স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয় চাপিয়ে দেওয়া শান্তি ও স্বস্তি।

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
০৪ জানুয়ারি, ২০১৫ ২৩:২৩:৫৪
#

৫ জানুয়ারি থেকে ৫ জানুয়ারি। কেমন গেল একটি বছর। কেমন গেল দেশের রাজনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের উপায় কী? এসব নিয়ে কথা বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলো'র মিজানুর রহমান খান।


প্রশ্ন: গত বছর ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর এক বছর পার হলো। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?


ইফতেখারুজ্জামান: গত এক বছরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় কম সংঘাতপূর্ণ ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। এটিকে বলা যায় চাপিয়ে দেওয়া শান্তি ও স্বস্তি। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। জনগণের প্রতিবাদের ও মত প্রকাশের সুযোগ কমে গেছে। জবাবদিহির অভাব প্রকট হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ রকম ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে দেশে শান্তি ও স্বস্তি আছে, উন্নয়নও হচ্ছে। তবে এসব কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে নয়।


প্রশ্ন: সে ক্ষেত্রে বিএনপির সর্বশেষ প্রস্তাবকে কি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন?


ইফতেখারুজ্জামান: এটা তাদের আগের অবস্থানেরই একটি সংগঠিত উপস্থাপনা বলে মনে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। তবে বক্তব্যের বিষয়বস্তু গঠনমূলক থাকলেও উপস্থাপনা গঠনমূলক বা ইতিবাচক ছিল না।


প্রশ্ন: সরকারের প্রতিক্রিয়া?


ইফতেখারুজ্জামান: আমি আশা করব, এ পর্যন্ত সরকারি দল যা বলেছে, সেটা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। কারণ, বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি, তা থেকে উত্তরণে সমঝোতা দরকার। এটা এড়ানো সরকারের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সুখকর হবে না।


যদিও এটা ঠিক যে, তাদের প্রস্তাব এখনই বিবেচনায় নেওয়ার মতো সুযোগ সরকারের হাতে নেই। তার পরও খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে এভাবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা ঠিক হয়নি।


প্রশ্ন: ৫ জানুয়ারিতে প্রশাসন কী করে দুই বিবদমান গোষ্ঠী থেকে নিজেদের একটু তফাতে রেখে ভূমিকা পালন করতে পারে? কোনো সুপারিশ?


ইফতেখারুজ্জামান: আমাদের প্রত্যাশা হলো প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইনানুগ এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। অথবা তারা অন্তত এতটুকু দৃশ্যমান হতে দেবে যে, তারা সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা তারা বাস্তবে কতটা কী করবে, তা ৫ তারিখে বোঝা যাবে।
তবে দীর্ঘকাল ধরে সরকারি দল যেভাবে তাদের চাপে রেখেছে, তাতে এখন আর পেশাদারত্ব ধরে রাখার পরিবেশ নেই বললেই চলে। তবে তাদের মনে রাখতে হবে, উভয় পক্ষই যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে তাদের যৌক্তিক অবস্থান আছে বা থাকতে পারে। তাই কর্মসূচিগুলো যার যার অবস্থান থেকে পালন করতে দেওয়াটাই কাঙ্ক্ষিত আর প্রশাসন সেটা হতে দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয়ের জন্য সহায়ক হতে পারে। উভয়ের জন্য বাকস্বাধীনতার বিষয়।


প্রশ্ন: বিএনপি নেত্রী নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা চান। কিন্তু এটা দৈনন্দিন শাসনেও জরুরি। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর দাবি নেই। সমাজও এই চাহিদার বিষয়ে সরব নয়।


ইফতেখারুজ্জামান: সমাজের ভেতরে একধরনের চাহিদা আছে। তবে এর অকার্যকরতার জন্য দায়ী সম্ভবত আমাদের জিরোসাম গেম। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনীয় সচেতনতা নেই। এটা হয়তো মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ করতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল নীরব, সে কারণেই আমি বলেছি, বিএনপির দাবিদাওয়ার মধ্যে কোনো গুণগত পরিবর্তন আমি দেখিনি। এর কারণ হলো, তারা যখন ক্ষমতায় যাবে, তখন আবার এ রকমের চর্চা করা তাদের জন্য সুবিধার হবে। তাই এ নিয়ে তারা কোনো দৃঢ়চেতা মনোভাব দেখাবে না।


প্রশ্ন: সাত দফা সম্পর্কে কী বলবেন? এতে কি শাসনগত পরিবর্তন আনতে বিএনপির কোনো অভিপ্রায় ধারণা করা যায়?


ইফতেখারুজ্জামান: আমি আগেই যেমনটা বলেছি কোনো পরিবর্তন কিন্তু নেই। তাদের সাত দফার সারকথা হচ্ছে, কী করে একটা নির্বাচন হতে পারে। তারা মনে করে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু এটা তো রাজনৈতিক কর্মসূচি দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। বিশ্বের সব রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় যেতে রাজনীতি করবে। কিন্তু সে জন্য তো একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে হবে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা ঘাটতি থাকার কথা নয়। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচনের প্রতি সবার কাছেই একটা সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলকে তো পুনর্বিবেচনা করতে হবে যে তাদের রাজনৈতিক পুঁজি ঠিক কোথায়।


প্রশ্ন: দলগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিন্তু ভালো নয়। ক্ষমতাসীন দলে চার শর বেশি ও বিএনপিতেও অপেক্ষাকৃত কম হলেও খুনোখুনি ঘটেছে। আবার বিচারহীনতার সংস্কৃতিও চলছে। এটা নতুন উদ্বেগের ক্ষেত্র কি না?


ইফতেখারুজ্জামান: এটা গণতন্ত্রহীনতার প্রকটতর বহিঃপ্রকাশ। কারণ, সরকারি, আধা সরকারি জায়গা থেকে বলাই হয়, ক্ষমতায় যাওয়া মানে আমার মুনাফা, আমার সুবিধা, অামার সম্পদ বৃদ্ধির একটি উপায়। সেসবই। ক্ষমতায় গেলে আমরা মনে করি, ক্ষমতাকাঠামো আমার একচ্ছত্র ভুবন আর ক্ষমতার বাইরে থাকতে মনে করি, আমার তো কিছুই করার নেই।


প্রশ্ন: বিরোধী দলের ব্যাপারে সরকারি সংস্থাগুলোর আচরণ কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?


ইফতেখারুজ্জামান: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে অনুমতি দেওয়া। কারণ, সংবিধান বাকস্বাধীনতা ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, সেটা দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে সহায়ক হয়, এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তাদের সচেষ্ট থাকতে হবে। অন্যদিকে, বিএনপিকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।


শেষ মহড়া বা জনসমর্থনের নামে ক্ষমতার প্রদর্শন, অর্থাৎ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যদি নেতিবাচক হয় এবং শোডাউনের মতো হয়, তাহলে কিন্তু অনেকটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। সেটা অনেক সময় উসকানিনির্ভরও হতে পারে। কিন্তু তেমন কিছু সৃষ্টি হবে না, সেই অবস্থাটা আশা করব। আর এটা কেবল ৫ জানুয়ারি বা কোনো একটি দিবসের জন্য নয়, আমরা শান্তিপূর্ণ প্রতিটি দিন চাই। ২০১৩ সালের পুনরাবৃত্তি চাই না। সংঘাত জিইয়ে রাখা সমীচীন হবে না।


প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তারেক রহমানের উক্তির পরে দেখা গেল বিএনপি নেত্রী তাঁকেও পরোক্ষভাবে সমর্থন করলেন। আবার এটা প্রত্যাহার না করলে সভা করতে না দেওয়ার সরকারি মনোভাবও পরিষ্কার। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো আপসের জায়গা দেখেন?


ইফতেখারুজ্জামান: আমি মনে করি, বিএনপি নেত্রীর উচিত ছিল তারেকের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা। এটা করে তিনি অনেক রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারতেন। কারণ, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কারও কাছেই এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা করতে পারলে তাঁর ক্ষতি হতো না, বরং লাভ হতো। দেশবাসী ভাবতেন, হ্যাঁ, তিনি তাঁর ছেলের ভুলটি ধরিয়ে দিয়েছেন।


প্রশ্ন: সেই সময় ও সুযোগ এখনো অতিক্রান্ত হয়ে যায়নি।


ইফতেখারুজ্জামান: অবশ্যই সেটা খোলা রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি সেটা করতে পারেন। এমনকি যদি তিনি তাঁর সম্পূর্ণ দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়েও করতে চান, তাহলেও সেই সুযোগ আছে। আর সেটা তাঁর জন্য সুবিধার হবে। কথাটি তিনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করবেন বা করবেন না, সেই আলোচনায় আমি যাচ্ছি না।
আসলে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এ রকম একটি মন্তব্য কিন্তু দেশের কারও কাছেই প্রত্যাশিত নয়। তার পরও আমরা আশা করব, সরকারি দল বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। এটা যেন আবার সহিংসতার কারণ না হয়।


প্রশ্ন: কিন্তু এও তো সত্য যে, জনবহুল ঢাকায় যেখানেই যারা সভা করুক, মানুষের অনেক দুর্ভোগ বাড়ে। হাইডপার্ক করা আমাদের পক্ষে সম্ভব কি?


ইফতেখারুজ্জামান: সভা-সমিতি করতে দেওয়ার সঙ্গে স্থান নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকা শহরে এখন সে রকম সুবিধা প্রায় নেই। এটা নির্দেশ করে যে, আমাদের রাজনীতি জনসভা ও শোভাযাত্রার মতো তৎপরতা সর্বত্র থেকে যাবে। ড্রয়িংরুমে বসে হরতাল ডেকে দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। হরতালে সন্ত্রাস ও সংঘাতের ঝুঁকি থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকার পালনের অন্যান্য উপায়ও আছে। মানববন্ধন হতে পারে। সবাইকেই জনবান্ধব বিকল্প ভাবতে হবে। সমাবেশের জন্য আলোচনা করে এক বা একাধিক স্থান নির্দিষ্ট করা দরকার। যে আগে চাইবে, সে আগে পাবে। সমতার নীতি থাকতে হবে।


এএইচ

Print