ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ‘আবর্জনার’ মেলা

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৭:৫৯:৫৭
#

স্বাভাবিকভাবে একটি পরিবারের সদস্যদের রুচিবোধ সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে সে পরিবারের টয়লেটগুলো চেক করলে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায় । ঠিক তেমনি একটি শহর বা দেশের যে অঞ্চলে বা যে জায়গায় অধিকাংশ সাধারণ মানুষের যাতায়াত থাকে সে জায়গায়টি ভাল করে খেয়াল করলে সে দেশের বা শহরের মানুষের রুচিবোধ পাশাপাশি নাগরিক সুবোধ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।


কোন অঘটন না ঘটলে প্রতি বছর স্বাভাবিকভাবে পহেলা জানুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা শুরু হয় ঢাকায়। তবে এবার একটু দেরিতে শুরু হয়েছে নির্বাচনের কারণে। এই রকম মেলা চট্টগ্রামে আয়োজন করা হয়ে থাকলেও তেমন সাড়া মেলে না শহর বা দেশের মানুষের কাছে যতটুকু সাড়া মেলে ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা’ । এই মেলায় গ্রাম থেকেও মানুষ আসার চেষ্টা করে আর শহরের মানুষতো একবার হলেও চেষ্টা করে যাওয়ার। প্রতিদিন কয়েকলাখ মানুষের গমনাগমন থাকে মাসব্যাপি এই বাণিজ্য মেলায়।


এই মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বিদেশি ব্যবসায়িদের আকৃষ্ট করে। আলাদভাবে স্টল দিয়ে তাদের পণ্য প্রচার,বিক্রি ও প্রদর্শনের সুযোগ থাকে। তাই এখানে শুধু বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াত থাকে না। থাকে ভিন দেশি মানুষদের আকর্ষণ। সপ্তাহের বিশেষ দিনগুলো যেমন শুক্রবার এবং শনিবার মানুষেল প্রচণ্ড ভিড় থাকে।


স্বাভাবিকভাবে দেশের বা শহরের অধিকাংশ মানুষদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় সরকার সবসময় চেষ্টা করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশের মধ্যে মেলার আয়োজন সম্পন্ন করতে। নিরাপত্তার জন্য মেলার ভিতরে পুলিশ ক্যাম্পসহ চেকিং পোস্ট এবং কিছুদূর পরপর পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য কিছুদূর পরপর ‘ওয়েস্ট বিন’ বা ‘ডাস্ট বিন’ বা বাংলাতে বললে ময়লার ঝুড়ি রাখা আছে।


সরকারের থেকে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ও যথাযথ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সাধ্যমতো সবটুকু করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ সরকারের কাজ সরকার করেছে। কিন্তু মানুষের কাজ কি মানুষ করে?


কারণ মেলায় হাঁটার সময় আপনি ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে সব সুন্দর কিন্তু নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে একপর্যায়ে রুচিতে বেঁধে যেতে পারে। পরিত্যাক্ত কাগজ, পলিথিন ও মানুষের খাওয়া শেষে উচ্ছিষ্ট আবর্জনা। কিছু কিছু দোকানে দেখা গেলো ব্যাক্তিগত উদ্যোগে ডাস্ট বিনের ব্যবস্থা রাখা আছে। ডাস্ট বিনের ভেতরে তাকালে শুধু তলাটা দেখা যায় না বাকিটা খালি।


এখন প্রশ্ন উঠে কয়েক গজ পরপর ময়লা ফেলানোর ব্যবস্থা থাকলেও বাণিজ্য মেলার এই দশা কেন? কারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের সুবোধ এখনো জেগে উঠে নি। আমরা এখনো শহর বা দেশের মানুষ রুচিশীল হয়ে উঠতে পারে নি । পারেনি নিজেদের মধ্যে কর্তব্যবোধ জাগ্রত করতে। যে জায়গায় খাচ্ছি সেখানে পায়ের পাশেই ময়লা রেখে চলে যাচ্ছি। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে
বাণিজ্য মেলায় বসার জন্য কিছু কিছু সুন্দর করে ফুল গাছ লাগিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেই জায়গাটাও জাতি ছাড় দেয় নি। সেই ফুলগাছগুলোর ওপর ময়লা ফেলে রেখে গেছে।


ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অনেক উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম উদ্যোগ হচ্ছে রাস্তায় কিছুদূর পরপর ডাস্ট বিনের ব্যবস্থা করা। পাবলিক ডাস্ট বিন ব্যবহারতো দূরে থাক কিছুদিন পর দেখি ডাস্ট বিন হাওয়া। ডাস্টবিনের চারপাশে লোহার অ্যঙ্গেল দিয়ে আটকানো ছিল। অ্যাঙ্গেল আছে কিন্তু ডাস্ট বিন নেই। অনেক জায়গায় ডাস্ট বিন আছে কিন্তু ময়লাগুলো পাশে পড়ে আছে।


এতো গেছে পরিবেশ নোংরা করার অভিযোগ। এবার আসেন সড়ক আইন না মানার অভিযোগ। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় যাওয়ার জন্য দুটি রুট ব্যবহৃত হয়। একটি মিরপুর-দারুসসালম রোডে কলেজ গেট দিয়ে ঢুকতে হয় আরেকটি মিরপুর ১০-কাজীপাড়া রোডে।


কলেজগেটে রাস্তা পারাপারের জন্য ফুট ওভারব্রীজ থাকলেও নেই মিরপুর১০-কাজীপাড়া রুটে নেই। দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ ঔই ফুট ওভারব্রীজ ব্যবহার করে না। নিচ দিয়ে পারাপারের কারণে রাস্তায় জ্যাম লেগে থাকে।


কয়েকদিন আগেও বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি আন্দোলন জায়গা করে নিয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ । একটি সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। যার প্রধান প্রতিপাদ্য সড়কগুলো নিরাপদ করা নাগরিকদের জন্য। কিন্তু রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ সড়ক আইন মানে না বিশেষ করে সময়ের সল্পতার জন্য ফুট ওভারব্রীজ ব্যবহার করে না। আর ড্রাইভারগুলোর অস্থিরতাতো আছেই।


এখন সাধারণ মানুষ যদি আইনগুলো যথাযথ পালন করার পর কোন সমস্যায় পড়ে সেক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিলে ফল পাওয়া যায় । তা না হলে সম্ভব হয় না যার বড় উদারণ সড়ক আন্দোলনের পর পরবর্তী পরিস্থিতি। একজন ড্রাইভারের যেইরকম সচেতনতা প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সাধারন শিক্ষিত জনতার আইন মানা। কোনটাই হয় না। শুধু পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয় আর মামলা দেয়া হয়। এটাই পরিবর্তন।


প্রথম থেকে বলা হয়েছিল যে শহরে বা অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে আমজনতার যাতায়াত তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে সেখানের তখনকার পরিস্থিতি দিয়ে নাগরিকবোধ যাচাই করা যায়। যেহেতু বাণিজ্য মেলা মানুষের অন্যতম সমাগম তাহলে মেনে নিতে পারি দেশের মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে কিন্তু সুশিক্ষা নিয়ে নাগরিকবোধ জাগ্রত করতে পারছে না। ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষার ব্যর্থতা আমাদের সবার।


জেড

Print