হতাশাকে জয় করতে হবে

শাহনাজ পারভীন শাহীন
টাইম নিউজ বিডি,
১৫ মে, ২০১৯ ১৫:৫৭:৪১
#

হতাশা সবসময়ই নেতিবাচক ফল বয়ে আনে। বস্তুত হতাশার আরেক নাম সর্বনাশ। তাই হতাশাকে জয় করেই আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ, এটি এমন এক ধরনের মানসিক ব্যাধী যা মানুষের সৃজনী, ব্যক্তিত্ব ও জীবনী শক্তিকে অন্তঃসারশূণ্য করে দেয়। বস্তুত ব্যক্তি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারার কারণে যে মানসিক অবসাদ ও বিষন্নতা সৃষ্টি হয় সেটিই হতাশা। এটি জীবনের যে কোন সময় যে কোন পরিস্থিতি থেকে উদ্ভব হতে পারে। মানুষের মাত্রারিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত চাহিদা, আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষ থেকেই হতাশা নামক ব্যাধীর উৎপত্তি।


অনেক সময় না পাওয়ার ব্যথা, আবার ক্ষেত্র বিশেষে পেয়ে হারানোর ব্যথা থেকে হতাশা, অবসাদ ও বিষন্নতা সৃষ্টি হতে পারে। মানুষের চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে সমন্বয়হীনতা থেকেই হতাশার একটি অন্যতম কারণ। অনেক সময় বড় ধরনের বৈষয়িক ক্ষয়ক্ষতি, অনাকাঙ্খিত প্রাণহানী ও সম্পদহানী থেকেও হতাশা সৃষ্টি হতে হয়। আর হতাশা সব সময় নেতিবাচক। তাই যেকোন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে আগামী দিনের জন্য যুৎসই কর্মপন্থা নির্ধারণই পারে সকল প্রকার হতাশা ও বিষন্নতার মত নেতিবাচকতা থেকে পরিত্রাণ দিতে।


যখন কোন মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয় তখন সে আর স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন থাকে না। স্বস্তিবোধও করে না কোন কিছুতেই। মাত্রাতিরিক্ত অবসাদের কারণে বাড়তি চাপ বা ঝামেলা নেয়া কোন ভাবেই সহ্য করতে পারে না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। একাকিত্বকেই সে অধিক পছন্দ করে এবং স্বাভাবিক জীবনাচারণে হয়ে পড়ে অনাকাঙ্খিতভাবে উদাসীন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও নিকটজন থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। তার সব কাজই হয়ে পড়ে একেবারে দায়সারা গোছের। সবকিছুকেই তুচ্ছতাচ্ছিল এবং অতিরিক্ত বিরক্তি প্রকাশ পায়। মনে হয় এই বর্ণিল পৃথিবীটা তার কাছে রীতিমত ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।


একাকিত্ব, ঔদাসীন্য ও বিষন্নতা তার মনের জমাট বাধানো কষ্টটা আরও বাড়িয়ে দেয়। আর্তনাদ করাও তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক সময় সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না বরং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হাউমাউ করে কেঁদে অন্তরের মর্মজ্বালাটা লঘু বা হালকা করার চেষ্টা করে। এভাবে জীবনটাই তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকাটা তার কাছে অস্বস্তিকর ও অনর্থক মনে হয়। সমাজ, পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতা তার মনে হয় অনাকাঙ্খিত ও অস্বাভাবিক। কর্মোদ্দীপনাও হারিয়ে ফেলে পুরোপুরি।


বস্তুত, জীবনের বাড়তি বা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ বা জীবনকে সুখী, সমৃদ্ধ ও সাবলীল করতে গিয়ে যদি এভাবে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা হয় তাহলে তো জীবনের আর কোন স্বার্থকতা ও থাকে না। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, মানুষের সাধ অনেক কিন্তু সাধ্য খুবই সীমিত। তাই ব্যক্তি যদি সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সুসমন্বয় করে দিতে পারে তাহলেই হতাশা ও অবসাদের উপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব। মানুষ মাত্রই স্বপ্নবিলাসী। এতে দোষেরও কিছু নেই। কারণ, স্বপ্নাচারীর স্বপ্নই একদিক বাস্তব রূপ নিয়ে তা মহীরূহে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যে স্বপ্নই দেখে না তার প্রাপ্তির খাতাটাও শূণ্য থাকবে-এটাই তো স্বাভাবিক।


তবে একথাও মনে রাখতে হবে যে, মানুষের সব স্বপ্নই পূরুণ হয় না বরং অনেক স্বপ্নই অপূরণীয় থেকে যায়। আর এই অলঙ্ঘনীয় সত্য ও রূঢ় বাস্তবতাকে যে মেনে নিতে পারে তার অভিধানে হতাশা, বিষন্নতা ও অবসাদ বলে কিছু থাকার কথা নয়।


ইসলাম হতাশা ও অবসাদকে সব সময়ই নিরুৎসাহিত করেছে। একজন মুমিনের পক্ষে কোন ভাবেই হতাশাগ্রস্থ হওয়ার সুযোগ নেই বরং সৃষ্ট যেকোন পরিস্থিতি তাকে দৃঢ়পদ থাকতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমরা হতাশ হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও’। (সূরা আল ইমরান, আয়াত-১৩৯) মূলত যেকোন সম্যাসঙ্কুল পরিস্থিতি ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে মোকাবেলায় করার নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। চাই তা ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, পারিপার্শ্বিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়েই হোক। কারণ, মুমিনের কোন কাজই আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।


একথাও ঠিক যে, জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার পরিধিটা বেড়ে যাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তাই মানুষের জীবন চলার পথে ও কর্মে সাফল্য-ব্যর্থতা আশাটাও অস্বাভাবিক নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের ভুলও হতে পারে। আর একটা ভুল সিদ্ধান্ত জীবনের উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু প্রভাবটাকে কোন ভাবেই স্থায়ী মনে করার কোন সুযোগ নেই। প্রভাবটা সফলতার না হয়ে যদি ব্যর্থ হয়েই যায় তবুও সর্বাবস্থায় কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করায় মুমিনের কাজ।


কারণ, এর মধ্যেও কোন বৃহত্তর কল্যাণ নিহীত থাকতে পারে। আর জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা রাখতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই একটা মানসিক প্রশান্তি আসে। আর তা মেনে নেয়ার মধ্যেই রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি।
আমরা আমাদের প্রিয়জনদের দীর্ঘজীবন, সফলতা, শান্তি ও কল্যাণ এমনকি যেকোন ধরনের বিপদ আপদ থেকে মুক্তির জন্য আমার আল্লাহ তায়ালার দরবারে যেমন কান্নাকাটি করি, পানাহ চাই ঠিক তেমনি বিয়োগ-শোক সহ্য যখন করতে পারিনা তখন অন্তরের আকুতিগুলো সেই পরম করুণাময়ের কাছেই জানানো উচিত। কারণ, সেই মহান স্বত্ত¡ায় সকল বিষয়েই সর্বশক্তিমান। যিনি ইচ্ছা করলেই মানুষের সকল সমস্যার সমাধান করে দিতে পারেন। আর মানুষের বিপদ আপদ আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের পরীক্ষার জন্য। আল্লাহ তালায়া পবিত্র কালামে পাকে বলেছেন, ‘ এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, জীবন ও সম্পদের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করবো। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের’। (সুরা আল বাকারাহ, আয়াত-১৫৫) তাই সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করায় মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য।


বিসন্নতায় মনোবল হারিয়ে ফেলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে শয়তানের জয় হয়। তাই যেকোন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে সর্বান্তকরণে মেনে নিয়ে নিজেদের ভুলগুলো চিহ্নিত করে আগামী দিনের করণীয় নির্ধারণই ঈমানদার ও বুদ্ধিমানের কাজ। ভুলই ব্যর্থতা, হতাশা, বিষন্নতাকে পেয়ে বসে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে যে ভুলের জন্য অনুশোচনা করে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আগামী দিনের জন্য হতে দৃঢ়সংকল্প। যে এই কাজটা করতে পারে সেই জীবন যুদ্ধের মহাসৈনিক।


বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে সবচেয়ে বেশি বিষন্নতায় ভোগে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। তবে নর-নারী অথবা যেকোন মানুষই হতাশায়, বিষন্নতায় আক্রান্ত হতে পারে। ইদানিংকালে সবচেয়ে যেটা বেশি হচ্ছে তা হলো কথিত ভালবাসার নামে অবক্ষয়ের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া। ভালবাসা ও পরস্পর সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু কথিত ভালবাসার নামে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া কোন ভাবেই ভালবাসার অংশ নয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসবের জোরালো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ভালবাসার নামে পূর্বপরিকল্পিত প্রতারণা এখন সামাজিক ব্যাধীতে পরিণত হয়েছে। যা সামাজিক অবক্ষয়কে উস্কে দিচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে অবসাদ ও বিসন্নতা সৃষ্টি হচ্ছে।


হতাশা, অবসাদ ও বিসন্নতা আসতে পারে মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপে, অভাব-অভিযোগ, কর্মহীনতা বা উপযুক্ত ও মনমত সঙ্গি না পাওয়ার বেদনা থেকেও। সামাজিক চাপ বা হিংসুকদের নিকৃষ্ট আচরণ, সামাজিক বিভ্রান্তি থেকেও তা সৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন অবস্থায় মনভাঙ্গা ও হতোদ্দম হওয়ার সুযোগ নেই বরং সবকিছু অতিক্রম করেই সামনের দিকে এগিয়ে চলতে হবে। তাহলেই সাফল্য এসে একদিন হাতে ধরা দেবে।


নিজেকে সবসময় ছন্দময় ও আনন্দময় রাখতে হবে। যারা কটাক্ষপূর্ণ আচরণে অভ্যস্ত ও পরশ্রীকাতর তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে চলতে হবে সব সময়। যারা আপনাকে খুব ভালোবাসে বা বুঝতে চেষ্টা করে তাদের সাথে সম্পর্ক আরও নিবির করতে হবে। নিয়োমিত পাঠ অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সৃজনশীল সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। হতাশাকে কেন্দ্র করে কোন বদঅভ্যাস যেমন মাদকাশক্ত বা চরিত্রমাধুর্য নষ্ট করার কোন সুযোগ নেই। তাই এই সর্বনাশা প্রবণতা থেকে বাঁচতে হলে বেশি বেশি কুরআন-হাদিস ও ইসলামী ভাবধারার গ্রন্থাদি অধ্যয়নের কোন বিকল্প নেই। ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও তার অনুশীলনই পারে আপনাকে হতাশা ও যাবতীয় অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে। হতাশা অজেয় নয় বরং দুর্দমনীয় প্রাণশক্তিই পারে হতাশার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে। তাই হতাশাকে ভয় নয় বরং জয় করেই সামনের দিকে এগুতে হবে।



শাহনাজ পারভীন শাহীন
অধ্যাপিকা, কবি ও প্রাবন্ধিক


 

Print