সমুদ্রে ফেরা

আলিমুল হক
টাইম নিউজ বিডি,
১৭ নভেম্বর, ২০১৫ ১৫:০৩:৪৭
#

চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৪০তম বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম আমি আর চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগের উপ-পরিচালক সুবর্ণা। বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসই মূলত অনুষ্ঠানের আয়োজক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরি। আমরা তার একটি সাক্ষাতকার নিলাম, একসঙ্গে ছবিও তুললাম।


তো, অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে সুবর্ণা অনেকটা ক্যাজুয়েলি বললেন, ‘আলিম ভাই, হাই নানে একটি প্রোগ্রাম আছে। শিশির যাবে। আপনি যাবেন?’ অনেক দিন বেইজিংয়ের বাইরে যাই না। মনটা আঁকু-পাঁকু করছে কোথাও যেতে। ঠাট্টা করে বললাম, ‘কখন যেতে হবে? আজ?’ সুবর্ণা হেসে বললেন, ‘না, অক্টোবরের শেষ দিকে।’


২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার হাই নানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হল আমাদের। সকাল ৭টায় সিআরআই অফিসভবনের সামনে জড়ো হলাম আমরা পাঁচ জন। আমি ঠাট্টা করে বলি ‘হাম পাঞ্চ’ (আমরা পাঁচ)। ‘হাম পাঞ্চ’-এ আমি আর শিশির ছাড়াও আছেন হিন্দি বিভাগের ভারতীয় বিশেষজ্ঞ আখিল ও চীনা কর্মী অঞ্জলি এবং তামিল বিভাগের চীনা কর্মী থোং ই। চীনা ‘থোং ই’ মানে ‘ইয়েস’ বা ‘হ্যা’। ‘থোং ই’ হাসতে হাসতে বললেন, আমি সবসময় ‘হ্যা’।


এয়ার চায়নায় আমার এবারই প্রথম চড়া। এর আগে চীনে যতবার এসেছি এবং চীন থেকে বাংলাদেশে গেছি, ততবারই আমার ভরসা ছিল চায়না ইস্টার্ন। ফ্লাইট পৌনে দশটায়। আমরা রওয়ানা হয়েছি ৭টায়। সাবধানতা। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের আশঙ্কা। আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হল। আধা ঘন্টার রাস্তা প্রায় দেড় ঘন্টায় অতিক্রম করলাম। প্লেনটাও ছাড়লো যাই-যাচ্ছি করে। কিছুদূর যায়, আর মিনিট পনেরর জন্য থামে; আবার যায় আবার থামে। অবশেষে প্লেন আকাশে ডানা মেলল বেলা ২টার মধ্যে হাই নান পৌঁছাবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এয়ার চায়না অবশ্য সে প্রতিশ্রুতি রেখেছে।


হাই নান চীনের মূল ভূখণ্ডের সবচে’ বড় দ্বীপ। ট্রপিক্যাল অঞ্চল। এখানে শীত পড়েই না বলা চলে। তাই শীতকালে পর্যটকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন হাই নানে। শুধু বিদেশিরা নয়, চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসেন চীনারাও। হাই নানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর এই হাই নানেরই বিখ্যাত শহর ‘ছান ইয়া’, শিশিরের উচ্চারণ হয় ‘ছাইয়া’, অনেকটা হিন্দি চলচ্চিত্রের ‘ছাইয়া ছাইয়া’র মতো।


‘ছান ইয়া’-কে অনেকেই ডাকেন ‘পর্যটকদের স্বর্গ’ বলে। পর্যটনশিল্পের ওপর ভর করে শহরটি দিন দিন উন্নত হচ্ছে। শিশির আমাকে ম্যাপ দেখাল। আমাদের প্রথম গন্তব্য এ ছান ইয়া। ম্যাপে ছান ইয়া’র অবস্থান দেখে আমি নড়েচড়ে বসলাম। ম্যাপে ছান ইয়ার ছোট্ট ডটটা সমুদ্রঘেষে। সমুদ্র! কতদিন দেখি না!! তবে কি দেখা এবার হবে? আশা ভঙ্গের ভয়ে কিছু জিঙ্গেস করলাম না। আমার মন ততক্ষণে চলে গেছে কক্সবাজারে। সেই কবে সমুদ্রে গিয়েছিলাম!


চায়না ইস্টার্নের ইন-ফ্লাইট খাবার নিয়ে আমার স্ত্রীর বেজায় অভিযোগ। আমারও খানিকটা আপত্তি নেই, তা নয়। অপেক্ষা করছিলাম এয়ার চায়নার ইন-ফ্লাইট খাবার চেখে দেখতে। সকালে নাস্তা না-খেয়ে বের হয়েছি। বিমানবন্দরের পথে রাস্তায় অঞ্জলি এক টুকরো কেক দিল। নেব না নেব না করেও নিলাম। খেয়ে দেখি চমত্কার! লজ্জায় আরেক টুকরা চাওয়া হয়নি। অতএব ক্ষুধা রয়েই গেল। প্লেনে উঠে ঘড়ি দেখতে লাগলাম। ১১টা নাগাদ খাবার পাওয়া যাবে। পাওয়া গেল। চিকেন রাইস। সম্ভবত এই প্রথম আমি চেটেপুটে ইন-ফ্লাইট খাবার খেলাম। খাবারের মান ভাল থাকার কারণে, নাকি পেটে ইঁদুর দৌঁড়াচ্ছিল বলে, বোঝা মুশকিল।


বেলা দেড়টার দিকে হাই নান চোখে ধরা দিল। তখন প্লেনটা যাচ্ছিল মেঘের উঁচু উঁচু পাহাড়ের ওপর দিয়ে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারে হাই নান, চীনের বৃহত্তম দ্বীপ। আমি এই লুকোচুরি খেলা দেখি আর অবাক হই। স্রষ্টার অপার সৃষ্টিশীলতায় মাথা নত হয়ে আসে। আমার মতো আরও একজন তার মতো করে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিলেন। স্নিগ্ধ এক নারী। বয়স আন্দাজ করতে পারলাম না। ২৫ থেকে ৪০—যে কোনো একটা হবে। প্লেনে বসে বলতে গেলে সারাক্ষণ চোখ বন্ধ করে কিছু পড়ছিলেন। মন্ত্র-টন্ত্র হবে। কোলের ওপর একটা কমলা রঙের বই। মাঝে মাঝে সেই বইয়ের ওপরও নজর বুলাচ্ছিলেন। চীনা ভাষায় লেখা বইটির নাম ‘শান্তির পথ’ বা এ ধরনের কিছু। শিশির অবশ্য নিশ্চিতভাবে সেটা বলতে পারল না।


স্রষ্টার তৈরি দু’টি জিনিস আমাকে খুব টানে। একটি সমুদ্র আর অন্যটি পাহাড়। কে জানতো হাইনান এসে এ দুটিকে একসঙ্গে দেখবো! ছান ইয়া বা ছাইয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্লেনটা বুক পেতে নামলো যখন তখন ঘড়ির কাটা ২টার ঘর অতিক্রম করেছে। নামার আগে প্লেনটা যখন চক্কর কাটছিল তখন চোখে পড়ল নীচে সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য। পাহাড় আর সমুদ্র। মনের ভেতরে একটি ভাবনা খেলে গেল। হতে তো পারে, আমরা যে হোটেলে উঠবো সেটি পাহাড়ের চূড়ায়, সমুদ্রমুখী! আশায় আশায় থাকলাম এবং বলা বাহুল্য আমার সে আশার গুড়ে বালি পড়ল।


অত্যন্ত আনরোম্যান্টিক একটা জায়গায় ৪ তারকা হোটেলটি আমার পছন্দ হল না। কিন্তু করার কিছু নেই। বুকিং দেওয়া হয়েছে আগেই। মন খারাপ করে নিজের রুমে ঢুকে প্রথমেই শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালাম। তার পর নামাজ পড়তে দাঁড়াব যখন ভাবছি, শিশিরের ফোন। সবাই খেতে যাবে। দশ মিনিটের মধ্যে নামতে হবে। আমি ঘড়ি দেখলাম। সাড়ে তিনটার মতো বাজে। না লাঞ্চ, না ডিনারের সময়! নামাজ পড়ে দশ মিনিটের মধ্যেই নামলাম।


পেটে ক্ষিদে নেই। কিন্তু রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করতে সময় লাগলো প্রায় ২০ মিনিট। গোটা সময়টাই হাঁটার ওপর। খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর তা টেবিলে আসতে লাগল আরও ২০ মিনিট। ততক্ষণে মোটামুটি চীনা নিয়মে ডিনারের সময় হয়ে গেছে। আমার পেটেও ইঁদুর দৌঁড়াতে শুরু করেছে। খাবার ভাল লাগল। বিশেষ করে মাছের ঝোল (নাকি স্যুপ?) অসাধারণ লাগল। ভাল লাগাটি ক্ষিদের কারণে, নাকি ভাল হয়েছে বলে, বোঝা গেল না।


খাওয়া শেষে আমাকে অবাক করে দিয়ে থোং ই বলল, ‘তুমি যদি ক্লান্ত না-হয়ে থাক, তবে আমরা সমুদ্র সৈকতে যেতে পারি।’ ক্লান্ত ছিলাম। বিছানায় ঘন্টাখানেক গড়িয়ে নিলে মন্দ হত না। কিন্তু সমুদ্রের কথা শুনে আমি হৈ হৈ করে উঠলাম বাচ্চাদের মতো। আবার জিগায়?! চল চল চল! আমরা রওয়ানা হলাম। আমার মন তখন স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ। এত তাড়াতাড়ি সমুদ্রে যেতে পারব, ভাবিনি। আমরা যা ভাবি না তা-ই হয়, যা ভাবি তা হয় না। ছান ইয়ার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা মনে হল ভালই। বাসস্ট্যান্ডে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েই গাড়ি পাওয়া গেল। সিটও মিলল। কয়েকটা স্টেশান পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছালাম।


গন্তব্য মানে সমুদ্র সৈকত। চীনা ভাষায় সৈকতের এ পয়েন্টটির নাম ‘তা তুং হাই’। ‘তা’ মানে বড়; ‘তুং’ মানে পূর্ব; এবং ‘হাই’ মানে সমুদ্র। ছান ইয়ায় সমুদ্র সৈকতের একাধিক পয়েন্ট আছে। পরে আরেকটি পয়েন্টে আমরা গিয়েছিলাম। সে পয়েন্টের নাম ‘ইয়া লোং ওয়ান’। ‘ইয়া’ মানে এশিয়া; ‘লোং’ মানে ড্রাগন; এবং ‘ওয়ান’ মানে উপসাগর।


বলা বাহুল্য, ‘তা তুং হাই’-এ প্রথমদিন দাঁড়িয়ে যতটা আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম, পরে ‘ইয়া লোং ওয়ান’-এ গিয়ে ততটা আপ্লুত হইনি। প্রেমিকার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হলে প্রেমিকের মন প্রথমদিন যতটা আপ্লুত হয়, দ্বিতীয় দিন ঠিক ততটা আপ্লুত না-ও হতে পারে।


‘তা তুং হাই’ সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে মন আমার সত্যি সত্যি অভিভূত আর পাগল পাগল হয়ে গেল। সুন্দরেরও তো একটা সীমা থাকা উচিত! এ সৌন্দর্যের যেন কোনা সীমা নেই। সমুদ্র এমনিতেই আমার কাছে অপরূপা সুন্দরী। ছান ইয়ার সুন্দরী আবার নীল নয়না। কক্সবাজারের সমুদ্রের জল ঘোলা। ছান ইয়ার সমুদ্রের বুক নীল। কখনও কখনও মনে হয় সবুজাভ। দুই রঙেই সে অপরূপা! শুধু কি তাই? সৈকতে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে সমুদ্র, ডানে তাকালে সবুজ পাহাড়, বামে তাকালে সবুজ পাহাড়। দৃষ্টিটাকে একটু খাটো করে আনলে মনে হবে দুই পাহাড়ের মাঝখানে এক চিলতে সমুদ্র! স্যান্ডউইচ!! এ সৌন্দর্য চোখে না-দেখলে বিশ্বাস হয় না, হবার কথা নয়।


মন্ত্রমুগ্ধের মতো একবার সমুদ্রের বিপুল জলরাশির দিকে তাকাই, পরক্ষণেই তাকাই আকাশে হেলান দেওয়া ওই সবুজ পাহাড়ের দিকে। এ ভালো লাগার তুলনা নেই, এই অনুভূতির কোনো তল নেই! শিশির মনে হয় আমার মনের কথা খানিকটি আঁচ করতে পারলো। সে বলল, ‘আমার কাছে সমুদ্রের চেয়ে পাহাড় বেশি ভাল লাগে।’ আমি বলি, পাহাড় আর সমুদ্রের এই পাশাপাশি বসবাস আমি ভালবাসি। আমি একসময় সৈকতের বালুতে বসে পড়লাম। অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছি চারপাশের অনিন্দ্য সৌন্দর্যের দিকে। একসময় সন্ধ্যা নামল। ওরা চারজন উঠে দাঁড়ালো। আমি বললাম, ‘আরেকটু না হয় বসি।’(ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)


কেবি

Print