আসামে ’নাগরিকত্ব বিল’ ও মোদীর ভোটব্যাংক রাজনীতি

জিল্লুর রহমান
টাইম নিউজ বিডি,
২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৮:৩৬:৪৪
#

কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস’র কর্মী পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতার প্রথম দিন থেকে অনেকেই ভালোভাবে নিতে পারে নি। কারণ সবারই কমবেশি ধারণা ছিল মোদী ধর্মের ক্ষেত্রে সৌহাদ্যপূর্ণ না হয়ে বরং উগ্রতার দিকে চলে যেতে পারেন এবং ভারত ক্রমান্বয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা হারাবে।


ক্ষমতার পরের দিন থেকে ঠিক সেটিই দেখা গেলো। ক্রমান্বয়ে গাঢ় হতে লাগলো মোদীসহ বিজেপি নেতাদের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব। তারই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে মাঝামাঝিতে মোদী সরকার হঠাৎ তেল দেওয়া শুরু করলো আসামের ‘নাগরিকপঞ্জি গঠনে’। যদিও এই উদ্যোগটা আসামের বাংলাভাষী মানুষদের বিরুদ্ধে কিন্তু আড়াল থেকে বললে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সেটা পরবর্তী কার্যক্রমে ধরা পড়ে।


গত বছরে জুন-জুলাই থেকে শুরু হওয়া আসামে নাগরিকপঞ্জি বা হালনাগাদে বছরের শেষ দিকে এসে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাভাষীকে অবৈধ ঘোষণা করে ভারতের এনআরসি। অর্যািকৎ এই ৪০ লাখ কথিত অবৈধ বাংলাভাষী গোষ্ঠি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে আসামে অবস্থানের প্রমাণপত্র দেখাতে পারে নি। সুতারাং ৪০ লাখ ’বাঙ্গালি’র নতুন বছর শুরু হয়েছে ’রাষ্ট্রবিহীন’ নাগরিক হিসেবে।


প্রায় ৪০ লাখকে অবৈধ করার পর দেখা গেলো এর ৫০ শতাংশ হিন্দু এবং ৪০ শতাংশ মুসলমান। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হলো হিন্দুদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কিন্তু মুসলমানদেরকে না। আর এর জন্য প্রয়োজন আইন সংশোধন যা ইতিমধ্যে গত ৮ জানুয়ারি ভারতের আইনসভার নিম্নকক্ষ (সংসদ) লোকসভায় পাস হয়ে গেছে। এখন শুধু রাজ্যসভায় পাসের অপেক্ষা। তাহলে মুসলমানদেরকে অবৈধ করে হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের যারা গত চার বছর আগ থেকে আসামে বসবাস করছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।


এখন প্রশ্ন হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ কেন এমন করলো? এনআরসির মাধ্যমে নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ করতে গিয়ে করলো ৪০ লাখ বাংলাভাষীকে অবৈধ যাদের তারা আখ্যা দিচ্ছে ’অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে । তারপর আইন করার মাধ্যমে শুধু মুসলমানদেরকে বাদ দিয়ে বাকিদেরকে রাখা হচ্ছে। কেন?


এর প্রধানত কারণ তিনটি। এক, ভারতকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে গঠন । দুই, মোদীর ভোটব্যাংক রাজনীতি ও তিন, বাংলাদেশকে চাপে রাখা।


এক নম্বর কারণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোদীর ক্ষমতার প্রথম থেকে ভারতে ধর্মতান্ত্রিক জটিলতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা থেকে এটি ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে। গরু কেন্দ্রিক মোদীর ধর্মীয় রাজনীতি সবচেয়ে হীনমন্যতার পরিচয় দিয়েছে ভারতে ইতিহাসে। ভারতে একজন মুসলমান এখন গরু নিয়ে রাস্তায় মাঠে-ঘাটে বের হতে পারে না কারণ গরু ঠিকই থাকে মানুষটা বাসায় লাশ হয়ে ফিরে। অনেক মুসলিম গরু ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ আছে। বর্তমানে যে অবস্থা ভারতে গরু অসুস্থ হলে তার জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় কিন্তু মানুষ মারা গেলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না।


সম্প্রতি লোকসভায় পাস হওয়া নাগরিকত্ব আইনে ধর্মকে মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করায় এই বিল ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেকে বলছেন, এটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের ওপর একটি বড় আঘাত। ধর্মের কারণে নির্যাতনের শিকার হলে সবাইকে আশ্রয় দেওয়া উচিত ভারতের।


যখন মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের জন্য নির্যাতিত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় চেয়েছিল, তখন ভারত সরকার তাদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। উল্টো তারা রোহিঙ্গাদের ভারতের জন্য হুমকি মনে করে তাদের দেশ থেকে জোর করে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে।


এই প্রেক্ষাপটে, মানবিক কারণে এই বিল পাস করা হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। তাহলে এই বিলকে সমর্থন করার জন্য ভারত সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?


ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির উত্তর-পূর্বাঞ্চলবিষয়ক প্রধান কুশলী ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি বিলটির প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচন করেছেন। আর সেটা হচ্ছে, ভারতের তথাকথিত হিন্দু পরিচয় রক্ষা করা।


নাগরিকত্ব বিলটি লোকসভায় উত্থাপনের আগে শর্মা বলেন, ‘এই বিলটি যদি পাস না হয়, তাহলে আসামের হিন্দুরা আগামী মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। আর এটা তাদের জন্য লাভজনক হবে, যারা আসামকে আরেকটি কাশ্মীর বানাতে চায় এবং রাজ্যটিকে অস্থিতিশীল করতে চায়।’


দ্বিতীয় কারণ মোদীর ভোটব্যাংক রাজনীতি। তার কারণ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গে আসন ৪২টি। আর আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্য মিলে আসন ২৪টি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মাত্র দুজন লোকসভা সদস্য। আর সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে আটজন। গত নির্বাচনের এই চিত্র সামনে রেখেই বিজেপি এখন অসমে রাজনৈতিক জুয়ায় লিপ্ত।


দলটির নীতিনির্ধারকেরা দেখেছেন, নাগরিকপঞ্জি এবং নাগরিক আইন সংশোধন উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গে তার আসন বাড়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, নাগরিক আইন সংশোধিত হলে বাংলাভাষী উদ্বাস্তু হিন্দুদের অনেকে লাভের সম্ভাবনা দেখতে পাবেন। এতে সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএম ও তৃণমূলের ভোট কাটা পড়বে। আর আসামেও যে ভাটা পড়ছে সেখান থেকে কিছুটা হলেও রেহাই হবে।


তৃত্বীয় কারণ বাংলাদেশকে মানসিক ভাবে চাপে রাখা। স্বাভাবিকভাবে এশিয়ার মধ্যে ক্রমান্বয়ে অধিপত্য হারাতে বসেছে ভারত। বিশেষ করে নেপাল ও ভূটানে ভারতের আধিপত্য অধিকাংশই কেড়ে নিয়েছে চীন। শ্রীলঙ্কায়ও যায় যায় অবস্থা।


আছে শুধু এখন বাংলাদেশ। আর এর ওপর সর্বোচ্চ আধিপত্য ধরে রাখতে চায় ভারত। আর এর জন্য প্রয়োজন একে নিয়ন্ত্রণে রাখা।


হঠাৎ করে এই দেশে চীনের নজর ভারতকে কিছুটা চিন্তায় ফেলেছে। যার কারণে বাংলাদেশকে মানসিক চাপে রাখতে এই আইন বা হুমকি। স্বাভাবিকভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ গভীর সংকটময় স্থানে আছে। এই ইস্যুতে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের মনোমালিন্য চলছে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক বরাবরই উৎফুল্লের জায়গায় আছে।


এদিকে এ মাসের শুরুতেই ভারত থেকে প্রায় ১৩০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তাই পাঠিয়ে দিয়েছে। এমনিতে ১২ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে চাপে বাংলাদেশ। তার ওপর ১৩০০ রোহিঙ্গা পাঠিয়ে দেয়া বন্ধুত্বের দাবিদার না হলেও চাপের দাবিদার। স্বার্থ কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় ভারত বাংলাদেশে যেমন রোহিঙ্গা পাঠাচ্ছে আবার মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন সমাধান বা সংকট নিরসনে অন্য দেশের আধিপত্যকে জায়গা না দিতে পারে তার জন্যই এই মানসিক চাপ।


সবমিলিয়ে ভারতের লোকসভায় নাগরিকত্ব আইন পাস করার মাধ্যমে মোদী রাজনীতির নতুন হিসাব কষছে এবং এপ্রিল-মে মাসে নতুন নির্বাচনে আরেকধাপ থেকে যাওয়ার মহাপরিকল্পনায় ব্যস্ত বলে ধারণা করা যাচ্ছে। কারণ ক্ষমতার লোভতো সবারই কমবেশি আছে।


 


জিল্লুর রহমান


 

Print