'বাজেটে জনস্বার্থ নয়,দেশি-বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে'

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
টাইম নিউজ বিডি,
১৬ জুন, ২০১৪ ২২:৩৯:২১
#

২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অংকের হিসাবে খুব বড় নয়। তবে বাজেটের ত্রুটিগুলোর মধ্যে ব্যাপক অর্থশালীদের কাছ থেকে কর আদায়ের সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। যাদের আয় কম বা দরিদ্র্য জনগোষ্ঠী, তাদের ওপর চাপছে করের বোঝা। তাছাড়া বাজেটে আমাদের আগের ঋণের পরিমাণ কত এবং কিভাবে তা শোধ হবে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।


সম্প্রতি ইরানভিত্তিক জনপ্রিয় বাংলা অনলাইন রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ।


তিনি বলেন, প্রতি বছর বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া কালো টাকার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকাকে যদি করের আওতায় আনা যেত তাহলে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব ছিল এবং ঋণ নির্ভরতাও কমত।


বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারের নীতি, প্রকল্প প্রণয়ন ও ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিস্তর সমস্যা রয়েছে। বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানীখাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি। জ্বালানি খাতের যে অগ্রাধিকারের কথা বলা হচ্ছে তা কেবল বিদেশি কোম্পানীগুলোর স্বার্থে। সামগ্রিকভাবে বাজেটে প্রভাবশালী দেশি-বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। বাজেটে জনস্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।


পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো


প্রশ্ন: বাংলাদেশের ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট দিয়েছে সরকার। তারপরও সমালোচনা চলছে। কারণ কি? এ বাজেটের ত্রুটি কোথায়?


আনু মুহাম্মাদ: দেখুন ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর নানাভাবে সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সমালোচনা করছে। বাজেট নিয়ে সরকারি দলেরও সমালোচনা থাকতে পারে। তবে তাদের সেই সমালোচনা করার অধিকার থাকে না। তারা বলতে পারে না। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী সরকারি দলের সদস্যরা সমালোচনা করতে সক্ষম নন। বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে যে সমালোচনা করছেন তাতেও নানা যুক্তি আছে।


তবে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আমি বলব, অর্থনীতির যে আকার তাতে অঙ্কের হিসেবে এই বাজেট খুব বড় কিছু না। উন্নয়নের তাগিদকে যদি আমরা গুরুত্ব দেই তাহলে এ বাজেট আরও অনেক বড় হতে পারত।


রাজস্ব আয় যেটি দেখানো হয়েছে সে ব্যাপারে আমি বলব, গত ১/২ বছরের রাজস্ব আয়ে কিছু ঘাটতি আছে। তবে রাজস্ব আয়ের দিক থেকে সরকারের দক্ষতা ও সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এই সরকারের আগের মেয়াদের শুরুতে রাজস্ব আয় যা ছিল তার তুলনায় বর্তমানে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। ফলে জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতার কোনো অভাব দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া করের একটা বড় অংশ ভ্যাট হিসেবে আসে এবং বিভিন্ন পেশাজীবীরা অনেক কর দিয়ে থাকেন।


তবে রাজস্ব আয়ের ত্রুটির যে জায়গাটা; যার সমালোচনা খুব বেশি একটা হয় নি- তবে আমার দৃষ্টিতে সেটা বাজেটের খুব বড় একটা বৈশিষ্ট্য এবং সেটা এসেছে সরকারে নীতিগত অবস্থান থেকে। আর সেই জায়গাটা হচ্ছে, দেশে যাদের হাতে ব্যাপক বিত্ত-বৈভব আছে, যারা ব্যাপক অর্থশালী এবং বিপুল অর্থ মজুদ আছে তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। আর সেই ব্যর্থতার কারণে  জনগণের ওপর ভ্যাট সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের তাগিত পূরণের চেষ্টা করা হয়। যার ফলে রাজস্ব আয়ের চাপটা শেষ পর্যন্ত জনগনের ওপর গিয়ে পড়ে। তারমানে যাদের আয় বেশি তারা কর থেকে বেঁচে যাচ্ছে আর যাদের আয় কম, দরিদ্র্য জনগোষ্ঠী কিম্বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের ওপর করের বোঝাটা গিয়ে পড়ছে। আর রাজস্ব আয় থেকে উন্নয়ন বাজেটের খুব ছোট একটা অংশ পূরণ করা যাচ্ছে। যে কারণে গত বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরের বাজেটে একটা বড় ঋণ নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।


তাছাড়া আগের বছরের যে নির্ভরতা ছিল তার কারণে চলতি বছর সুদ দিতে হচ্ছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। তবে সেই ঋণের আসলের পরিমাণ কত এবং সেটা কিভাবে পরিশোধ করা হবে সেটা বাজেটে দেখানো হয় নি। বাজেটে সেটা না দেখিয়ে সরকার কিভাবে  আসলটা পরিশোধ করবে সেটা বেশ অস্পষ্ট একটা ব্যাপার।


প্রশ্ন: এবারের বাজেটে ঘাটতিটা অনেক বড় বলে কেউ কেউ  মনে করছেন এবং এ কারণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নিতে হবে বেশি। সে কারণে দেশের বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা আশংকা করছেন। এ আশংকা কতটা যৌক্তিক?


আনু মুহাম্মাদ: বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে বিষয়টি বলা হচ্ছে তার অন্য আরেকটি দিক রয়েছে। যেমন ব্যাংকগুলোতে এখনও প্রচুর পরিমাণে অর্থ রয়েছে। ছোট এবং মাঝারি বিনিয়োগকারীদের অনেক ধরণের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের নানা সমস্যা হয়। তাছাড়া সূদের হার অনেক বেশি হয়ে যায় তাদের জন্য। ফলে ব্যক্তিমালিকানা বা বেসরকারি খাতে  বিনিয়োগের হার বাড়ছে না। আর সেটা সত্যিই একটা উদ্বেগের বিষয়।


তবে আমার নিজের ধারণা এর  আরেকটি দিক রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হচ্ছে-যাদের বিনিয়োগ উদ্বৃত্ত আছে বা বিনিয়োগ করার সক্ষমতা আছে সেরকম একটা ছোট গোষ্ঠী যাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা আছে যেটাকে চোরাই অর্থ বা কালো টাকা বলা যেতে পারে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিদেশে পাচারকৃত সেই অর্থের পরিমাণ নিয়ে একটা পরিসংখ্যান দিয়েছে। সেইতথ্য মতে এর বার্ষিক গড় হচ্ছে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। আর এই ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা যদি করের আওতায় আসত তাহলে এখান থেকেই এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হতো। আর সেটা না করার কারণে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকের কাছে যেতে হচ্ছে। আর ব্যাংকের কাছে যাওয়ার ফলে ঋণ নির্ভরতার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় আরো বাড়বে।


ফলে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে এটা বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে নাকি ব্যাংকগুলোকে একটা অসহায় অবস্থা থেকে উদ্ধার করবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কারণ যদি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ তারল্য জমা থাকে এবং বেসরকারি খাত সেখান থেকে বেশি ঋণ নিতে উৎসাহী না হয় সেক্ষেত্রে সরকার ঋণ গ্রহণ করলে বরঞ্চ ব্যাংকের ব্যবসার জন্য ভাল হবে। তাছাড়া নতুন অনেক ব্যাংক খোলা হয়েছে তারাও হয়ত লাভের একটা পথ খুঁজে পাবে।


তবে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে জনগণের ওপর এই ঋণের বোঝাটা সূদের আকারে এবং ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের চাপের কারণে করের বিস্তার ঘটাতে হচ্ছে। আর সেটা বোঝাটা জনগণের ওপর পড়ছে। এমনিতে ঋণ করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। যেকোনো ঘাটতি বাজেটে ঋণ হতে পারে। কিন্তু ঋণের টাকাটা যদি উৎপাদনশীল খাতে খরচ  না হয় কিম্বা বিভিন্ন প্রকল্পে যদি দুর্নীতি এবং অপচয় বড় আকারে দেখা দেয় তাহলে এই ঋণটা পরবর্তীকালে বোঝা হিসেবে জনগণের ওপর আরোপিত হয়।


প্রশ্ন: এবারের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ- বেশিরভাগ বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদ এমন কথা বলছেন। কেন এই চ্যালেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে?


আনু মুহাম্মাদ: যে চ্যালেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে আমি ঠিক সেভাবে বলতে চাই না। কারণ বাস্তবায়ন করা হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ একথাটা যারা বলছেন তারা ধরে নিচ্ছেন যে বাজেট যেভাবে সূত্রায়ন বা প্রণয়ন  করা হয়েছে সেগুলো ঠিক আছে শুধুমাত্র বাস্তবায়ন করাটা সমস্যা।


তবে আমি নিজে মনে করি যেভাবে  বরাদ্দ বিতরণ ও প্রকল্প বাছাই করা হয়েছে- সেখানেই সমস্যা রয়েছে। এখানে সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে শিক্ষা নেই। শিক্ষাখাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমা হচ্ছে জিডিপির-শতকরা ৬ ভাগ। তার ৩ ভাগের ১ ভাগ ব্যয় করা হচ্ছে শিক্ষাখাতে।


স্বাস্থ্যখাতেও ব্যয় হচ্ছে অনেক কম। আর এই যে ব্যয় কম হচ্ছে এটা টাকার অভাবে না; এটা হচ্ছে সরকারের নীতিগত অবস্থানের কারণে। এর কারণ হচ্ছে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে অন্যান্য যে কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের মতো পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে মুনাফার একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিস্তৃত করার জন্য এই খাতগুলোকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা হয়। যারফলে শিক্ষাক্ষেত্রে অধিকতর নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া একটি বড় অংশ খুবই ব্যয়বহুল হচ্ছে। কিছু লোকের জন্য ব্যবসা হচ্ছে কিন্তু সামগ্রিক জনগণের জন্য  শিক্ষা এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে কঠিন একটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং প্রকল্প বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ এটার চেয়ে আমি বলব পুরো বাজেটের ধরণে জনস্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।


আর বাস্তবায়ন বলতে সাধারণত আমাদের দেশে যেটাকে খণ্ডিতভাবে দেখা হয় সেটা হচ্ছে- বাস্তবায়ন মানে টাকা খরচ করা। তো টাকা খরচ করা এবং বাস্তবায়ন দুটোকে একভাবে দেখার কারণে এর গুণগত দিকগুলো আড়াল হয়ে যায়। সেকারণে আমরা দেখি মার্চ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প বাবদ বরাদ্দের খরচ হচ্ছে শতকরা ৫০ ভাগের মতো কিম্বা তারো কম। পরবর্তী এপ্রিল-মে-জুন মাসে হুলস্তুল কাণ্ড শুরু হয়ে যায়। আর তখন অপচয় এবং দুর্নীতির জায়গা তৈরি হয়। আর এ ঘটনা ঘটার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে প্রকল্পগুলো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে বা প্রকল্পগুলো এমনভাবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দাঁড় করানো হয় যেখানে দুর্নীতি এবং অপচয়ের জায়গা তৈরি হয়। সেজন্য আমার কাছে আরো মৌলিক সমস্যা বলে মনে হয় বাজেট  প্রণয়ন প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাছাই প্রক্রিয়া এবং সেগুলোর বাস্তবায়নের ধরণ-এগুলোই প্রধান সমস্যা।


অর্থমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, যে এটা ধারাবাহিকতার বাজেট। আগে যেভাবে বাজেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি তৈরি হয়েছে এবং তা ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি যারফলে চোরাই টাকার ক্রমবর্ধমান একটা অনুপাত দেখা যাচ্ছে। আর সেই ধারাবাহিকতাই তো চলবে সেকথা অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন। অর্থাৎ যেভাবে আগে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুন্ঠননির্ভর তৎপরতা ছিল এবারও সেভাবেই চলবে।


প্রশ্ন: প্রস্তাবিত বাজেটে আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আপনারও কি তাই মনে হয়?


আনু মুহাম্মাদ: হ্যাঁ আমারও তাই মনে হয়। দেখুন অনেকগুলো জায়গায় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল। প্রথম অগ্রাধিকার থাকা উচিত ছিল শিক্ষা। তার সঙ্গে থাকা উচিত ছিল চিকিৎসা। তাছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে সরকার বলছে যে এখাতে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতের বরাদ্দটা দেখলেই বোঝা যাবে বরাদ্দের বেশিরভাগই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বা বিদেশি কোম্পানীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যেসব চুক্তি হয়েছে সেই চুক্তির ফলে যে লোকসান হচ্ছে সেই লোকসানের ভর্তুকী পূরণের জন্যই বেশিরভাগ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে যদি এই টাকাটা জাতীয় সক্ষমতা তৈরি এবং বিকাশের জন্য খরচ করা হতো তাহলে এই খাতাগুলো আর তলাহীন ঝুড়ির চেহারা নিত না। দেখা যেত যে এই খাতগুলো থেকে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার একটা ক্ষেত্র তৈরি করছে। জাতীয় সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে আমাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।


শিক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যয় বরাদ্দ পেলে শিক্ষিত এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী তৈরি হতে পারত। এভাবে ব্যয়গুলো ঘটলে পরবর্তীতে সম্পদের বিকাশ এবং টেকশই উন্নয়নের রাস্তা তৈরি হতো। আর এগুলো করলে সরকার আয়ের অন্য কিছু রাস্তা যে রাস্তায় সরকার যাচ্ছে না- সেখানে যেতে পারত। যেমন রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্পদশালী যারা তাদেরকে ধরা কিম্বা যারা চোরাই অর্থের মালিক তাদেরকে কর জালের আওতায় নিয়ে আসা। তারমানে আয় বৃদ্ধি এবং ব্যয়কে সীমিত পর্যায়ে রাখার বিকল্প যে পথগুলো ছিল সেদিকে সরকার না যাওয়ার কারণে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে এরকম ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।


প্রশ্ন: কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি আপনি বললেন তো অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলেন নি। সমালোচনা উঠেছে- নীরবতার মধ্যদিয়ে কালো টাকা সাদা করার সম্মতি দিয়েছেন তিনি। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


আনু মুহাম্মাদ: দেখুন পরে অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে কালো টাকা সাদা করতে দেয়া হবে না। আসলে কালো টাকা সাদা করতে সরকার দেবে কি দেবে না এই জায়গায় সমালোচনাটা না এসে যদি মৌলিক একটি প্রশ্নে আসা যেত সেটাই যুক্তিযুক্ত হতো। আর সেটি হচ্ছে- কালো টাকা তৈরি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকার কি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে? এটাই মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত।


যেভাবে এখন টাকা কালো টাকা তৈরি হচ্ছে তাতে প্রাথমিক একটি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮ লাখ কোটি কালো বা চোরাই টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আছে। আর এই কালো টাকাটা কারো পকেটে বা বাক্সে চুপচাপ বসে নেই। এই বিপুল পরিমাণ চোরাই টাকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সক্রিয় আছে। এই টাকার সক্রিয় থাকার জায়গাগুলো যেমন ধরুন- মাদক ব্যবসা, নারী ও শিশু পাচার, সন্ত্রাস-সহিংসতা, জমি দখল, ঘুষ, ব্যাংক লুট ও কমিশনের মধ্যে তৎপর। আর যারা এসব তৎপরতা চালায় তারা খুবই ক্ষমতাবান লোক। তারা অর্থশালী ও ক্ষমতাবান হওয়ার কারণে রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে। তারা বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবতি করে। পরবর্তীকালে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তারা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখায়। ফলে কালো টাকার মালিকদের টাকা সাদা করা না করায় কিছু আসে যায় না। কারণ তারা এতই ক্ষমতাধর যে কালো টাকা সাদা না করলেও তাদের ওপর কোনো আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সরকার তাদের দ্বারাই পরিচালিত হয়।


আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- যেহেতু চোরাই অর্থনীতিতে মুনাফার হার বেশি। সেহেতু তারা তাদের নিজস্ব যে প্রক্রিয়া সেখানেই বিনিয়োগ করে থাকে। আর কিছু কালো টাকা যখন সাদা করার সুযোগ থাকে তখন ওই কিছু টাকা সাদা  করে বাকি অঢেল কালো টাকার বৈধতা দেয়ার চেস্টা করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের ক্ষমতার বিন্যাসে তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। যেহেতু তারা রাজনৈতিকভাবে ক্রিয়াশীল ও ক্ষমতাবান এবং কালো টাকা সাদা করা না করায় তাদের কিছু আসে যায় না সেজন্য মূল যে প্রশ্নটি উত্থাপন করা উচিত সেটা হচ্ছে- কালো টাকা কিভাবে তৈরি হচ্ছে এবং কাদের হাতে এই কালো টাকা জমা আছে। আর যাদের হাতে বিশাল অংকের কালো টাকা আছে তাদেরকে কর জালের আওতায় আনার জন্য সরকার কি পদক্ষেপ নিচ্ছে। আর সেই জায়গার আলোচনা বা সমালোচনা খুব কম হচ্ছে।


প্রশ্ন: আচ্ছা, স্বাধীনতার এত বছর পরও বাজেটে সামরিক খাতের বরাদ্দ নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য না থাকাকে অনেকে সমালোচনার চোখে দেখছেন। কেন এই সমালোচনা? এ ক্ষেত্রে সরকার কি আসলেই আরো বেশি স্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারত?


আনু মুহাম্মাদ: দেখুন এ বিষয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে তার কারণে সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছেন ভবিষ্যতে বাজেটে সামরিক খাতের বিষয়টি নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা করবেন। আসলে বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় সেটা তো জনগণের টাকা। ফলে এটা নিয়ে তো ভবিষ্যতে আলোচনার কোনো বিষয় নয়। অন্যান্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে যেমন জনগণের জানার অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনি প্রতিরক্ষাখাতেও বাজেট বরাদ্দ কি হচ্ছে এবং তা কোন খাতে কিভাবে ব্যয় হচ্ছে তা জানারও অধিকার জনগণের রয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশে এমনকি মিয়ানমার বা পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিকভাবে খুবই ক্ষমতাশালী সেখানেও প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। সেখানে বাংলাদেশের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে এই যে অস্পষ্টতা তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এটা খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে হবে। জনগণের টাকা কোথায় কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা স্পষ্টভাবে জানার অধিকার জনগণের আছে। ফলে প্রতিরক্ষা বাজেট খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে হবে এবং অন্যান্য জায়গাতেও যে বিভিন্নভাবে অসত্য তথ্য দিয়ে নানা কিছু আড়াল করা হয় সেগুলো স্বচ্ছ করতে হবে। কারণ জনগণের নিজের টাকায় তৈরি হয় যে বাজেট সেই বাজেটে অবশ্যই স্পষ্টতা থাকতে হবে। আর এখানে জনগণের টাকা কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে সে ব্যাপারে জনগণের একটা সরব অবস্থান জরুরি। এ ছাড়া পরিবর্তনের আর কোনো উপায় নেই।


প্রশ্ন: সর্বশেষ যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো প্রস্তাবিত বাজেটকে জনমুখী বলা যাবে নাকি জনবিরোধী?


আনু মুহাম্মাদ: দেখুন নতুন করে প্রস্তাবিত এই বাজেটকে নিয়ে কিছু বলা যাবে না। কারণ এই বাজেট ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়েই হচ্ছে। যারা এই দেশে- লুন্ঠন, পাচার, জবর-দখল এবং সন্ত্রাস পরিচালনা করছে কিম্বা দেশীয় সুবিধাভোগীগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থেই পরিচালিত হচ্ছে বাজেট প্রক্রিয়া। ফলে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা জনস্বার্থ খুঁজে  পাই না। জনস্বার্থের কথাগুলো আসলে বাগাড়াম্বর ছাড়া আর কিছু নয়। মূল বাজেট বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখব যে জনগণের অর্থ এবং সম্পদ কিছু দেশি এবং বিদেশি কোম্পানির হাতে স্থানান্তর করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়াটাকেই এখানে বৈধতা দেয়া হয়।


ঢাকা, ১৬ জুন(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস

Print