ঠাকুরগাঁও ৩ আসন: দৌড় ঝাপ বাড়ছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের

ঠাকুরগাঁও করসপন্ডেন্ট
টাইম নিউজ বিডি,
১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:৫১:১৫
#

ঠাকুরগাঁও তিন আসনে বিজয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন আওয়ামীলীগের একাধিক প্রার্থী। অপর দিকে আসনটি দখলে নিতে প্রায় ২ বছর আগ থেকে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন বিএনপির এক প্রার্থী।


দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই দৌড় ঝাপ বাড়ছে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের। নিয়মিত সভা সমাবেশ করছেন তারা। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও দোয়া চেয়ে বিভিন্ন দলের অর্ধ ডজনেরও অধিক প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে এ আসনের পথ-ঘাট।


পীরগঞ্জ ও রাণীশংকৈল উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-৩ আসন। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আসনটি আওয়ামীলীগের দখলে ছিল (৯৬’র ১৫ ফেব্রুয়ারী নির্বাচন ব্যতিত)। এর মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে একবার ওয়ার্কাস পার্টির প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়।


২০০১’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঠেকাও স্লোগানে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে আসনটি দখলে নেয় জাতীয় পার্টি। সে বার জাতীয় পার্টির প্রার্থী পায় প্রায় সাড়ে ৮৯ হাজার ভোট আর আওয়ামীলীগের প্রার্থী পায় প্রায় ৮৮ হাজার ভোট। বিএনপি প্রার্থী জাহিদুর রহমান পায় সাড়ে ৮ হাজার ভোট। এরপর থেকে জোট- মহাজোটের কবলে পরে এ আসন।


২০০৮’র নির্বাচনে আসনটি মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির ভাগে পড়ে। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হন জাতীয় পার্টির হাফিজউদ্দীন আহমেদ।


মহাজোটের কারণে সে বার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী সাবেক এমপি ইমদাদুল হককে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করতে হয়। এ নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টির হাফিজ উদ্দীন বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগের সর্মথন থাকায় তিনি পান প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ভোট। আর বিএনপি’র প্রার্থী জাহিদুর রহমান পান প্রায় সাড়ে ৪৬ হাজার ভোট। এরপর ২০১৪’র নির্বাচনে আবারও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন জাতীয় পার্টির হাফিজ উদ্দীন আহমেদ। 


আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান সাবেক এমপি ইমদাদুল হক। মহাজোটের কারণে সে বারও আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করতে হয়। তবে সে বার ওয়ার্কাস পার্টির দলীয় প্রার্থী হিসেবে হাতুড়ি মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী।


স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির বনিবনা না হওয়ায় ওই নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেয় স্থানীয় আওয়ামীলীগ। এতে ওয়ার্কাস পার্টির প্রার্থীর কাছে প্রায় ২৫ হাজার ভোটে হেরে যান মহাজোটের প্রার্থী হাফিজউদ্দীন আহমেদ।


স্বাধীনতার পর থেকে বেশির ভাগ সময় এ আসনে আওয়ামীলীগের এমপি থাকলেও আওয়ামীলীগের ভোটে একবার জাতীয় পার্টি এবং দুইবার ওয়াকার্স পার্টির প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়।


বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর করে জাতীয় পার্টি এবং ওয়ার্কাস পাটির প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হলেও এবার কাউকেই ছাড় দিতে নারাজ স্থানীয় আওয়ামীলীগ। তারা এবার নিজস্ব দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কার জয় চায়। সে লক্ষ্যে কাজ করছে আওয়ামীলীগ। বসে নেই জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কাস পার্টি এবং বিএনপিও। জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দীন আহমদ, ওয়ার্কাস পার্টি থেকে বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী, বিএনপি থেকে পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি জাহিদুর রহমান নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছেন।


আওয়ামী লীগ থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ও সাবেক এমপি ইমদাদুল হক ছাড়াও সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ও রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদের সাবেক ২ বারের সফল মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও এ আসনের প্রয়াত এমপি আলী আকবরের কন্যা সেলিনা জাহান লিটা, বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জয় ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রানীশংকৈল উপজেলার বাসিন্দা অধ্যক্ষ সুজাউল করিম বাবুল, পীরগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ গোপাল চন্দ্র রায়, কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ চৌধুরী মোঃ আনোয়ার দলীয় মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন।


গ্রাম-গঞ্জে তুলে ধরছেন বর্তমান সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকান্ডের চিত্র। এদের মধ্যে সাবেক এম ইমদাদুল হক, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি সেলিনা জাহান লিটা সরকারী ও দলীয় কর্মসূচীতে বেশী বেশী করে অংশ নিচ্ছেন এবং সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরছেন। দলকে সংগঠিত করছেন।


নৌকায় ভোট দিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন। সেলিনা জাহান লিটা নারীদের উন্নয়নে স্থানীয় ভাবে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। সংগঠিত করছেন তাদের।


অধ্যক্ষ গোপাল চন্দ্র রায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে একত্রিত করার পাশাপাশি তাদের আপদে বিপদে পাশে থাকছেন। সাহায্য সহযোগীতা করছেন। সরকারের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করছেন। শিক্ষার প্রসার সহ বিভিন্ন উন্নয়ন মুলক কাজ করে এরই মধ্যে শিক্ষিত মানুষের কাছে তিনি গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে দাড় করাতে সক্ষম হয়েছেন।


অধ্যক্ষ সুজাউল করিম বাবুল এলাকায় বেশী সময় দিতে না পারলেও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সমাজ সেবামুলক কাজে তার দু’হাত প্রসারিত করে রেখেছেন। কোন মানুষকেই নিরাশ করছেন না তিনি। যা পারছেন, সাহায্য সহযোগীতা করছেন নিজের মত করে। তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম গঞ্জে। গোগার গ্রামস্থ তার বাড়িতে এখন দুখী মানুষের ভীড় লেগেই থাকে।


ডাঃ চৌধুরী মোঃ আনোয়ার আগে থেকে এলাকায় সক্রিয় না থাকলেও কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন নিরলস ভাবে। শেখ হাসিনার জন্ম দিনে এলাকার গরীব মানুষের মাঝে রিক্সা ভ্যান বিতরণ সহ বিভিন্ন সময়ে এলাকায় বিনা মুল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছেন।


সাবেক এমপি ইমদাদুল হক বলেন, ‘এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামীলীগের নিজস্ব কোন এমপি নেই। অথচ আওয়ামীলীগের ভোটেই অন্যরা এমপি নির্বাচিত হচ্ছে। এমপি হবার পর আওয়ামীলীগের কোন কাজ করছে না। এতে দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন অন্যকে ভোট দিয়ে আসছি। আর নয়। এবার আমরা নিজেরা নিজেদের ভোট দিতে চাই। এ আসনে নৌকা মার্কা চাই।’


সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা জাহান লিটা বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করছি। এ আসনের মানুষ নৌকায় ভোট দিতে উন্মুখ। যাকেই নৌকা দেওয়া হোক না কেন- আমরা তার হয়ে কাজ করবো। জননেত্রী যদি আমাকে নৌকা দেয় তাহলে দলমতের উর্ধ্বে থেকে সবাই আমার জন্য কাজ করবে। সেক্ষেত্রে আসনটি আমি নেত্রীর হাতে তুলে দিতে পারবো।


আওয়ামী লীগের উপর ভর করে জাতীয় পার্টি বা ওয়ার্কার্স পার্টি এবারও এমপি হবার স্বপ্ন দেখছেন। এটা এবার হবে না। আমরা ভাড়াটিয়া প্রার্থী চাই না। এ আসনের মানুষ এবার তা মেনে নেবে না।’


অধ্যক্ষ গোপাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘জন প্রতিনিধিদের বিষয়ে মানুষে একটা খারাপ ধারনা জন্মেছে। আমি এ ধারণা পাল্টাতেই নির্বাচন করতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে জন প্রতিনিধিদের সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক যে ধারণা-এটার পরিবর্তন করবো। যার যা প্রাপ্ত তার সঠিক মুল্যায়ন করবো। ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মাঠে একটা অবস্থান তৈরী হয়েছে।’


অন্যদিকে ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী বলেন, ‘হাতুড়ি মার্কা নিয়ে আমি লাঙ্গল মার্কাকে হারিয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। আমার ভাল একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। আমি কারো ক্ষতি করিনি। কাজেই ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে এবার আমিই মনোনয়ন পাবো বলে আমার বিশ্বাস। ‘ অবশ্য তিনি স্বীকার করে বলেন, আওয়ামীলীগ একটা বড় দল। নির্বাচনে অবশ্যই তাদের সমর্থন লাগবে।


জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দিনও মাঠে কাজ করছেন। সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি ২ বার সংসদ সদস্য ছিলাম। আমি যে উন্নয়ন করেছি তা কোন এমপি করতে পারেনি।’


দলের প্রধান হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ তাকে গ্রীন সিগ্যনাল দিয়েছেন। এরই মধ্যে দলের সব কমিটি গঠন করা হয়ে গেছে। এখন সেন্টার কমিটি গঠনের কাজ চলছে। তিনিও নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের সহায়তা লাগবে বলে মনে করেন এবং প্রত্যাশা করেন তারা অবশ্যই সহযোগীতা করবে।


এদিকে পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান এ আসনে ’৯১ সাল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছেন। কোন বারেই জয়লাভ করতে না পারলেও এরই মধ্যে এগিয়েছেন অনেকদুর। একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠ চাঙা করতে ২ বছর আগ থেকে মাঠে কাজ করছেন। দলকে সুসংগঠিত করছেন। মানুষের আপদে বিপদে পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করছেন। ধর্মীয় ও সামাজিক কোন কর্মকান্ডেই অংশ নিতে ভুল করছেন না তিনি। ঘুরছেন পাড়া মহল্লায়। হাটে বাজারে বর্তমান সরকারের দুর্শাসন ও স্থানীয় এমপি’র নানা অনিয়ম দূর্নীতির চিত্র তুলে ধরে নিজের সর্মথনে ভোট চাইছেন। নির্বাচনে বারবার হেরে গিয়ে বর্তমানে তিনি নিঃস্ব প্রায়- এমন কথা বলেও ভোটারদের সহানুভুতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।


জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘সুসংগঠিত হয়ে আমরা নির্বাচনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন হলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবো।


স্থানীয় অনেকের মতে, জোট বা মহাজোটের প্রার্থী নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামীলীগের প্রত্যাশা পূরণ না হলে সে ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের একটি অংশের সহানুভুতি নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার কথাও ভাবছেন বিএনপি প্রার্থী জাহিদুর রহমান। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রধানকে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। নইলে আসনটি হাত ছাড়া হতে পারে মহাজোটের।


 


হাসেম আলী/ এসএম


 


 

Print