‘সংসদে থেকে নির্বাচন করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না’

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০৬ নভেম্বর, ২০১৮ ১৮:১৫:৩৮
#

সংবিধান সংবিধান না করেই সুষ্ঠু ও সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আইনজীবী প্যানেলের আহ্বায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক। তবে তার মতে, এ জন্য সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করতে হবে।


সেইসঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় ঐক্যফ্রন্টসহ বিরোধী দল থেকেও কয়েকজনকে স্থান দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে। দাবির ব্যাপারে কোনো পক্ষের অনড় অবস্থান দেশের জন্য সুখকর হবে না।


নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ও আগামী সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক এসব কথা বলেন।


নির্বাচনকালীন সরকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারে গতকাল সোমবার বিকেলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সূত্র ধরেই ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় শাহ্‌দীন মালিকের সঙ্গে।


ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির একটি হচ্ছে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এ দাবির সপক্ষে আইনগত ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের জন্য কয়েকদিন ধরে ঐক্যফ্রন্ট ও আইনজীবী প্যানেলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বৈঠক চলছে। তবে সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে সংসদ ভেঙে নির্বাচনের প্রয়োজন নেই।


এ প্রসঙ্গে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, "দেখেন, এক দল সংসদে থেকে নির্বাচন করবে আর বিরোধী দল বা অন্যরা মাঠে থেকে নির্বাচন করবে, এতে তো নির্বাচনের জন্য 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' হবে না।


অতএব যারা সংসদে আছেন তাদের সংসদ ভেঙে দিয়ে অন্যান্য প্রার্থীর মতো এক কাতারে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে।


কারণ সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদেই নির্বাচন প্রসঙ্গে দুটি বিকল্পের কথা বলা আছে। প্রথমটি হলো সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা যাবে। আর দ্বিতীয়টি হলো সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা যাবে। দ্বিতীয় বিষয়টি ১২৩-এর ৩খ-তে স্পষ্ট বলা আছে।"


তার মতে, 'সংসদ ভেঙে দেওয়া অনেক দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রচলিত। ২০১৪ সালের আগে বাংলাদেশেও সব নির্বাচন সংসদ ভেঙে দিয়ে হয়েছে। তাই এ নিয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই।


সংসদ ভেঙে দিলেও নির্বাচনকালীন সরকার দলীয় সরকারই থাকবে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী ছাড়া নির্বাচনের মাঠে অন্য সবাই সমান থাকবে।'


'সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই' মন্তব্য করে প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই বিশিষ্ট আইনজীবী বলেন, 'বিদ্যমান সংবিধানের আলোকেই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব।


কারণ, সংবিধানে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের বিষয় বলা আছে। আবার সংসদ ভেঙে দিলে পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলো কী হবে, তাও সংবিধানে আছে।'


বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দলীয় সরকার না থাকলে নির্বাচন ভালো হবে। এ ধারণা থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই।


তাই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। তবে সেই দলীয় সরকার যাতে নির্বাচনে কম প্রভাব বিস্তার করে, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।


এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনিও চান না, একটা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হোক। এ জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যেসব বিষয় প্রভাব রাখতে পারে, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।'


জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে আগের সব সংলাপই ব্যর্থ হয়েছে, এবারের সংলাপের ভবিষ্যৎ কী দেখছেন- এমন প্রশ্নে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'সম্পূর্ণ আশাবাদী। এটা সফল হবে। কারণ দুটো। একটা হলো, অর্ধশতাব্দীর পথপরিক্রমায় রাজনীতিবিদরা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপকস্ফ হয়েছেন।


অতীতের সংলাপ সফল না হওয়ার চেয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দ্বিতীয়ত, সংলাপ সফল না হলে সবাই অশান্ত পরিবেশে পড়ব। সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের অশান্ত পরিবেশ ও বিরোধে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। অর্থাৎ অনেকেই কিছু সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবে।


এটাও নিঃসন্দেহে রাজনীতিবিদরা সম্পূর্ণ বুঝতে পারবেন।' তার মতে, 'দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিবিদরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটা সমাধানে আসবেন।


এ সমাধান হয়তো সবার কাছে শতভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না, কিন্তু সব পক্ষই সংলাপ থেকে কিছু না কিছু সমাধান পাবে এবং কিছু না কিছু ছাড় দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে যাওয়া যাবে।'


দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হয়ে সংলাপে যোগ দিয়েছে, আবার ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও ইঙ্গিত দিয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এ প্রশ্নে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'রাজনৈতিকভাবে বিএনপি কিছুটা দুর্বল অবস্থায় ছিল।


এবং রাজনীতির মাঠে তারা শক্তিশালীও হতে পারছিল না। এখন ঐক্য হওয়ায় ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম ও বিএনপিসহ দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট হওয়ায় বিএনপিসহ সবাই কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এখন শক্তিশালী।'


সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারে ঐক্যফ্রন্ট ও বিরোধী দলের মধ্যে কোন কোন মন্ত্রণালয়ের প্রসঙ্গ আলোচনায় রয়েছে- জানতে চাইলে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, '২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।


এখন প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাবের সঙ্গে আরও দুটি মন্ত্রণালয় বিরোধী দলকে ছেড়ে দেবেন- এমনটাই ভাবছি। এটা হতে পারে আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়।'


দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সংলাপে সম্মতি দিয়েছেন, এটা রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে- এমন প্রশ্নে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'এটা দুইশ'ভাগ ইতিবাচক দিক। অত্যন্ত প্রশংসনীয়।


এটা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ফল। তাদের (আওয়ামী লীগে) দলের অনেকেই তো কয়েক মাস আগেও বলেছেন- কিসের সংলাপ, কিসের আলোচনা।


সংলাপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে তার সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কারণ নির্বাচন বয়কট, সংঘাত কারও জন্য সুখকর হবে না।' (সমকাল)


 

Print