রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ উস্কে দেয়ার আশঙ্কা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

কুটনৈতিক প্রতিবেদক
টাইম নিউজ বিডি,
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৮:৪০:১৮
#

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, শান্তিপূর্ণ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে সেখানে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটতে পারে।


আজ রাজধানীর হোটেল কন্টিনেন্টালে ‘মানবাধিকার ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক সেমিনারে মন্ত্রী এমন মন্তব্য করেছেন।


পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে কক্সবারের জরাজীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে এবং এখনো পর্যন্ত সরকারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সেখানে অনাকাঙ্খিত কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।


তিনি বলেন, অত্র অঞ্চলের মূল বাসিন্দাদের চেয়ে কয়েকগুন বেশি উদ্বাস্তুর সেখানে বসবাস। সরকারের গভীর তত্ত্বাবধান ও নজরদারির কারণে এ যাবত সেখানে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা দাঁনা বাধতে পারেনি।


কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে দেখা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতি যেখানেই সৃষ্টি হয়েছে সেখানেই সন্ত্রাসবাদ জন্ম লাভ করেছে। তাই বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নাই।


মন্ত্রী আরো বলেন, এটা শুধু বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমারের বিষয় নয়, এখানে রোহিঙ্গাদেরকে ভিত্তি করে কোনো সন্ত্রাসবাদী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা এই পুরো অঞ্চল তথা গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি স্বরুপ।


মানবাধিকারের দৃষ্টান্ত স্থাপন


পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবাধিকারের উদাহরণ হলো প্রতিবেশী দেশের নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দেয়া।


তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হচ্ছিল,  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনাকারীদের মুখে চুনকালী দিয়েছে।  


”বাংলাদেশ যদি এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিতেন, তাহলে কয়েক লাখ লোক মারা যেতেন। ফলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সেখানে সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা ঘটতো।”


জাতিসংঘসহ অনেকেই এটাকে ভয়াবহ জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে- উল্লেখ করে মন্ত্রী আরো বলেন, যদি মানবাধিকার সুরক্ষা করতে হয় তাহলে এইসব রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদে ও সব মৌলিক মানবিক অধিকারসহ ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।


তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হবে তাদেরকে তাদের নিজ বাড়িতে নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করা যাতে তারা সেখানে গিয়ে চলাফেরা, থাকা-খাওয়া, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে কাজ করা এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।


সেফ জোনের প্রস্তাব


রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে নিরাপদ অঞ্চল গঠনের ব্যাপারে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তিতে এটি সেভাবে আগায়নি।


”বিষয়টি আমরা নতুনভাবে প্রস্তাব দিচ্ছি, সেখানে একটি নতুন আঙ্গিক যোগ করা হয়েছে। মায়ানমারই এই সমস্যার সৃষ্টিকারী, তাকেরই তা দুর করতে হবে।”


এখান বিশ্বাসের একটি ফাঁরাক রয়েছে, সেজন্য মিয়ানমারের আস্থা রয়েছে এমন দেশের পক্ষ থেকে নিরাপদ অঞ্চলের ব্যাপারে মিয়ানমরাকে বলা উচিত- মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারেরই একটি প্রদেশ হিসেবেই রাখাইনে একটি সেফ জোন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।


”বিশেষ করে ভারত, চীন কিংবা আসিয়ান রাষ্ট্রসমূহ এটা দেখভাল করবে তার কারণ হলো – এদের প্রতি মায়ানমারের অনেক আস্থা রয়েছে।”


আমাদের মূল লক্ষ্য হলো রাখাইনে যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ফেরত যায় এবং সেখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। অনেকগুলো দেশ একসাথে এটা দেখভাল করলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে।


মন্ত্রী বলেন, মায়ানমার আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র, আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যেটা ভালো হয় সেভাবেই আগাবো।


রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ভারত সব ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশকে প্রদান করবে বলেও মন্ত্রী দাবি করেন।


বাংলাদেশ মানবাধিকারের মডেল


বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, মানুষকে কাজ করার অধিকার দিতে হবে, তাদেরকে জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তা দিতে হবে।


”মানুষকে খাওয়া দাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে, বাসস্থান ও বস্ত্রের নিশ্চয়তা দিতে হবে। এগুলো হলো প্রধান মানবাধিকার।”


আমাদের দেশ এই ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মধ্যে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি উত্তম মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে – দাবি করে মন্ত্রী বলেন, আমরা অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মোটামুটি নিশ্চয়তা দিতে পেরেছি, এখন আর কোনো লোক না খেয়ে মরে না, মঙ্গায় মরে না।  


“আমরা ১৮,৫০০ ক্লিনিক তৈরি করেছি যাতে আমরা স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারি। প্রতিটি লোক যাতে চাকরি পায়, কিংবা কোনো না কোনো কর্ম করে খেতে পারে তার জন্য আমরা নানা ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। আমরা সহজ ঋনের ব্যবস্থা করছি। এগুলো সবই মানবাধিকারের সাথে জড়িত।“


তিনি দাবি করেন, সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হলো তার অর্থনৈতিক উন্নতি। বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রে অন্য বহুদেশের তুলনায় অগ্রগতি সাধন করেছে।


কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন যে এখানে কেউ ভুল তথ্য দিলে তাকে জেলে ঢুকানো হয়। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, খামাখা বিশৃঙ্খলা করার জন্য অনেকেই জনসম্মুখে অনেক অসত্য কথা বলেন। আইনের আওতায় তাদের শাস্তি হওয়া দরকার।


পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেকে বলেন সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত হয়েছে বলেই বাংলাদেশ ৬ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। 

Print