প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেটে রাজধানীতে চলছে ভিক্ষা বাণিজ্য

সাইফুল ইসলাম মাসুম, স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২০:৫২:০৩
#

রাজধানীতে প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে ভিক্ষা বাণিজ্য। আর এই সিন্ডিকেটের বড় অংশজুড়েই প্রশাসনের কিছু বড় কর্মকর্তা জড়িত বলে জানা গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই এই সঙ্ঘবদ্ধ ভিক্ষুক সিন্ডিকেটচক্র চালাচ্ছে ভিক্ষার নামে বাণিজ্য।


প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ শিশু ও গরীব নারী-পুরুষ-শিশু এনে ভিক্ষার কাজে লাগানো হচ্ছে।



অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে ভিক্ষা করতে হলে এই সব সিন্ডিকেটের সদস্য হতে হবে, না হলে কোনো স্থানেই কারো পক্ষে ভিক্ষা করা সম্ভব হয় না।


সরজমিন আরো দেখা যায়, কাকরাইল মোড়ে এক মাস বয়সের একটি শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছিল তাসলিমা বেগম। অসুস্থ শিশুর ওষুধ কেনার জন্য সে টাকা চাচ্ছে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা প্রাইভেট গাড়ি বা সিএনজি যাত্রীদের কাছে।


ভিক্ষার মাধ্যমে যে টাকা পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে কী সত্যি সত্যি শিশুটার চিকিৎসা করানো হচ্ছে-জানতে চাইলে অনেকটাই বিরক্ত হন তাসলিমা।


এইডা আমার পুঁজি


“দ্যাহেন, আমার এই শিশুই আমার পুঁজি। ওরে দিয়ে যা পাই হেইডা দিয়েই আমার সংসার চলে। ওরে ক্যামনে চিকিৎসা করানো লাগবে হেডা আমি বুঝবানে। আপনে আপনার কাজে যান”।



এভাবেই শিশু ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাজে লগিয়ে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য চলছে সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে। এমনকি সুস্থ মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অসুস্থতার অভিনয় করিয়ে ভিক্ষা বাণিজ্যে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।


শুধু তাই নয়, নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে চলাচলে অক্ষম বৃদ্ধদেরও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করছে এ অপরাধী চক্র। শুধু বেঁচে থাকা বা পেটের দায়ে নয়, ভিক্ষা করে বা ভিক্ষুকদের সিন্ডিকেট করে বাড়ি-গাড়ি করার নজিরও রয়েছে বেশ কিছু।


সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিসংখান অনুযায়ী ঢাকাতে প্রতিদিন ৫০ হাজার ভিক্ষুক বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে থাকেন। কিন্তু বেসরকারি তথ্য মতে এর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। আর প্রতিদিন এসব ভিক্ষুক থেকে প্রায় ২০ কোটি এবং মাসে প্রায় সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডেকেট চক্রিটি।


জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় শতাধিক ভিক্ষুক কল্যাণ সমিতি রয়েছে এবং বৈধ-অবৈধ মিলে ভিক্ষুক কল্যাণ সংস্থা আছে প্রায় ২৫০টি। এসব সমিতি পরিচালনা করেন প্রভাবশালী চাঁদাবাজ চক্র। তাদের সাথে আইনশৃংখলা বাহিনীর এক শ্রেণীর অসাধু সদস্যেরও রয়েছে গোপন আঁতাত।


এসকল সংস্থার আওয়াতায় ভিক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয় ৫০০ টাকা করে। রেজিস্ট্রেশনের পর তারা ঠিক করে দেয় কোন ভিক্ষুক কোন এলাকায় কাজ করবে। একটি চক্রের আওয়াতায় থাকে দুই হাজার ভিক্ষুক এবং প্রতিজন ভিক্ষুককে প্রতিদিন সমিতি এবং সংস্থাকে ৫০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।


বিভিন্ন সময় রাজধানীতে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই ধরনের অপরাধ চক্রের সদস্যদের স্বীকারোক্তি হিসেবে এসব ভয়ঙ্কর তথ্য পাওয়া যায়।


প্রতি দলে একজন ম্যানেজার


রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার অন্ধ ভিক্ষুক বাকি মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন সংস্থার নামে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিয়মিত ভিক্ষা করছে কিছু অন্ধ ভিক্ষুক। প্রতিটি দলের সাথে থাকে একজন করে ম্যানেজার।



সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিক্ষুক নেতা নামে বাবুল মিয়া প্রায় তিনশত লোক ভিক্ষার জন্য পরিচালনা করে থাকে। আর তিনি ভিক্ষুকদের বিভিন্ন ছোট ছোট দলে ভাগ করে গুলশান, বনানী, খিলক্ষেত, টংগী, নিকুঞ্জ, বিমানবন্দরসহ অনেক জায়গায় ভিক্ষার কাজ করিয়ে থাকে।


রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানের সামনে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে জড়ো হয় প্রায় অর্ধশত ভিক্ষুক। যাদের একটা বড় অংশই ভিক্ষা করেন সপ্তাহে একদিন এবং শবে বরাত, রমজান ও ঈদ উপলক্ষে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর তাদেরকে বলা হয় মৌসুমি ভিক্ষুক।


এছাড়াও অনেকেই আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ না করে বিভিন্ন অজুহাতে ভিক্ষাকেই অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।


আকলিমা নামে একজন ভিক্ষুক বলেন, আমি ভাঙ্গারি দোকানে কাজ করি। শুক্রবার শুধু ভিক্ষা করতে আসি। এক/দুই ঘন্টা ভিক্ষা করি। আর এতেই আমার হাতখরচ হয়ে যায়। যারা প্রতিদিন ভিক্ষা করে তাদের শুধু ভিক্ষুক বলবেন, আমাকে ভিক্ষুক বলা যাবে না।


অসহায় মুসুল্লি


জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের সামনে দেখা যায় মুসুল্লিদের কাছ থেকে ভিক্ষুকরা বিভিন্ন অযুহাতে কাকুতি মিনতি করে ভিক্ষা চাচ্ছে। এতে করে মুসল্লিরা বিরক্ত হলেও অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে ভিক্ষুকদের কাছে।



বাইতুল মোকাররম মসজিদের নিয়মিত মুসল্লী আবুল খায়ের টাইম নিউজবিডিকে বলেন, এরা সম্পূর্ণ সুস্থ, কাজ করতে পারবে, কিন্তু করবে না। কারণ ভিক্ষা হচ্ছে বিনা পুঁজিতে ব্যবসা।


আবার দেখা যায় অনেকে আবার বাচ্চাদের নিয়ে আসে ভিক্ষার জন্য। আর এরা খুব জবরদস্তি করে ভিক্ষা চায়। ভিক্ষা না দিলে অনেক সময় গালাগালও করে। এজন্য তাদের ভিক্ষা দেই না শুধু যারা অসহায় তাদের দেই।


মিরপুর দশ নম্বর গোলচত্ত্বরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিক্ষুকদের এক দালাল টাইম নিউজবিডিকে জানায়, আমি এই কাজ করি ১৫ বছর হলো। প্রথমে ১০০ টাকা দৈনিক হাজিরায় কাজ করলেও এখন আমার আয় প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা।


নাম বললে প্রাণও যেতে পারে


নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাম কখনোই বলা যাবে না। তাহলে আমার আয় রোজগার তো বন্ধ হয়ে যাবে, প্রাণে বাঁচাও দায় হবে।



সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি জানান, ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে চলে চাঁদাবাজিও। অন্তত ৩০০ পয়েন্টে একজন করে লাইনম্যান ভিক্ষুকদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট।


কয়েকজন ভিক্ষুক টাইম নিউজবিডিকে আরো জানায়, খিলগাঁও ডিসিসি মার্কেট এলাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভিক্ষুকদের একটি সিন্ডিকেট। টুন্ডা আমান উল্লাহ ও কানা ফজলুর নেতৃত্বে ২০ জন এসব দলের প্রধান। বাড়তি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে তারা নানা প্রলোভনে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুদের অগ্রীম টাকা দিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসে। ভিক্ষার অর্ধেক টাকা দিতে হয় এ চক্রের তহবিলে।


রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ভিক্ষুক দেখা যায় মহাখালী রেলগেট মসজিদ, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, হাইকোর্ট মাজার ও মসজিদ, মিরপুর শাহ আলী মাজার ও মসজিদ, গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার, চকবাজার মসজিদ, আজিমপুর কবরস্থান এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে।


ভিক্ষুক কমিটির নেতা মিজান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, আমরা ভিক্ষুকদের কল্যানে কাজ করে থাকি। ভিক্ষুকদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধার জন্য রয়েছে কল্যাণ ফান্ড।


অনেকের মতে, শুধু ভিক্ষুকদের ব্যাপারে সচেতেন হলেই হবে না। পাশাপাশি এসব সিন্ডিকেটকে শক্ত হাতে দমন করার ব্যাপারেও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো আন্তরিক হতে হবে।


কর্মসংস্থান জরুরী


দালাল চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে, পাশাপাশি হতদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানে সরকারকে আরো সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এক কর্মকর্তা টাইম নিউজবিডিকে বলেন, এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে অঙ্গহানির কাজটি যারা করছে তাদের ধরতে বিশেষভাবে কাজ করছে র‌্যাব।


সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (কার্যক্রম) আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বলছিলেন, কাউকে ভ্যান, কাউকে রিকশা, কাউকে সেলাই মেশিন এরকম বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিয়ে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।


এসএম/বাবলু

Print