দুই কারণে পুড়িয়ে মারা হয় নুসরাতকে

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১৪:৫৩:২৪
#

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (বহিষ্কৃত) এসএম সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় নুসরাত জাহান রাফিকে। বোরকা ও হাতমোজা পরে তার শরীরে আগুন দেয় কমপক্ষে চারজন। এদের মধ্যে ছিল দু’জন ছাত্র এবং দু’জন ছাত্রী। তারা রাফিরই সহপাঠী।


শনিবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পিবিআইর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।


এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮ আসামির মধ্যে ৭ জন রয়েছে। এজাহারের বাইরে আরও ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের বাইরে থাকা এজাহারভুক্ত একমাত্র আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কমপক্ষে ৬ জনকে খুঁজছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নুরুদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলেও জানান বনজ কুমার। রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনায় করা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই।


সংবাদ সম্মেলনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত এজাহারভুক্ত আসামিরা হল- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা (৫৫), মাদ্রাসার ছাত্র ও ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন (২০), মাদ্রাসা শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (শুক্রবার দল থেকে বহিষ্কার করা হয়) মাকসুদ আলম (৪৫), মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) এবং মাদ্রাসার শিক্ষক আফসার উদ্দিন (৩৫)। সন্দেহভাজন হিসেবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা হল- আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়া। তবে পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, যারা সরাসরি রাফির গায়ে আগুন দিয়েছে তাদের মধ্যে শামীম, নুরুদ্দিন এবং শম্পা বা চম্পা ছিল। তাছাড়া ‘ম’ আদ্যাক্ষরের এক ছাত্রী আছে।


সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাফিকে আগুন দেয়ার একদিন আগে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। এ সময় রাফিকে হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ। রাফিকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। কিভাবে পোড়ানো হবে সে বিষয়ে নুরুদ্দিন ও শামীমের নেতৃত্বে বিশদ পরিকল্পনা করা হয়।


বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই কারণে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এর একটি হল- অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করে রাফি আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করেছে খুনিরা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ শামীম দীর্ঘদিন ধরে রাফিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। রাফি তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করছিল। এ ক্ষোভ থেকে শামীম তাকে হত্যা করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়।


তিনি আরও জানান, ২৭ মার্চ নুসরাতকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ কারাগারে যায়। তাকে বাঁচানোর জন্য মাকসুদ আলম, নুরুদ্দিন এবং শামীমসহ অনেকে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেয়ার পর ৪ এপ্রিল নুরুদ্দিন, শামীম, জাবেদ, কাদেরসহ কয়েকজন কারাগারে গিয়ে সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করে।


পরদিন ৫ এপ্রিল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। সেখানেই রাফিকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠকে যারা ছিল তারা বিষয়টি আরও ৫ জনের কাছে শেয়ার করে। এদের মধ্যে দু’জন মাদ্রাসাছাত্র এবং দু’জন মাদ্রাসাছাত্রী ছিল।


এদের মধ্যে এক ছাত্রীর দায়িত্ব ছিল ৩টি বোরকা আনা এবং কেরোসিন সরবরাহ করা। ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল তিনটি বোরকা ও পলিথিনে করে কেরোসিন এনে ওই ছাত্রী সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বাথরুমে লুকিয়ে রাখে। পরে এগুলো ছাদে গিয়ে শামীমের কাছে হস্তান্তর করে। ওই সময় শামীমের সঙ্গে আরও দু’জন ছিল।


পিবিআইয়ের ডিআইজি বলেন, পরীক্ষার শুরুর কিছুক্ষণ আগে পরিকল্পনা অনুযায়ী চম্পা বা শম্পা রাফিকে খবর দেয় যে তার (রাফি) বান্ধবী নিশাদকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এ খবর শোনার পর রাফি ছাদে গেলে তাকে তার (রাফি) ওড়না দিয়ে বেঁধে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।


ঘটনার বিষয়ে মৃত্যুর আগে রাফি তার ভাইয়ের কাছে যে বর্ণনা দিয়েছে, হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের কাছেও একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় সে বারবার একটি শব্দ ব্যবহার করেছে। সেটি হল ‘ওস্তাদ’। আমরা ওই ওস্তাদকেও খুঁজছি। তিনি বলেন, ঘাতকদের ধারণা ছিল হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা তা সামাল দিতে পারবে। এর আগেও তারা একাধিক ঘটনা সামাল দিয়েছিল।


চুন হামলার কারণে রাফি একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সেটি তারা (হামলাকারীরা) সামলে নিয়েছে। শ্লীলতাহানির ঘটনাটিও তারা সামলে ফেলছিল। এসব কারণে তারা মনে করেছিল, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও তারা ‘ম্যানেজ’ করে ফেলবে।


সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, অগ্নিসংযোগের পরপরই ঘাতকরা সবার সামনে দিয়ে মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে পালিয়ে যায়।


গেট নিরাপদ রাখতে আগে থেকেই সেখানে পাহারা ও গেট স্বাভাবিক করার কাজে ছিল নুরুদ্দিন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গা-ঢাকা দেয়। বনজ কুমার মজুমদার আরও বলেন, আমরা এখন পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি তদন্ত করছি। এর আগে শ্লীলতাহানির অভিযোগে যে মামলাটি হয়েছিল, সেটিও তদন্ত করব। কারণ একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।


১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে রাফি। ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি।


পরিকল্পিতভাবে তাকে ছাদে নিয়ে বোরকা পরা ৪-৫ জন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ রাফিকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়।


সেখান থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে এবং পরে ওইদিন রাতে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।


এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতারদের মধ্যে ৯ জনকে ৫ দিন করে এবং অধ্যক্ষ সিরাজকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এছাড়া জাবেদ হোসেনের রিমান্ড শুনানি সোমবার অনুষ্ঠিত হবে। তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। অন্য দু’জনকে (শামীম এবং নুরুদ্দিন) শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতে হাজির করা হয়নি।


জেড

Print