বলিউডে ‘ইমান নষ্ট' সিক্রেট সুপারস্টারের

বিনোদন ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০২ জুলাই, ২০১৯ ১৫:০৯:৫৪
#

জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন হয়৷ উন্নততর জীবনের লক্ষ্যে ক্যারিয়ার পরিবর্তনও অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ কিন্তু সেটা যদি হয় ধর্মের কারণে এবং সে ব্যক্তিটি যদি হন তুমুল জনপ্রিয় বলিউড তারকা, তাহলে তা জন্ম দিতে পারে নানা ধরনের বিতর্কের৷


দঙ্গল ও সিক্রেট সুপারস্টার অভিনেত্রী জায়রা ওয়াসিম খানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা৷


রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে বলিউড তো বটেই, অভিনয়ই ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই ১৮ বছর বয়সি অভিনেত্রী৷ নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা এক দীর্ঘ বিবৃতিতে এ কথা জানান জায়রা৷ কারণ হিসেবে দেখান, ‘নিজের পরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ার' কথা৷


বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘পাঁচ বছর আগে আমি এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যা আমার জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল৷ আমি বলিউডে পা রাখি, যা আমাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়৷ জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে শুরু করি আমি৷ আমাকে তুলে ধরা হয় সাফল্যের প্রতীক হিসেবে৷ তরুণদের রোল মডেল হিসেবেও বিবেচিত হয়েছিলাম৷ কিন্তু এর কোনোটিই আমি করতে বা হতে চাইনি৷ সাফল্য ও ব্যর্থতার ধারণা আমি বুঝতে শুরু করেছি৷''


চলচ্চিত্রে অভিনয় ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মনের মধ্যে এক লড়াই চলছিল বলে জানান জায়রা৷ তিনি বলেন, ‘‘আজ পাঁচ বছর পর স্বীকার করতে চাই আমি আমার পরিচয় ও কাজের ধরণ নিয়ে সত্যিকার অর্থে সুখী নই৷ একটি নতুন জীবনে আমি আমার সময়, প্রচেষ্টা ও অনুভূতি দিয়ে যাচ্ছি৷ কিন্তু খুব সহজেই এখানকার একজন হতে পারলেও আমার মনে হচ্ছে আসলে আমি এখানকার কেউ নই৷''


জায়রা বলেন, ‘‘এই জীবন আমাকে অনেক ভালোবাসা, সমর্থন ও স্বীকৃতি এনে দিলেও আমাকে তা ইমানের পথ থেকে অজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো৷ এমন এক পরিবেশ আমাকে কাজ করতে হচ্ছিলো যা আমাকে আমার ইমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তাই ধর্মের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়েছিল৷''


দীর্ঘ বিবৃতিতে এরপর কোরান থেকে নানা আয়াত উদ্ধৃত করেছেন জায়রা৷


অভিনয়জীবনে সুবিধা করতে না পেরে ক্যারিয়ার পরিবর্তনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটে থাকে৷ এমনকি ধর্মকর্মে মনোযোগী হয়ে ওঠাও নানা ধর্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যেই দেখা যায়৷ কিন্তু এভাবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে পুরো একটি ইন্ডাস্ট্রিকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার ঘটনা বলিউডে খুবই বিরল৷


দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যের শেষে সবাইকে উপদেশও দিয়েছেন এ অভিনেত্রী৷ তিনি বলেছেন, ‘‘সাফল্য, খ্যাতি, সম্পদ যে পর্যায়ে পৌঁছেই যাক না কেন, তা কখনো ইমান ও শান্তির বিকল্প হতে পারে না৷''


প্রতিক্রিয়া


ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন দিয়ে অনেকে দাঁড়িয়েছেন জায়রার পাশে৷ কিন্তু কেউ কেউ আবার এভাবে ঘোষণা দিয়ে পুরো অভিনয় জগৎকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়াকে নিতে পারছেন না ভালোভাবে৷ জায়রার বক্তব্যে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল বিতর্কের৷


আরেক জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী রাভিনা ট্যান্ডন জায়রাকে ‘অকৃতজ্ঞ' বলে উল্লেখ করেছেন৷ এমনকি তাঁর চিন্তাভাবনা ‘পশ্চাৎপদ' বলতেও ছাড়েননি তিনি৷


ক্ষিপ্ত রাভিনা একের পর এক টুইট ও রিটুইট করেছেন৷ নিজের সিদ্ধান্ত নিজের কাছে না রেখে বলিউডে কাজ করা সকল নারীকে অপমান করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর৷


সাংবাদিক বারখা দত্ত ব্যক্তিগত মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও ধর্মকে কারণ হিসেবে দেখানোকে নারীর জন্য ‘জটিল' সমস্যার সৃষ্টি করবে বলে উল্লেখ করেন এক টুইটে৷


এক সাক্ষাৎকারে দঙ্গলের পরিচালক নিতেশ তিওয়ারি জানিয়েছেন, জায়রার এমন সিদ্ধান্তে তিনি বিস্মিত হয়েছেন৷ তবে নিজের জীবন বেছে নেয়ার অধিকারকে সম্মান জানিয়েছেন তিনি৷


কাশ্মীরী এই অভিনেত্রীকে বলিউডে আসার পর থেকেই নানারকম আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে৷ ২০১৬ সালে দঙ্গলে অভিনয়ের জন্য চুল ছোট করতে হয় জায়রাকে৷ গণমাধ্যমে এই ছবি প্রকাশ হতেই তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ট্রল৷ ইসলামি উগ্রপন্থিরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘অনৈসলামিক' কাজ করার অভিযোগ আনে৷


২০১৭ সালে এক সাক্ষাতে জায়রাকে ‘কাশ্মীরী রোল মডেল' বলে উল্লেখ করেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি৷ এমন মন্তব্য তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়, এমনকি তাঁকে হত্যার হুমকিও দেয় চরমপন্থিরা৷


এবারও অনেকে মনে করছেন, দঙ্গল ও সিক্রেট সুপারস্টারে সাবলীল অভিনয়ের পর যেখানে জায়রার আরো দারুণ কিছু উপহার দেয়ার কথা, সেখানে তাঁর বলিউড ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে ‘অন্যকিছু' থাকতে পারে৷


কেউ কেউ টেনে আনছেন টালিউডের অভিনেত্রী ও তৃণমূলের লোকসভা সদস্য নুসরাত জাহানের প্রসঙ্গ৷ নুসরাত জাহান সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র পরায় অনেকের সমালোচনার মুখে পড়েছেন৷ নুসরাত জাহানের ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিমতের স্বাধীনতা' নিয়ে যারা সোচ্চার, তারাই আবার জায়রার সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর৷ আবার ঘটছে উলটোটাও৷ যারা নুসরাতের ঘটনা মানতে পারছেন না, তারা স্বাগত জানাচ্ছেন জায়রাকে৷ এমন দ্বৈত অবস্থানকে ‘হিপোক্র্যাসি' বলছেন অনেকে৷


আমির খান প্রোডাকশনস থেকে নির্মিত সিক্রেট সুপারস্টার এখন পর্যন্ত জায়রার সবশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি৷ চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায় ধর্মীয় গোঁড়ামির আবহে বেড়ে ওঠা এক মেয়ের গল্প৷ বোরকা পরা এক টিনএজ মেয়ের নিজের পরিচয় গোপন রেখে ইউটিউবে সুপারস্টার হয়ে ওঠার এই গল্প কেড়েছে কোটি মানুষের হৃদয়৷


দঙ্গলেও একটি সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে দুই মেয়ের কুস্তিগীর হয়ে ওঠার গল্প তুলে ধরেছে ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক মেয়ের স্বপ্নকে৷


সেই ‘সিক্রেট সুপারস্টার' এবার ধর্মের কারণ দেখিয়ে বিদায় নিলেন সুপারস্টারদের জগৎ থেকে৷ সিদ্ধান্ত নিলেন, সুপারস্টার নয়, ‘সিক্রেট' হয়েই থাকতে চান তিনি৷ তবে তাঁর এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাজের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত হতে চাওয়া অনেক মেয়েকে তিনি কী বার্তা দিলেন, সে নিয়ে তর্কটা আপাতত থামছে না।ডিডাব্লিউ।


 


এএস


 


 

Print