ঘুষকাণ্ডে সাসপেন্ড বাছির

স্টাফ রিপোর্টার
টাইম নিউজ বিডি,
১১ জুন, ২০১৯ ১৭:২৮:৫০
#

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যে গতকাল সোমবার তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জন-বিষয়ক অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ অনুবিভাগের এই পরিচালককে। গতকাল সোমবার বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ প্রধান কার্যালয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এসব তথ্য জানান।


খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ডিআইজি মিজান ইতিপূর্বে অভিযোগ করেন, তাকে দায়মুক্তি দিতে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন দুদক পরিচালক। তার অভিযোগের পক্ষে অডিও ক্লিপও তুলে ধরেন তিনি। তবে দুদক চেয়ারম্যান জানান, মিজানুর রহমানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে নয়, তদন্ত চলাকালে তদন্তাধীন তথ্য অবৈধভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাচার, কমিশনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অসদাচরণের কারণে এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।


এদিকে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, দুদক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। এতে করে দুদকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় ফাটল ধরবে। আর দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, ঘুষগ্রহণের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত যথার্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ছাড়া দুদকের সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মতে, দুদক কর্মকর্তার ঘুষগ্রহণ এবং ডিআইজির ঘুষ প্রদানের ঘটনা যদি সত্যি হয়, তবে দুটোই অপরাধ। এ জন্য প্রমাণসাপেক্ষে দুজনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি অপরাধে মামলা হওয়া উচিত।


অন্যদিকে এ কাণ্ডে দুদক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান গতকাল বলেন, এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ-সেটি অসদাচরণের। এতে দুদক বিব্রত নয়। ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের নয়। তিনি বলেন, কমিশনে ৮৭৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নিয়েছি। তাই আমি মনে করি, জনগণের আস্থার সংকট বলে এখানে কিছু নেই। এনামুল বাছিরের সঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমানের কথোপকথনের বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রকাশিত অডিও রেকর্ডটির ফরেনসিক পরীক্ষা করতে হবে বলে জানান ইকবাল মাহমুদ। বলেন, মিজানুর ঘুষ দিয়েছেন প্রমাণিত হলে দুদক মামলা করবে।


তদন্তের স্বার্থে ডিআইজি মিজানের দুর্নীতি তদন্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, তদন্ত কমিটির কাছে এনামুল বলেছেন, তিনি ঘুষ নেননি। এর পরও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করা হবে।


জানা গেছে, গত বছর নারী নির্যাতনের অভিযোগে তৎকালীন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয় ডিআইজি মিজানুর রহমানকে। এর পর তার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুদক। সর্বশেষ এর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ছিলেন এনামুল বাছির।


এদিকে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ থাকা সত্ত্বেও তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ (ঘুষের ৪০ লাখ টাকা) পেয়েছেন কোথায়, তার উৎস সন্ধানে নতুন একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।


এ ঘুষকাণ্ড প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দুদকের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। দুদককে পুরোপুরিই দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। যারা দুর্নীতির দায়ে অন্যদের অভিযুক্ত করে মামলা করবে, তদন্ত করবে, তাদের মধ্যেই যদি দুর্নীতি ঢুকে যায়-তা হলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স দেখতে চাই।


এ কাণ্ডের পর দুদকের প্রতি মানুষের যে আস্থাশীলতা, তাতে কিছুটা হলেও শৈথিল্য আসবে বলে মনে করেন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনে যারা আছেন, তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে জনগণের প্রত্যাশা নষ্ট হয়ে যাবে; দুদকের প্রতি আস্থায় ফাটল ধরবে-এটাই স্বাভাবিক।


দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মনে করেন, ঘুষগ্রহণের যে অভিযোগ উঠেছে দুদকের পরিচালকের বিরুদ্ধে, সেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত যথার্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, দ্রুত এ অভিযোগের তদন্ত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততার মূল্যায়ন থাকা উচিত।
সব মানুষের নৈতিক পরিচয় এক নয় বলে মনে করেন দুদকের সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু। দুদকের পরিচালকের ঘুষকাণ্ডে কর্তৃপক্ষ যে অ্যাকশন নিয়েছে, তা সঠিক বলে মনে করেন তিনি।


পাশাপাশি এও বলেন, এক কর্মকর্তার অপকর্মের জন্য দুদকের সবাই এর দায়ভার নেবে না সেটাই স্বাভাবিক। আগেও দুদক এসব ক্ষেত্রে দায়ভার নেয়নি। তবে এগুলো যে দুদকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এর প্রমাণ, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া। এটি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, দুদক কর্মকর্তার ঘুষগ্রহণ এবং ডিআইজির ঘুষ প্রদান দুটোই অপরাধ। এ জন্য প্রমাণসাপেক্ষ দুজনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি অপরাধে মামলা হওয়া উচিত।

Print