মহামারী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে ধর্ষণ

সাইফুল ইসলাম মাসুম
টাইম নিউজ বিডি,
০৪ জুলাই, ২০১৯ ১৭:৪৪:০৩
#

দেশে শিশু ধর্ষণ এক মহামারী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনে নজিরবিহীন রেকর্ড হতে চলেছে এখন। হঠাৎ যেন মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই যেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও।


গত এক বছরে ৪৩৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মারা গেছে ২৮জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছে আরও ২৭১জন শিশু। এছাড়াও বিভিন্ন ধরণের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০০৬ জন।


চলতি বছরের গত সাড়ে তিন মাসে (জানুয়ারী-এপ্রিল) ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। বেসরকারি সংগঠন ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের‘পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংস্থাটির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর রাফিজা শাহীন টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়া বেশির ভাগ শিশুর বয়স ৭ থেকে ১২ বছর। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। বিশেষ করে পুরুষ শিক্ষকের হাতে এই ধরণের নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে।


তিনি আরও বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার তিন গুণ বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। প্রথম চার মাসেই এক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরে শিশুদের বিষয়ে এক হাজার ৩৭টি ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে নেতিবাচক ঘটনায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ২৯৭৩টি, যেখানে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৮১১ জন।


‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের‘ (বিএসএএফ) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৪ জন শিশু। এ সংখ্যা জানুয়ারিতে ছিল ৫২, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ৬০ এবং মার্চে ফের ৫২ জনে দাঁড়ায়। গত তিন মাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯ জন। এর মধ্যে ৭ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণচেষ্টা হয়েছে ৮ জনের ওপর। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে। এ ছাড়া অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৬ জন।


২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ শিশু নির্যাতন, দুই শিশু ধর্ষণ এবং এক শিশু হত্যার শিকার হতো। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বেড়েছে অন্তত ৩৪ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, এর বাইরেও বহু অপরাধের ঘটনা নিত্যদিনই ঘটে। সেসব ঘটনা রেকর্ডহীন বলে স্থান পায় না থানার হিসাবে।


চাইল্ড পার্লামেন্টের নিজস্ব জরিপে এসেছে, গত বছর ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। কর্মজীবী ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৭ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ২১৩।


আইন ও সালিশ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে পর্যন্ত যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছে ১৮ জন নারী। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫ জন। নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছে ১ জন। নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। অ্যাসিডসন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ৫ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র দুটি। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে ৬৯ জন শিশুকে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৩২টির।


জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণসহ নানা সামাজিক অপরাধ আগেও ঘটেছে এখনো ঘটছে। বর্তমান সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অনেক শক্তিশালী করা হয়েছে, তবুও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব অপরাধ দমনে আইনের সঠিক প্রয়োগ করা প্রয়োজন। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সেটি করতে না পারলে এ অস্থিরতা চলতেই থাকবে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহানা ইসলাম টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অভাবে খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে।


মানবধিকার কর্মী আসাদুল ইসলাম অভিযোগ করে টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, বাংলাদেশে আইনে দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক অভিযুক্ত পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।


এমবি  

Print