১৫ হাজার ২৭২ জন নিহত: ৩৪ বছর ধরে সুবিচারের অপেক্ষায়!

আন্তর্জাতিক
টাইম নিউজ বিডি,
০৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৬:০৬:৩০
#

ভোপালে বিশ্বের ভয়াবহতম গ্যাস দুর্ঘটনার ৩৪ বছর পরেও দুর্গতরা সুবিচারের অপেক্ষায়।


বিষাক্ত গ্যাসে মারা গেছে ১৫ হাজার ২৭২ জন। পরবর্তী প্রজন্মসহ মারণব্যধিতে আক্রান্ত ৫ লাখ ৭৪ হাজার। লাগাতার আন্দোলনেও সরকারের ঘুম ভাঙেনি।


মধ্যপ্রদেশের ভোপালে বিষাক্ত গ্যাস ট্র্যাজেডির ৩৪ বছর পরেও দুর্গতরা ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন৷ তাঁদের দাবি, উপযুক্ত পুনর্বাসন, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সুবিধা৷ ভোপাল গ্যাস বিশ্বের মারাত্মক শিল্প দুর্ঘটনার অন্যতম।


১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে কীটনাশক উত্পাদনকারী ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানায় এই দুর্ঘটনা ঘটে৷ কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত মিথাইল আইসো সায়ানাইড গ্যাসে মারা যায় আশপাশ এলাকার ১৫ হাজার ২৭২ জন।


বিষাক্ত গ্যাসের শিকার হয় পাঁচ লাখ চুয়াত্তর হাজার লোক৷ বিভিন্ন সংগঠন গ্যাস দুর্গতদের যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মেডিক্যাল সুবিধার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জল এবং মাটি শোধনের জন্য লাগাতার লড়াই জারি রেখেছে।


গত রবিবার এক যৌথ বিবৃতিতে গ্যাস পীড়িতদের অবহেলা করার জন্য সংগঠনগুলি দায়ী করেছে কেন্দ্র এবং রাজ্যসরকারকে৷


সরকারের এই উদাসীনতার জন্য ক্ষোভ উগরে দিয়ে ভোপাল গ্যাস পীড়িত মহিলা উদ্যোগ সংগঠনের কর্তা ব্যক্তি আবদুল জব্বার ডয়চে ভেলের কাছে মুখ খুললেন৷ তাঁর কথায়, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আজও পাওয়া যায়নি।


গত ২৫ বছরে দুই কিস্তিতে এসেছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা৷ গোটা জীবনের বিনিময়ে এই টাকা কিছুই না৷ দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত মেডিক্যাল কেয়ার পাওয়া যায়নি৷ ফুসফুসে টিবি, ক্যানসার, ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত বহু লোক. নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা।


ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক কণা চলে গেছে মাটির নীচে৷ দূষিত করেছে ভূগর্ভস্থ জল। প্রথম প্রথম ঐ জলই খেতো স্থানীয় লোকেরা। তারপর দীর্ঘদিনের দাবি অনেক টালবাহানার পর মেনে নিয়ে সরকার আলাদা পানীয় জলের ওভারহেড ট্যাঙ্ক বসায় এবং আলাদা পানীয় জলের ব্যবস্থা করে। কিন্তু সরকারের তরফে এটাই কি যথেষ্ট?


পরিবেশের ক্ষতিপূরণে সরকার কিছুই করেনি৷ যেমন, গবাদি পশু মাঠেঘাটে চরতে গিয়ে যে ঘাস বা পাতা খায় বা যে জমা জল খায় তা রয়ে গেছে। আর সামান্য যে ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়েছে, সেটা ইউনিয়ন কার্বাইডের তরফে দেওয়া হয়েছিল৷ সরকার সেটাই ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিয়েছে৷ নিজস্ব তহবিল থেকে কিছুই দেয়নি।


কংগ্রেস বা বিজেপি সরকার তাহলে কী দিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ভোপাল গ্যাস মহিলা উদ্যোগ সংগঠনের আবদুল জব্বার ডয়চে ভেলেকে বললেন, বিজেপি সরকার তো কিছুই দেয়নি৷ সম্ভবত গ্যাসপীড়িতদের বেশির ভাগই মুসলিম, তাই বিজেপি সরকারের মাথা ব্যথা নেই৷ এই মানবিক ট্র্যাজেডিতেও হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ!


আরো একটা কথা, আদালতের মূল্যায়নও যথার্থ নয়৷ তবে আদালত স্বীকার করেছেন, ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়৷ আরো বেশি হওয়া উচিত৷ সর্বোচ্চ আদালত এখন অবহিত যে, গ্যাসপীড়িতদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার৷ মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৭২। তাই পুনর্বিবেচনার জন্য আর্জি জানানো হয়।


তবে এখনো তা আদালতে৷ এখানেই শেষ নয়৷ মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে ইউনিয়ন কার্বাইডের মালিক ডো কেমিক্যালস এবং ডু-পন্ট কোম্পানি একত্রীকরণের বিষয়টি৷ এর ফলে ইউনিয়ন কার্বাইডের আইনি অস্তিত্ব আর থাকছে না। ফলে ইউনিয়ন কার্বাইডের কাছ থকে ক্ষতিপুরণ আদায়ের আশা আর নেই বললেই চলে।


ভোপাল গ্যাসপীড়িত সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে এক চিঠিদিয়ে এই মর্মে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় যে, প্রকৃত মালিক ডো-কেমিক্যালস যেন আইনের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে। তাদের মৌলিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়।


কিন্ত আজ পর্যন্ত কোনো জবাব আসেনি। ভোপাল গ্রুপ ফর ইনফর্মেশন অ্যান্ড অ্যাকশন সংগঠনের রচনা ধিংড়ার কথায়, সুপ্রিম কোর্টের নিযুক্ত মনিটরিং কমিটির ৮০ শতাংশ চিকিত্সা সংক্রান্ত সুপারিশ কার্যকর হয়নি। ভোপাল গ্যাসপীড়িত মহিলা সংগঠনের প্রেসিডেন্ট রসিদা বী বলেন, ২০০৪ সাল থেকে কারখানার চারপাশের আরো ৪২টি জনবসতিতে রাসায়নিক দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে।


সেখানকার প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাতে আক্রান্ত৷ তা সত্ত্বেও সরকার হাত গুটিয়ে বসে আছে৷ তবে হাল আমরা ছাড়িনি৷ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।


তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর শাসনকালে প্রায় ৭০০ নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয়৷ কিন্তু আমলারাজ আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলির যোগসাজসে সেইসব তথ্যপ্রমাণাদি চাপা পড়ে যায়৷ কেন এবং কার ভুলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেলেছিল, তা চলে যায় হিমঘরে।


দুর্গতদের বিনামূল্যে রেশন দেওয়া শুরু হয়েছিল বটে, বছর খানেক পর তা-ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকার, সমাজ এবং চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা এই দুর্ঘটনার ফলে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অভিঘাত খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি৷ আজও পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদেরকে তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে। ডিডাব্লিউ।


এএস

Print