কতদূর গড়ালো আলোচিত নুসরাত হত্যা

মো: মুস্তাঈন বিল্লাহ
টাইম নিউজ বিডি,
১৩ মে, ২০১৯ ১৭:৫৩:২৬
#

নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম (এইচএসসি) পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। গত ০৬ এপ্রিল (শনিবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নুসরাত আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে যান।এরপর কৌশলে তাকে পাশের একটি ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুর ধরিয়ে দেয়। ৮০ শতাংশ আগুনে পোড়া নিয়ে টানা পাঁচদিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ১০ এপ্রিল (বুধবার) রাত ৯টায় মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত।


রাফি সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মাওলানা এ.কে.এম মুসা মানিকের মেয়ে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে তৃতীয়।


আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরলো। আর এই হত্যার ঘটনায় এই পর্যন্ত ১৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।এর মধ্যে ১৬ জনই গ্রেফতার হয়েছে,১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। দায়িত্ব অবহেলা প্রমাণিত হওয়ায় এসপি ও ওসিসহ পুলিশের চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। 


গত শনিবার (১১ মে)পিবিআই’র উপ-মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার বলেছেন, “আমাদের মাঠের কাজ শেষ, মানে আলামত সংগ্রহ শেষ। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, মানে চারটি বোরকা,কেরোসিনের পাত্র ইত্যাদি আলামত জব্দ করেছি। এ পর্যন্ত পুরো ঘটনায় ১৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি, এর মধ্যে ১৬ জনই গ্রেফতার হয়েছে, ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।”


“এখন আমাদের দাপ্তরিক কিছু কাজ বাকী আছে। সেগুলো শেষ হলেই আমরা চার্জশিট দিতে পারব”যোগ করেন মজুমদার।  


নুসরাতের পরিবার জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এবং আসামিদের গ্রেফতারের অগ্রগতি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। নুসরাত জাহানের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানিয়েছেন, ঘটনার এক মাস পার হলেও এখনো ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি তার পরিবার।


“আমরা এ পর্যন্ত মামলার অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট। পুলিশ দ্রুত চার্জশিট দিতে চায়, এতে আমরা খুশি,কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যাতে প্রকৃত কোনো দোষী বা আসামির নাম বাদ পড়ে না যায়, সে জন্য সচেতন থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।”


এর আগে গত ২৭ মার্চ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ রাফিকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছে এমন অভিযোগে পুলিশের কাছে মামলা করে তার পরিবার। পরে পুলিশ ওই মামলার জেরে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে এবং আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠায়। এই ঘটনার পর পর মাদ্রাসায় ওই শিক্ষকের পক্ষে-বিপক্ষে শিক্ষার্থীরা আলাদাভাবে আন্দোলন করতে শুরু করে। পরিবারের অভিযোগ, এরপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে থাকে সিরাজউদ্দৌলার লোকজন। কিন্তু নুসরাত অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ঘটনার দিনও অপারগতা প্রকাশ করলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।


এসপি-ওসিসহ পুলিশের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমকে আজ (১২ মে) রোববার প্রত্যাহার করা হয়েছে। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যার ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা এই কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, এসপি জাহাঙ্গীরকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।


এর আগে একই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অভিযুক্ত এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইউসুফকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল আহাম্মদকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে।


পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ও এসআই ইকবাল হোসেন নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচারের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করেন। পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকার সকাল ১০টায় নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার খবর পেয়েও ঘটনাস্থলে যাননি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে রওনা দেন। পরে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির নির্দেশে মাঝপথ থেকে ফিরে আসেন।


দায় স্বীকার করে ১২ আসামির জবানবন্দি


আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮) কে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১২ জন আসামি আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহামেদ ও মো. জাকির হোসাইনের আদালতে আসামিদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।


জবানবন্দি দেয়া আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, তার সহযোগী নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের, জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল। এরা প্রত্যকেই নুসরাত হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।


মৃত্যুর আগে ভাইকে নুসরাত যা বলেন 


সর্বশেষ গত ০৮ এপ্রিল (সোমবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দেখা করতে গেলে ভাইয়ের কাছে বিভিন্ন আকুতি জানান দগ্ধ নুসরাত। এ সময় ওই ছাত্রীর মা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।


নুসরাত বলেন, “যারা আমার গায়ে আগুন দিয়েছে, তাদের অনেক পরিচিত মনে হয়েছে। তবে আমি তাদের মুখটা মনে করতে পারছি না। আমাকে একটু চিন্তা করতে দেন ভাই। আমি চিন্তা করে সব বলমু।” নুসরাত আরো বলেন, “ভাই, আমি এখানে চিকিৎসায় বাঁচবো না। তোরা যেভাবে পারিস প্রয়োজনে আমাকে বাইরে নিয়ে যা।”


ওই মাদ্রাসাছাত্রী বলেন, “ভাই, আমার যা কিছু হয়ে যাক, আমার যত কিছু হয়ে যাক। অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও তার সহযোগী সবাই যারা আমার গায়ে আগুন দিয়েছে তাদের যেন যথাযথ শাস্তি হয়।”


মাদ্রাসা কমিটির সভাপতির সহযোগিতা পায়নি নুসরাতের পরিবার


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি তদন্ত কমিটিতে জবানবন্দি দিয়েছেন তার মা শিরিন আখতার। গত ১৮ এপ্রিল (২০১৯) পুলিশ সদর দপ্তরে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে নুসরাতের মা শিরিন আখতারের দেওয়া জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।


নুসরাতের মা ওই জবানবন্দিতে জানান, গত ৪ এপ্রিল নুসরাত হত্যা চেষ্টার ২দিন আগে বেলা ১১টার দিকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদৌল্লাহ বিরুদ্ধে বিচার চাইতে একছেলে ও নুসরাতকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি ও ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি কে এম এনামুল করিমের কার্যালয়ে যান তিনি।


এসময় এনামুল করিম তাদের কথা শুনতে চাননি। বরং এক পর্যায়ে এনামুল করিম নুসরাতের উদ্দেশ্যে বলেন, “প্রিন্সিপাল খারাপ তো সবাই জানে, তুমি তার কাছে গেছ কেন? যখন গেছ, হজম করতে পারলে না কেন?”


নুসরাতের মা আরো বলেন, “ওই সময় মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি পি কে এনামুল করিমকে নুসরাত বলেছিলো, “স্যার আপনি আমার বাবার মতো। আপনি আমার কথাগুলো শোনেন।” এর জবাবে (পি কে এনামুল করিম) তিনি বলেন, “এখন কেন এসেছেন? আপনারা তো মামলা করে ফেলেছেন। মামলা করার আগে আসতেন, তাহলে দেখতাম কী করা যায়। এখন মামলায় যা হবে,তাই।”


মাদ্রাসা সভাপতি তাদেরকে আরও বলেন, “আপনারা যে মামলা করেছেন, তা প্রমাণ করতে না পারলে আপনাদের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষ ও তার লোকজন ৫০ লাখ টাকার মানহানির মামলা করবেন।”  


এই প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা পি কে এনামুল করিম বলেন, “নুসরাত ও তার পরিবার দু:খ পায় এমন কোন কথা আমি বলিনি।”


যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা


যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে গত ৪ এপ্রিল (২০১৯) কারাগারে দেখা করে ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিনসহ তাদের অন্য সহযোগীরা।


সেখানে তারা অধ্যক্ষকে বলে, “ওস্তাদ, কিছু একটা করা দরকার। আপনার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা দিয়ে আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে। মাদ্রাসার সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।”  তখন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা তার অনুগত শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দিলেন, “করো। তোমরা কিছু একটা করো।”


নুসরাত জাহান রাফি অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলার অনুসন্ধানে নেমে এইসব তথ্য জেনেছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার।


ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, কারাগারে সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করে ৫ এপ্রিল পরিকল্পনায় বসে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন। পরিকল্পনার শুরুতেই রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য দু’টি কারণ তারা সামনে নিয়ে আসে। একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করে আলেম সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা। অন্যটি হচ্ছে শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে সেটাও বলে সে। এরপর তারা রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। সেটা বাস্তবায়নের জন্য দুই মেয়েসহ আরও ৫ জনকে বিষয়টি অবহিত করে তারা। তারা প্রত্যেকেই ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ওই ৫ জনের মধ্যে ছিল দু’জন মেয়ে।


বাস্তবায়ন যেভাবে


ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, দু’টি মেয়ের মধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ৩টি বোরকা ও কেরোসিন জোগাড় করে নিয়ে আসার জন্য। ওই মেয়েটি ৩টি বোরকা ও পলিথিনে করে কেরোসিন নিয়ে এসে শামীমের কাছে হস্তান্তর করে। মাদ্রাসাটি একটি সাইক্লোন সেন্টারে। সেখানে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। ক্লাস শেষে কেরোসিন ও বোরকা নিয়ে তারা ছাদে চলে যায়। ছাদে দু’টি টয়লেটও ছিল। আলিম পরীক্ষা থাকায় সেই টয়লেটে তারা লুকিয়ে থাকে। পরে পাবলিক পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চম্পা কিংবা শম্পা নামের একটি মেয়ে রাফিকে বলে, ছাদে কারা যেন তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করছে। তখন রাফি দৌড়ে ছাদে যায়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা শামীমসহ বোরকা পরা ৪ জন রাফিকে ঘিরে ফেলে এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেবে কিনা জানতে চায়। রাফি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তারই ওড়না দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলে। এসময় বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহ করা মেয়েটিও সেখানে ছিল। হাত বেঁধে রাফির শরীরে আগুন লাগিয়ে তারা দ্রুত নিচে নেমে অন্যদের সঙ্গে মিশে যায়।


তিনি জানান, ছাদ থেকে চিৎকার করলেও বাইরে থেকে সে আওয়াজ শোনা যায়নি। কারণ, অনেকটা ফাঁকা জায়গায় সাইক্লোন সেন্টারটি।


ডিআইজি বনজ কুমার আরও জানান, ঘটনার সময় মাদ্রাসার বাইরের গেটে নুর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ ৫ জন বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। আরও একজনের নাম পাওয়া যায়, যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ঘটনা ঘটিয়ে শামীমরা বাইরের লোকদের মধ্যে মিশে যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে সবাই গা ঢাকা দেয়।


গত ১৩ এপ্রিল (২০১৯) রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এইসব তথ্য প্রকাশ করেন ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।


ছাত্রলীগ নেতার প্রেম প্রত্যাখানের খেসারত


অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে হেয় ও সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)’কে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। 


গত ১৩ এপ্রিল (২০১৯) ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান পিবিআই প্রধান বনোজ কুমার মজুমদার। 


তিনি জানান, নুসরাত জাহান রাফিকে পরিকল্পনা করে আগুন দিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে আসামি নূর উদ্দিন। তবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির পক্ষে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে নূরউদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীমসহ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয় ৪ এপ্রিল। স্মারকলিপি দিয়ে ওই দিনই কারাগারে সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে দেখা করে। সেখানে গিয়ে রাফিকে হত্যার নির্দেশ নিয়ে আসে।


পিবিআই’র ডিআইজি আরো বলেন, মূলত তারা দু’টি কারণে পুড়িয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়


প্রথমত,মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ আলেম সমাজকে হেয় করেছে নুসরাত। দ্বিতীয়ত, শাহাদাত দফায় দফায় প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে রাফিকে। কিন্তু রাফি শামীমের সেই প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে। এই কারণে রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রথম প্রস্তাবটি দেয় শামীম।’ যোগ করেন পিবিআই প্রধান।


পুলিশ-সাংবাদিক পাল্টাপাল্টি জিডি


বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ-সাংবাদিক পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।


গত ০২ মে (বৃহস্পতিবার) দুপুরে পুলিশি, হয়রানি ও নিরাপত্তা চেয়ে ফেনী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক মো. আতিয়ার হাওলাদার সজল।  


এর আগে ১৪ এপ্রিল সজলের বিরুদ্ধে সোনাগাজী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ওই থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।


সাধারণ ডায়েরিতে সাংবাদিক সজল উল্লেখ করেন, ১৪ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে ওই থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।গত ২৭ মার্চ শ্লীলতাহানির মামলায় সোনাগাজী মডেল থানায় নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করা দুটি ভিডিও ৮ এপ্রিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য অন্য কেউ তার অজ্ঞাতসারে মোবাইল ফোনে স্থানান্তর করেন। প্রকৃত সত্য হলো, ৬ এপ্রিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে নুসরাতকে অগ্নিদগ্ধ করার পর সোনাগাজী মডেল থানায় আমিসহ (সজল) গণমাধ্যমকর্মীরা একাধিকবার যান। ৮ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য নিতে চাইলে নুসরাতের আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ে আগ বাড়িয়ে পূর্বের ধারণ করা দুটি ভিডিও দেখান। পরে ওই ভিডিও টেলিভিশনে দেখানোর অনুমতি নিয়ে ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১ মধ্যে ওসি মোয়াজ্জেমের কাছ থেকে ভিডিও সংগ্রহ করি।


সেদিন রাত ৯টায় নুসরাতের চেহারা ঝাপসা করে ভিডিও দুটি সময় টেলিভিশনে প্রচারও করে। ওই ভিডিও আমি কাউকে সরবরাহ করিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করিনি। আর অজ্ঞাতসারে ভিডিও নেয়ার বিষয়টিও সত্য নয়।


অন্যদিকে,গত ১৪ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় নিজের মোবাইল থেকে দুটি ভিডিও অজ্ঞাতসারে স্থানান্তরের অভিযোগ করেছেন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

Print