ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’: নাম ও ইতিহাস

সাইফুল ইসলাম মাসুম, স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
০৪ মে, ২০১৯ ১৯:৫১:৫২
#

সাইক্লোন, টাইফুন, হারিকেন তিনটি আলাদা শব্দ হলেও  আসলে এগুলো অঞ্চলভেদে ঘূর্ণিঝড়েরই ভিন্ন ভিন্ন নাম। সবগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি একই প্রক্রিয়ায়। অঞ্চলভেদে এদের নামে পরিবর্তন আসে।  অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আদতে তেমন কোনও পার্থক্য নেই ফণীর। তবে আঞ্চলিক পার্থক্যের কারণে একে সাইক্লোন নামে ডাকা হচ্ছে। অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে এর পার্থক্য টানা হচ্ছে এর প্রচণ্ডতার কারণে। পাশাপাশি অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময়ের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট কোনও ঝড় হিসেবে ফণী ভারতের মাটিতে আঘাত হেনেছে বলে একে স্বতন্ত্র বিবেচনা করা হচ্ছে।


আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা তথা যুক্তরাষ্ট্রের আশেপাশে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ যখন ঘন্টায় ৭৪ মাইল এর বেশি হয়, তখন জনগণকে এর ভয়াবহতা বুঝাতে হারিকেন শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মায়াদেবতা হুরাকান- যাকে বলা হত ঝড়ের দেবতা, তার নাম থেকেই হারিকেন শব্দটি এসেছে। তেমনিভাবে, প্রশান্ত মহাসাগর এলাকা তথা চীন, জাপানের আশেপাশে হারিকেন- এর পরিবর্তে টাইফুন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তবে টর্নেডো কিছুটা আলাদা। এটাও বাতাসের ঘূর্ণি হলেও সেটাতে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তবে টর্নেডো শুধুমাত্র স্থলভাগেই ঘটে।  এদিকে ভারত মহাসাগরে উৎপন্ন ঝড়গুলোকে সাইক্লোন বলা হয়। হারিকেন ও সাইক্লোন জল ও স্থল দুইভাগেই আঘাত আনতে পারে।  ফণীও জল ও স্থলভাগে আঘাত হেনেছে।  সে হিসেবে ফণীকে সাইক্লোন বলা যেতে পারে। শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ কাইক্লোস থেকে, যার অর্থ বৃত্ত বা চাকা।


সপ্তাহখানে আগে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে সৃষ্টির পর থেকেই ফণীর ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা পরপরই দেওয়া হচ্ছে সতর্কবার্তা। নেওয়া হয়েছে ব্যপক প্রস্তুতি। ভারতের পূর্ব উপকূলে এরআগেও বেশ কয়েকবার বড় ঝড় আঘাত এনেছে।  তবে কোনটারই উৎপত্তিস্থল বঙ্গোপসাগর নয়। বঙ্গোপসাগরে পাঁচ থেকে ছয়টি ঘূর্ণিঝড় প্রতিবছরই সৃষ্টি হয়। তবে ১৮৯১ সাল বঙ্গোপসাগরে ১৪টি বড় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলেও ভারতের মাটিতে আঘাত এবার দ্বিতীয়। এরআগে ১৯৫৬ সালে বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন হওয়া একটি ঘূর্ণিঝড় ভারতের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছিল। সেখানে সৃষ্ট বাকি সবগুলো ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে আঘাত হানে। এবার দ্বিতীয়বারের মতো বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ফণী আছড়ে পড়েছে ভারতের ওড়িশায়। শুক্রবার ওড়িশার পুরিতে আঘাত হানার সময় এর গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার।


ফণীর আরেক স্বাতন্ত্র্য এর শক্তিমত্তায়। এপ্রিল-মে মাসে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সাধারণত দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে। ফণীর মতো শক্তিশালী হয় না। বাংলাদেশেও শুক্রবার মধ্যরাতে আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে ঝড়টির।  মোকাবিলায়  নেওয়া  হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।


ফণীর নামকরন ও ইতিহাস


ফনি নামটি এখন বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে। তবে অনেকেই জানেন না এর নামকরণটি কীভাবে হলো।


ফনি নামটি দিয়েছে বাংলাদেশ। এর অর্থ সাপ বা ফণা তুলতে পারে এমন প্রাণী। ইংরেজিতে (Fani) লেখা হলেও এর উচ্চারণ ‘ফণী'।


বিশ্ব আবহাওয়া অধিদফতরে ভারত মহাসাগরের পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড নামের তালিকা পাঠায়। সেখান থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর নাম বেছে নেয়া হয়। ভবিষ্যৎ ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য এ আটটি দেশ আটটি করে নাম জমা দিয়েছে। এখান থেকেই বাংলাদেশের দেয়া 'ফণী' (সাপের ফণা) নামটি বেছে নেয়া হয়েছে।


গত বছর ভারতের উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশে আঘাত হানা তিতলি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছিল পাকিস্তান। ২০১৭ সালের ঘূর্ণিঝড় মোরা (সাগরের নক্ষত্র বা সাগরের তারা) নামটি দিয়েছিল থাইল্যান্ড।


বাংলাদেশে আঘাত হানা ভয়ঙ্কর সব ঘূর্ণিঝড়


আবহাওয়ার ঘূর্ণিঝড় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে।


সমুদ্র উপকূলে অবস্থানের কারণে ঝড়-সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় পতিত হয় বাংলাদেশ।


বিভিন্ন সময়ে বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।


স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে বাংলাদেশে যেসব ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে, তার মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলে বয়ে যাওয়া ঝড়কে সর্বাধিক প্রলয়ঙ্ককরী হিসাবে বিবেচনা করা হয়।


জেনে নিই ইতিহাসের কয়েকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কথা।


১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়


বাংলাদেশের মধ্যে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়। ঝড়টি ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে সংঘটিত হয়।


পরিসংখ্যান বলছে, এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত হয়।


ঝড়টি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত করে। এই ঘূর্ণিঝড়ে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত করে। প্রায় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষ নিহতের পাশাপাশি প্রায় ১ কোটি মানুষ সর্বস্ব হারায়।


সর্বাধিক নিহত হয় সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতিয়া দ্বীপে। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বৃদ্ধ ও শিশু।


নিহতের সংখ্যা আরও কম হতে পারত। ধারণা করা হয়- প্রায় ২০ লাখ লোক আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে যার যার বাড়িতে অবস্থানের কারণে আক্রান্ত হয়। সে সময় প্রায় ১০ লক্ষ ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ১ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে।


বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়


পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে ষষ্ঠ স্থান দখল করে আছে বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়টির জন্য ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর দিনটি স্মরণীয়।


আনুমানিক ২ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এই ঘূর্ণিঝড়ে। দুর্যোগ পরবর্তী মহামারী এবং দুর্ভিক্ষে আরও বহু মানুষের মৃত্যু হয়।


ঝড়টি ‘দ্য গ্রেট বাকেরগঞ্জ ১৮৭৬’ নামেও পরিচিত। অক্টোবর মাসের শেষ দিনটি এ সময় মেঘনার মোহনা এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল ও নোয়াখালী উপকূলে তীব্র ঝড়ো জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন সংঘটিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে বাকেরগঞ্জের নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হয়ে যায়।


ভোলার ঘূর্ণিঝড়


১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে এ ঘূর্ণিঝড়। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে এটি সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকরতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি। এটি ছিল সিম্পসন স্কেলে ‘ক্যাটাগরি ৩’ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়।


এ ঝড়ের কারণে প্রায় ৫ লাখ ব্যক্তি প্রাণ হারায় বলে খবরে প্রকাশ হয়। ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারে গিয়ে পৌঁছায় এবং রাতে উপকূলে আঘাত হানে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা। ওই উপজেলার ১ লাখ ৬৭ হাজার অধিবাসীর মধ্যে ৭৭ হাজার জন প্রাণ হারায়।


ঘূর্ণিঝড় সিডর


ঘূর্ণিঝড় সিডর ও এর ভয়াবহতার কথা জানেন না এমন ব্যক্তি নেই একজনও।


২০০৭ সালের ১০ নভেম্বরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্টি হয়। বঙ্গোপসাগরের এটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে। ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশের পাথরঘাটায় বালেশ্বর নদীর কাছে উপকূল অতিক্রম করে ঝড়টি।


ঝড়টি ২২৩ কিলোমিটার বেগে ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে আসে। রেডক্রসের হিসাব অনুযায়ী সিডরে মারা গেছে ১০ হাজার মানুষ । তবে সরকারিভাবে এ সংখ্যা ৬ ছয় হাজার বলা হয়েছে।


এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঝড়ো হাওয়াসহ বিপুল পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। এক রিপোর্টে প্রকাশ- সিডরে সে সময় সুন্দরবনের বেশকিছু হরিণসহ আরও অনেক বন্য প্রাণির মারা যায়।


প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস এবং ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। এছাড়াও প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার গৃহপালিত পশু এবং হাঁস-মুরগি মারা যায়।


ঘূর্ণিঝড় আইলা


২০০৯ সালে উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেয়া ঘূর্ণিঝড়টির নাম আইলা। ঘূর্ণিঝড়টি ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ব্যাস নিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি ৭০-৯০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। সিডর থেকে আইলায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।


ঘূর্ণিঝড় মহাসেন


২০১৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশে উৎপত্তি মহাসেন নামের ঘূর্ণিঝড়টির। ১৪ মে এটি উত্তর-পূর্বাংশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ঝড়টি শ্রীলংকায় আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বন্যা হয়। এছাড়া ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশেও বেশকিছু প্রাণহানি ও ক্ষতিক্ষতি হয় মহাসেনের প্রভাবে।


ঝড়টির নাম প্রথমে মহাসেন দেয়া হলেও পরে নামটি নিয়ে বির্তক ওঠে শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদী এবং সরকারী কর্মকর্তাদের মাঝে। দেশটির তৃতীয় শতকের সিংহল রাজার নাম থেকে মহাসেন নামকরণ হয় বলে জানা গেছে।


পরে শ্রীলংকার সংবাদমাধ্যমে মহাসেন নামহীন ঝড় বলে বর্ণনা করা হয়।


ঘূর্ণিঝড় মোরা ২০১৭ সালের মে মাসের শেষের দিকে যে ঘুর্ণিঝড়টির উৎপত্তি তার নাম দেয়া হয় ‘মোরা’। আবহাওয়া অধিদফতর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজার উপকূলকে ১০ নম্বর মহা বিপৎসংকেত এবং মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৮ নম্বর সংকেত দেখাতে বলে। ৩০ মে ২০১৭ মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে ১৩৫ কিমি বেগে আঘাত হানে


ঘূর্ণিঝড় 'মোরা'।


'মোরা' একটি থাই শব্দ। এর ইংরেজি হচ্ছে- 'স্টার অব দ্য সি'। বাংলায় 'সাগরের তারা'।


এ ঘুর্ণিঝড়ে আক্রান্ত জেলাসমূহে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। কক্সবাজারে বিদ্যুৎব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জমির ফসল এবং লবন চাষীদের জমাকৃত লবন নষ্ট হয়ে যায়।


ঘূর্ণিঝড়টির কারণে শ্রীলঙ্কায় প্রবল বৃষ্টিপাতে বন্যা এবং ভূমিধ্বস দেখা দেয়। এর ফলে প্রায় ১৮০ জন লোক মারা যায় বলে আর্ন্তজাতিক প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়।


ভারতে ফণীর তাণ্ডব


ভারতে ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের সবাই দুর্গত ওড়িশা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের বাসিন্দা। ঝড়ের তাণ্ডবে পুরী এলাকায় এক কিশোরসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ভুবনেশ্বরে তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নয়াগড় মাথায় মৃত্যু বয়েছে এক নারীর। কেন্দ্রাপাড়ায় এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জি নিউজ।


নিহতদের মধ্যে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আশ্রয়শিবিরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ঝড়ের মধ্যে বাইরে যাওয়া এক ব্যক্তির ওপর গাছ পড়লে তিনিও নিহত হন।


১৯৯৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী। ঝড়ের তাণ্ডব থেকে নাগরিকদের সুরক্ষায় ইতোমধ্যেই প্রায় ১২ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।


ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক বলেছেন, ঝড়ে লণ্ডভণ্ড বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু করাই এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


ঝড়ের তাণ্ডবে প্রায় গোটা ওড়িশাজুড়েই ধ্বংসের ছবি। গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে বিশাল আকারের ক্রেন। রাস্তার মধ্যে লুটিয়ে পড়েছে বিএসএনএল টাওয়ার। ভুবনেশ্বর স্টেশনের ছাউনি উড়ে গেছে। গোটা স্টেশন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ট্রেন পরিষেবা। তথৈবচ অবস্থা ভূবনেশ্বরের বিজু পট্টনায়েক বিমানবন্দরের। সেখানকার প্রবেশপথের গেট ভেঙে গেছে।


ইতোমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির পর্যালোচনা শুরু করেছে ওড়িশার রাজ্য সরকার। তবে এটি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


বাংলাদেশ ও ভারতে ফণীর প্রস্তুতি


অবস্থান: পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসারে অবস্থানরত ঘুর্ণিঝড় ফণী অনুমিতভাবেই বুধবার ভারতের অন্ধ্র উপকূলের কাছাকাছি এসে সামান্য দিক বদলে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করেছে।


বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে ১২০৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্র বন্দর থেকে ১১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১০৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ১০৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।


শক্তি: ভারতের আবহাওয়া অফিস বলছে, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।


আঘাত হানবে কখন: বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে ঘণ্টায় মোটামুটি ৬ কিলোমিটার গতিতে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল ঘূর্ণিঝড় ফণী। ভারতীয় আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী শুক্রবার দুপুরের পর পুরীর কাছে গোপালপুর ও চাঁদবালির মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করতে পারে এ ঝড়।


আর বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিস বলছে, বর্তমান গতিপথ অব্যাহত থাকলে ভারতের ওড়িশায় আঘাত হানার পর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শনিবার সকালে বাংলাদেশে আসতে পারে ফণী। কিন্তু গতিপথ বদলে সমুদ্রের কোলঘেঁষে সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানলে এ ঝড় খুলনা, মোংলা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।


সংকেত: ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাগর বিক্ষুব্ধ থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ফণী আরও এগিয়ে এলে বৃহস্পতিবার দেশে বিপদ সংকেত জারি করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ।


আবহাওয়ার পূর্বাভাস: গত এক সপ্তাহ ধরে আশপাশের আকাশ থেকে মেঘ টেনে নেওয়া ফণী উপকূলে হাজির হবে প্রবল বৃষ্টি নিয়ে। তখন ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ উপকূলের নিচু এলাকা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।


বাংলাদেশে ১৯ জেলায় সতর্কতা


ঘূর্ণিঝড় ফণী ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানার পর বাংলাদেশে আসতে পারে ধরে নিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।


বুধবার বিকালে সচিবালয়ে ‘ফণী’ মোকাবেলায় জরুরি প্রস্তুতি সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।


ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি উপকূলীয় সেনা ক্যাম্পগুলোকে সতর্ক রাখা হয়েছে।


ইতোমধ্যে মাইকিং করে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। উপকূলীয় জেলার ডিসিদের দুইশ মেট্রিক টন চাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে; জেলা প্রশাসকদের পাঁচ লাখ করে টাকা দেওয়া আছে জরুরি সহায়তার জন্য।


এছাড়া ৪১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ওই ১৯ জেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি মনে করি আমরা ভালো প্রস্তুতি নিতে পেরেছি।”


ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি এবং অন্যান্য ছুটি বাতিল করে তাদেরকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সব শাখা বুধবার থেকে অব্যাহতভাবে খোলা রাখা হয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য।


সেই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অব্যাহতভাবে অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অল্প সময়ের নোটিসে তারা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে, সেজন্য প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।


এসএম

Print