‘স্বাধীন গণমাধ্যমকেই কণ্ঠরোধ করার ডিজিটাল আইন’(ভিডিও)

মো. মুস্তাঈন বিল্লাহ
টাইম নিউজ বিডি,
১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১৮:০৬:৪৫
#

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যম পরিপন্থী বলে দাবি করেছে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। 


আজ (১৫ অক্টোবর) সোমবার বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এই কথা বলেন।


ডেইলি স্টারের সম্পাদক বলেন, আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যম পরিপন্থী মনে করি।  আমরা এই আইনের বিরোধী নই। এই আইনের বিশেষ কতগুলো ধারার সংশোধন দাবি করছি।  


মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমানে আইনটি শুধু সাইবার জগত নয় স্বাধীন গণমাধ্যমকেই কণ্ঠরোধ করার এই আইন। আমরা চাই আগামী সংসদ অধিবেশনেই এই আইনটি সংশোধনেরমাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা হোক।


সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম এই কর্মসূচিতে ৭দফা দাবি তুলে ধরে বলেন, “আমরা আশা করব, আমাদের এই দাবি সরকার গ্রহণ করবেন এবং এই সংসদের যে শেষ অধিবেশ আছে সেই অধিবেশনেই যথাযথ সংশোধনী এনে এই আইনটি সবার জন্য গ্রহণযোগ্য আইন উনারা করবেন।”   



সম্পাদক পরিষদের ৭ দফা দাবি হচ্ছে:


১. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সুরক্ষার লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারা অবশ্যই যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে।


২. এসব সংশোধনী বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনে আনতে হবে।


৩. পুলিশ বা অন্য কোনও সংস্থার মাধ্যমে কোনও সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে তাদেরকে শুধু নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনও কম্পিউটার ব্যবস্থা বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। তারা শুধু তখনই প্রকাশের বিষয়বস্তু আটকাতে পারবে, যখন সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করে কেন ওই বিষয়বস্তু আটকে দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে।


৪. কোনও সংবদামাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কোনও কম্পিউটার ব্যবস্থা আটকে দেওয়া বা জব্দ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই উচ্চ আদালতের আগাম নির্দেশ নিতে হবে।


৫. গণমাধ্যমের পেশাজীবী সাংবাদিকতার দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথমেই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে হবে (যেমনটা বর্তমান আইনে আছে) এবং সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের কোনও অবস্থাতেই পরোয়ানা ছাড়া ও যথাযথ আইন প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া আটক বা গ্রেফতার করা যাবে না।


৬. গণমাধ্যমেরপেশাজীবীর দ্বারা সংঘটিত অপরধের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের গ্রহণযোগ্যতা আছে কিনা, তার প্রাথমিক তদন্ত প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে করা উচিত। এই লক্ষ্যে প্রেস কাউন্সিলকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা যেতে পারে।


৭. এই সরকারের পাস করা তথ্য অধিকার আইনকে দ্ব্যর্থহীনতভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এই আইনে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনেসেগুলোর সুরক্ষা অত্যাবশ্যক ভাবে করতে হবে। 


সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আছেন-মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, নয়া দিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দীন, সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনিরুজ্জামান, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, যুগান্তর-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, সমকাল-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, ইনডিপেনডেন্ট সম্পাদক এম শামসুর রহমান প্রমুখ।


এর আগে শনিবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।  ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে আইনটির ৯টি ধারা বাতিলের দাবি জানানো হয় সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন, গণমাধ্যম ও অংশীজনের আপত্তি ও মতামত উপেক্ষা করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস করা হয়। গত ৮ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ।  


শুরু থেকেই আইনটির সংশোধনী দাবি করে আসছে সম্পাদক পরিষদ। সংসদে বিল পাস হওয়ার পর সম্পাদক পরিষদ ২৯ সেপ্টেম্বর মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচি পালনের কথা ছিল। কর্মসূচি ঘোষণার পর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এই কর্মসূচি স্থগিত করে সম্পাদক পরিষদকে আলোচনায় অংশ নেয়ার অনুরোধ জানান। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারের ৩ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ১জন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে সম্পাদক পরিষদ। ওই আলোচনায় ৩ মন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ মন্ত্রিসভার পরবর্তী বৈঠকে তোলা হবে এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে এ নিয়ে আরও আলোচনা করা হবে। কিন্তু গত দুটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই আলোচনা না করাটা প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ। 


এমবি    

Print