রুমিনের বক্তব্যে ফের উত্তপ্ত সংসদ

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
১৭ জুন, ২০১৯ ১৪:৩৯:৫৫
#

জাতীয় সংসদে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আবারও সংসদ উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।


বাজেটের ওপর আলোচনায় রুমিন বর্তমান সরকারের বৈধতা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় সংসদে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াও রুমিনকে বারবার থামিয়ে দিয়ে অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। একপর্যায় ডেপুটি স্পিকার তাকে বক্তব্য না দিয়ে বসে পড়তেও বলেন। তবে বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী তিনি বক্তব্য শেষ করেন। তার বক্তব্য শেষ হলে ডেপুটি স্পিকার ‘অসংসদীয় শব্দ ও বাক্যগুলো’ সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করেন।


স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে রবিবার (১৬ জুন) সংসদে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু হয়। সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ফারুক খান, জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম, আওয়ামী লীগের আবদুস শহীদ, বিএনপির হারুনুর রশীদ, জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান, রুস্তম আলী ফরাজীর পরে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।


বলা হয়েছিল আমরা কথা বলতে পারবো


সংসদে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া সম্পূরক বাজেটের ওপর বক্তব্য দেওয়ার জন্য রুমিন ফারহানাকে ফ্লোর দেন। তার বক্তব্য একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই সংসদে আসার সময় আমাদের বলা হয়েছিল আমরা আমাদের কথা বলতে পারবো, সংসদ সদস্যরা কথা ধৈর্য সহকারে শুনবেন। সংসদ নেতা এটা বলেছিলেন। কিন্তু আমার প্রথম দিনের বক্তব্যের সময় এক মিনিটও শান্তিতে কথা বলতে পারিনি। একই ঘটনা আজকেও ঘটছে। যদি তাই হয় তাহলে কোন গণতন্ত্রের কথা আমরা বলছি, কোন বাকস্বাধীনতার কথা বলছি। কোন সংসদের কথা বলি- এভাবে একটি সংসদ চলতে পারে না। আমি আমার দলের কথা বলবো, তারা তাদের দলের কথা বলবেন। কিন্তু আমি উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো সংসদ যদি উত্তেজিত হয়ে যায়। ৩০০ সদস্য যদি মারমুখী হয়ে যান তাহলে কী করে বক্তব্য রাখবো?’


এ সময় ডেপুটি স্পিকার রুমিনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি এমন কোনও কথা বলবেন না যাতে অপর পক্ষ উত্তেজিত হবে এবং সংসদ পরিচালনায় ব্যত্যয় ঘটবে। আমি চাই সংসদ প্রাণবন্ত হোক। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির বাইরে কোনও কথা বলবেন না। আপনি এমন কোনও কথা বলবেন না যা একপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করতে হয়।’ একপর্যায় তাকে বসতেও বলা হয়। তবে তার মাইক বন্ধ করা হয়নি।


সরকারের সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে


রুমিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘সরকারের সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ার কথা কিন্তু আমরা দেখছি সরকারের সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। বাজেটের মাত্র ৭৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়। লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব কখনও আদায় হয় না।’


তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কীভাবে নির্বাচন করেছে তা একাদশ জাতীয় সংসদ থেকে প্রত্যেকটি নির্বাচনে দেখা হয়েছে। এখানে যারা আছেন তারা আল্লাহকে হাজির-নাজির করে বলুন, নির্বাচন কীভাবে হয়েছে? তারা ক’জন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন? কীভাবে এই সংসদে এসেছেন সেই প্রশ্ন বিবেকের কাছে করুন। আমাদের কথা বলতে দেওয়া হবে বলে এই সংসদ নির্বাচিত নয় জেনেও এসেছি। ভেবেছিলাম সংসদে একটি জায়গা পাবো যেখানে দেশের কথা, জনগণের কথা বলতে পারবো। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, এই তিনশ’ আসন- যেটা লুট করে নেওয়া হয়েছে। তাদের এতটুকু ধৈর্য নেই, আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের কথা শুনবেন।’


রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দেশে আইন আছে, আদালত আছে। কিন্তু আইনের শাসন নেই। গত এক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছে ৪৫০টি। এমন জঘন্য ঘটনা কোনও দেশে চলতে পারে না। এক দশকে গুম হয়েছে ৬৫০ জনের মতো। এই গুম হওয়া পরিবারের মানুষ এখন একটি লাশ চায় যেন তাদের জন্য দোয়া করতে পারে।’


তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ধর্ষণের রঙ্গমঞ্চ। এই সংসদে এতগুলো নারী সদস্য আছেন কেউ ধর্ষণ নিয়ে কথা বলেন না। ২০১৯ সালের প্রথম সাড়ে চার মাসে ৩৪৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এক বছরের শিশু থেকে শুরু করে একশ’ বছরের বৃদ্ধাও ধর্ষণের শিকার। সারা পৃথিবীতে এই নজির নেই। ধর্ষণের শিকার হয় কিন্তু তার বিচার হয় না। যারা সরকারের সঙ্গে জড়িত বা সরকারের সুবিধাভোগী তারাই এই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত।’


রুমিন ফারহানা বলেন, ‘অর্থনৈতিক খাত এখন হুমকির মুখে। একেকটা ব্যাংক তুলে দেওয়া হয়েছে একেকটি পরিবারের হাতে। ২২ হাজার টাকার মন্দঋণ এখন এক লাখ ১০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত দশ বছরে বিদেশে পাচার হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। এই টাকায় মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, কানাডায় বেগম পাড়া তৈরি হয়। পানামা পেপারে নাম আসে কিন্তু বিচার হয় না। এ দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লোপাট হয় কিন্তু তারও বিচার হয় না। তদন্ত হয় না। কয়লা গায়েব হয়, তার বিচার নেই। একটু জবাবদিহিতার সরকার যদি থাকতো, বিরোধী দলের কথা বলার ধৈর্য যদি থাকতো তাহলে দেশের অবস্থা এই রকম হয় না।’ তিনি বলেন, ‘এই সংসদে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি- প্রত্যেকে বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেন, আপনারা কী প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত? আপনারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হননি।’


জেড

Print