ফিনল্যান্ডের মাথাব্যাথা!

আবদুর রহমান
টাইম নিউজ বিডি,
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১২:২৯:৩৪
#

ঘন সবুজ অরণ্য ও প্রচুর হ্রদে ভরা দেশ ফিনল্যান্ড। সরকারী নাম ফিনল্যান্ড প্রজাতন্ত্র হলেও ফিনীয়রা নিজেদের দেশকে সুওমি বলে ডাকে। ইউরোপের সবচেয়ে নবীন রাষ্ট্রগুলির একটি হলেও ফিনল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র সুবিদিত। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ধর্মচর্চা, ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ ও ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এদেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।


ফিনল্যান্ডে ২০১১ সাল পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশটিতে ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ লুথেরান গির্জার অনুসারী। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এভানজেলিক্যাল লুথেরান গির্জা এখানে অবস্থিত। তবে দেশটিতে শতকরা ২০ ভাগ মানুষের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই।


ইউরোপের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের দেশ হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ডে ক্রমবর্ধমান ধর্মের মধ্যে অন্যতম ইসলাম। দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজারে।  এদের মধ্যে অধিকাংশ অভিবাসী হলেও আদিবাসীদের মধ্যেওমুসলমানের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।


১৮৭০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে তাতার মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রথম সৈনিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে ফিনল্যান্ডে আগমন করে।  পরে উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও সাবেক যুগোশ্লাভিয়া থেকে মুসলমানরা এখানে এসে আলাদা কমিউনিটি গড়ে তোলেন।


সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানদের শিকড় এ দেশের গভীরে প্রোথিত।  ধর্মচর্চা অব্যাহত রাখার স্বার্থে মুসলমানরা ফিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণ করেছেন।  তবে হাজার বছরের সেই ঐতিহ্য ম্লান হতে বসেছে। 


সম্প্রতি দেশটিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিছু ধর্ম বিদ্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও তার সমর্থক।  তারা শুধু ধর্মের বিরুদ্ধেই নয়, দেশটিতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের বিরুদ্ধেও উঠে পড়ে লেগেছেন।


রাস্তার পাশে বড় বড় ব্যানার টাঙ্গানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম বিদ্বেষী ও অভিবাসন বিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছেন।  তবে দেশটির প্রশাসন গ্রুপটিকে নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।



পশ্চিম ফিনল্যান্ডের সাতাকুনটা ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে দু'টি অস্থায়ী ব্যানার ঝুলানো হয়েছে। ব্যানার দু'টিতে অভিবাসন ও ইসলাম বিরোধী মনোভাব ঘোষণা করা হয়েছে।


সাদা কাপড়ের তৈরি বেডশিট আকারের ব্যানার দু'টিতে বড় হাতের অক্ষরে লেখা হয়েছে, "ইসলাম ফিনল্যান্ডকে ধ্বংস করছে" এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষা কর, অভিবাসনকে না বলো"।


তবে পুলিশ জানিয়েছে, ওইসব ব্যানার সরিয়ে ফেলার জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে। উপ-পুলিশ টিমো ভাউলা বলেন, আইন অনুযায়ী যদিও ব্যানারগুলো উত্তেজনা সৃষ্টি করে না, তথাপি যানবাহন চলাচলে সমস্যা করায় সেগুলো এরইমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।  ব্যানারগুলো সরিয়ে ফেলার পূর্বে এ বিষয়ে ঘোষণা করা হয়েছিল।


ফিনল্যান্ডে গত মাসেও একই ধরণের ঘটনা ঘটেছিল।  তখনও অস্থায়ী ব্যানারে ধর্মকে খাটো করে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছিল।  পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যানারে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল যে, “প্রাণী থেকে মানুষের পার্থক্য কি?” জবাবে লেখা হয়েছিল- “ভূমধ্যসাগরীয়”। এই একই ধরণের ঘটনা দক্ষিণ ফিনল্যান্ডেও ঘটেছিল।


সম্প্রতি দেশটির ফিনস পার্টির খ্যাতনামা এমপি ওল্লি ইম্মোনেন তার ফেসবুকে দেয়াস্ট্যাটাসে শপথ নিয়ে বলেছেন,একটি প্রকৃত ফিনিস জাতি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত মাতৃভূমির জন্য আমাদের লড়াই চলবে।


ওল্লি ইম্মোনেন এর এই মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন দলটির নেতা টিমো সোইনি।  তবে বদ্ধমূল আতঙ্ক বা দু:স্বপ্ন হিসেবে পরিচিত 'বহুসংস্কৃতিবাদ' এর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে পার্টির একজন বিশিষ্ট নেতার আহবানের পরও নিরব রয়েছে ফিনস পার্টির অন্য নেতারা।


দেশটির ওউলু এর উত্তর ফিনিস শহরের একজন সংসদ সদস্য হলেন ওল্লি ইম্মোনেন। তিনি ‘সৌমেন সিসু’ নামে একটি জাতীয় সংগঠনেরও সভাপতি। ওই সংগঠনের ওয়েবসাইট এবং নিজের ফেসবুকে ইংরেজিতে এ স্ট্যাটাস দিয়েছেন ওল্লি ইম্মোনেন।



ওই ফিনিস এমপি স্পষ্টতই অভিবাসনের বিরুদ্ধে। যিনি তার ওয়েবসাইটে ফিনল্যান্ডের ‘ইসলামিকরণ’এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তাও ব্যাখ্যা করেছেন। ওই পোস্টে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছেন-“ছোট্ট এই ভূ-খণ্ডে খুব শিগগিরই আমাদের শত্রুদের বসবাস মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে,সেই অশুভের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।”


তার এই মন্তব্যে অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের থেকে ব্যাপক নিন্দার সৃষ্টি হয়, যারা তাকে ঘৃণা সৃষ্টিতে উস্কানি দেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তবে ২৯ বছর বয়সি দলনেতা টিমো সোইনি, যিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।


ফিনল্যান্ডে শরণার্থীদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন দেশটির সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এরক্কি লিকানেন।  তিনি সেদেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের কল্যাণে নিজের এক মাসের পুরো বেতন (দশ হাজার ইউরো) রেডক্রসের ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন।


এরক্কি লিকানেন তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন,ফিনল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া হাজারো শরণার্থী ও অভিবাসীর আবাসনসহ অন্যান্য সংকটের তীব্রতা ও ভোগান্তি আমাকে ব্যথিত করেছে।  তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা আমাদের মানবিক দায়িত্ব।


এ সিদ্ধান্তে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবেন আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, ফিনল্যান্ডের সবাইকে শরণার্থীদের সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসার আহবান জানাই।


সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে ২০০৮ থেকে ২০১৪ মেয়াদে রেডক্রসের ফিনল্যান্ড শাখা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এরক্কি লিকানেন।


উল্লেখ্য, ফিনল্যান্ডকে সাধারণত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অংশ ধরা হয় এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সাথে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আছে।  কিন্তু বহু শতাব্দী যাবৎ ফিনল্যান্ডবিরোধী শক্তি সুইডেন ও রাশিয়ার মধ্যে একটি সীমান্ত দেশ হিসেবেই বিদ্যমান ছিল।  সাত’শবছর সুইডেনের অধীনে শাসিন হবার পর ১৮০৯ সালে এটি রুশদের করায়ত্ত হয়।


রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৭ সালে এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ফিনল্যান্ড ও রাশিয়া বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার একটি চুক্তি সম্পাদন করে এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশ দুইটির মধ্যে দৃঢ় অর্থনৈতিক বন্ধন ছিল।  ১৯৯১ সালের পরে ফিনল্যান্ড ইউরোপমুখী হয় এবং ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে।


কেবি

Print