড়ে বেড়াচ্ছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্রাইব্যুনাল। হালে আলোচনা আর সমালোচনাও কম নয়। এক মেরুতে তার গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বি। অন্য মেরুতে তিনি নানান অভিযোগে অভিযুক্ত। হাজারও প্রশ্নাবাণে জর্জরিত। কিন্তু কেন তাকে নিয়ে এত প্রশ্ন? এসব বিষয়ে টাইমনিউজবিডি'র কাছে মুখ খুলেছেন জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রসিকিউশন টিমের প্রধান সমন্বয়ক ব্যারিস্টার তুরিন। বলেছেন তার ভবিষ্যৎ নানা পরিকল্পনার কথা। জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে তার সুস্পষ্ট বক্তব্য।


 টাইমনিউজবিডি: কেন জামায়াতকে নিয়ে এত ভাবছেন? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: জামায়াতকে আমি ক্রিমানাল সংগঠন হিসেবে জেনেছি। তাই জামায়াতের মামলায় লড়তে চাই। আমার দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে কাজ করছি। তাদের কর্মকাণ্ডের নানা দিক ও বিভাগ নিয়ে কাজ করে আসছি। মওদূদী, গোলাম আযম ও নিজামীসহ জামায়াত ঘরানার গুরুত্বপূর্ণ দেড় শতাধিক বই পড়েছি। আরও হাজারও বই পড়তে হচ্ছে।  '৭১ সালে মানবতাবিরোধী কাজ করেছে কিনা তার আদি অন্ত জানতেই আমার এই ইচ্ছা।


টাইমনিউজবিডি: জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলার অগ্রগতি কতদূর? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: এতদিন আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় লড়েছি। এখন সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলায় লড়তে হচ্ছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। ইতোমধ্যে তদন্ত সংস্থা থেকে চূড়ান্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা ওই রিপোর্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রসিকিউশন টিমের ৭ প্রসিকিউটরকে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছি। এই মামলার টিম লিডার করা হয়েছে আমাকে। টিমের অন্য প্রসিকিউটররা হলেন রানা দাশগুপ্ত, জেয়াদ- আল মালুম, একেএম সাইফুল ইসলাম, সুলতান মাহমুদ সিমন, ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল ও রেজিয়া সুলতানা চমন।


টাইমনিউজবিডি: জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের মামলাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মামলার সব বিষয় খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে পুরোদমে। দলটির মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামও এ মামলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারপরও যদি কোনো তথ্যে ঘাটতি দেখা দেয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চরমপত্রগুলো কাজে লাগবে। বর্তমানে জামায়াতের সবগুলি বই পাঠ করার পর তা আন্ডার লাইন করা এবং নোট গ্রহণের কাজ চলছে। এ কাজে প্রসিকিউশন টিমের সদস্যসহ আগ্রহী অনেকেই সহযোগিতা করছেন।


টাইমনিউজবিডি: মামলার অভিযোগপত্র কবে দাখিল করা হতে পারে? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) মে মাসের মধ্যে দাখিল করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দাখিল করার কথা থাকলেও দাখিল করা হয়নি। জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তুরিন আফরোজ  বলেন, তদন্ত শেষ হয়েছে। এ অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে সংগঠনটি নিষিদ্ধ হতে পারে, তবে তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে কিনা সে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি তিনি। জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যরিস্টার তুরিন বলেন, তদন্তে প্রায় ১শ' ৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে কিন্তু তা নিষিদ্ধ করা হবে কিনা বা তার কার্যক্রম বন্ধ করা হবে কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। কারণ জামায়াতের কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলেও গোটা প্রতিষ্ঠানই জামায়াতের একার প্রতিষ্ঠান নয়। তাই এক ব্যক্তির জন্য গোটা প্রতিষ্ঠান বাজেয়াপ্ত বা বন্ধ করা সম্ভব না।


টাইমনিউজবিডি: ট্রাইব্যুনাল কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কি ? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। তবে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করায় ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও নিবার্চন কমিশন সর্বোচ্চ আদালতে জামায়াতের বিষয়ে করা আপিলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।


তুরিন আফরোজ বলেন, আমরা এখন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে করা তদন্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। ট্রাইব্যুনালে কী আবেদন করব এই মুহূর্তে তা বলতে চাই না। মামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১০ হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট রয়েছে। যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সময়েরও প্রয়োজন। জামায়াতের মতো এত বড় একটি দলের বিরুদ্ধে তাড়াহুড়া করা সঠিক হবে না। ১০ হাজার পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে কি রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একাত্তরে জামায়াত ইসলামী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল। পাকিস্তানিদের সহায়তায় জামায়াতের নেতা ও কর্মীদের রাজাকার, আলবদর, আলশামস-এ নিয়োগ করা হয়। এসব অভিযোগে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতসহ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে।


মামলার তদন্তে কি সুপারিশ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে জানান, জামায়াতকে দল হিসেবে নিষিদ্ধের পাশাপাশি ইসলামী আদর্শ নিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ও দলটির মুখপাত্রটিকে নিষিদ্ধের আবেদন করা হয়েছে। তাদের সম্পদ বিলুপ্তিরও আবেদন করা হয়েছে।


এক নজরে তুরিন আফরোজ: ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৯৭১ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তসলিম উদ্দিন আহমেদ সরকারের কর বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নীলফামারী জেলার জলঢাকা থানার চাওরাডাঙ্গি গ্রামে তার আদি নিবাস। বর্তমানে তিনি রাজধানীর উত্তরার তিন নং সেক্টরে নিজ বাড়িতে বাস করছেন। তুরিন আফরোজ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন ঢাকার হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। তিনি ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স),অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনি থেকে এলএলএম (ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ল’) এবং মনাশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ-ডি  ডিগ্রী লাভ করেন।


ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ‘আইন বিষয়ক সম্পাদক’ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।


ঢাকা, ১৪ মে (টাইমনিউজবিডি.কম)//এআর

Print