চাপ ছাড়া নির্বাচন দেবে না সরকার: ফখরুল

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
১২ জানুয়ারি, ২০১৬ ১০:৩২:৫২
#

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ে। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৮৯ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।


বিগত চারদলীয় জোট সরকারে প্রথমে কৃষি ও পরে বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দলের ৫ম কাউন্সিলে তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।


প্রশ্ন : সরকারের দুই বছর এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?


মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : নৈতিকভাবে বর্তমান সরকারের কোনো ভিত্তি নেই। তাদের নৈতিক কোনো বৈধতাও নেই। তারা গণবিচ্ছিন্ন। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্রয়ে টিকে আছে। রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এটা দুঃখজনক। আওয়ামী লীগের মতো একটি দলকে র‌্যাব-পুলিশ, বিজিবির সহায়তায় দেশ চালাতে হয়। এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। দু-একটি ফ্লাইওভার দেখিয়ে তারা উন্নয়নের কথা বলছে। কিন্তু উন্নয়ন মানেই গণতন্ত্র নয়। দেশে এখন সত্যিকার অর্থে কোনো গণতন্ত্র নেই। একনায়কতন্ত্র চলছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশেহারা। দেশে কোনো বিনিয়োগ নেই। মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। দিন দিন দেশ গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে। সরকার কোনোভাবেই ভিন্নমত সহ্য করতে পারছে না। সবকিছুই তারা নিজের মতো করে চালাচ্ছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংসের পথে। দলীয়করণ আর অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।


আওয়ামী লীগের মাইন্ডসেটটাই ভিন্ন। তারা ভাবছে দেশের মালিক তারাই। অন্য কারও কোনো অবদান নেই। কথা বলার অধিকার নেই। সবটাই তাদের। এ দৃষ্টিভঙ্গিতেই তারা কাজ করছে। যেখানে গণতন্ত্র থাকে না, সেখানে উগ্র ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আজ আমাদের দেশ সেদিকেই যাচ্ছে।


প্রশ্ন : একদিকে সরকারকে অবৈধ বলছেন, আরেকদিকে তাদের অধীনেই দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনে গেলেন। বিষয়টি দ্বৈতনীতি নয় কি?


মির্জা ফখরুল : দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে আমরা পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। প্রথমত. আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বরাবরই অংশ নিয়েছি। এবারও নিয়েছি। কারণ, স্থানীয় নির্বাচনে সরকারের পরিবর্তন হয় না। আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা প্রমাণ করার জন্যই অবৈধ সরকারের অধীনে নির্বাচনে গিয়েছি। পৌর নির্বাচনে তাদের স্বরূপ দেশে-বিদেশে উন্মোচিত হয়েছে।


দ্বিতীয়ত. বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমাদের সমসময় নির্বাচনের মধ্যেই থাকতে হয়। নির্বাচনের বাইরে গেলে বিএনপি কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। নির্বাচনে থাকলে জনগণের কাছে পৌঁছার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে স্বৈরতন্ত্র চলছে। তাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কার্যক্রম করতে পারিনি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জনগণের কাছে যেতে পেরেছি। এদিক থেকে আমি মনে করি নির্বাচনে গিয়ে আমাদের লাভই হয়েছে।


প্রশ্ন : তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল?


মির্জা ফখরুল : অবশ্যই না। কারণ দেশে সেই সময় যে পরিস্থিতি ছিল তাতে কেবল বিএনপি নয়, সিপিবি, বাসদ, বিকল্প ধারাসহ বহু রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া এ দেশে চালু হয়েছিল, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তা বাতিল করে দেয়। এ অবস্থায় দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে সব শ্রেণীর মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই সেদিন বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। আমি মনে করি, দেশের জনগণও ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। এ কারণে ৫ শতাংশ মানুষও সেদিন ভোট দিতে যায়নি। ফলে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ভুল করেছে, এটা বলা ঠিক হবে না।


বিগত পৌরসভা নির্বাচনে যেভাবে ভোট ডাকাতি করেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গেলে ঠিক এরকমই হতো। কারণ নির্বাচন কমিশন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কারচুপি আর অনিয়মের আশংকায় আমরা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাইনি।


প্রশ্ন : নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে আসলে কী আলোচনা হয়েছিল?


মির্জা ফখরুল : ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতারা সেদিন বলেছিলেন, কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তাদের নির্বাচন করতে হচ্ছে। দশম নির্বাচনটা হয়ে যাক; এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন একটি নির্বাচন করব- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু এরপর তারা আর কোনো আলোচনা করেননি। বরং উল্টো বলতে শুরু করেছেন আলাপ-আলোচনার নাকি এখন আর প্রয়োজনই নেই। আর বৈঠকে তারা নাকি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।


প্রশ্ন : ওই আলোচনার কোনো লিখিত ডকুমেন্টস আছে কি?


মির্জা ফখরুল : ওই সময় সিদ্ধান্তই হয়েছিল, আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে। কোনোভাবেই তা বাইরে প্রকাশ করা হবে না। এ ধরনের সমঝোতা ও সিদ্ধান্ত তারানকোর উপস্থিতিতেই হয়েছিল। লিখিত কোনো ডকুমেন্টস ছিল না।


প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে যাবেন কি?


মির্জা ফখরুল : এক কথায় এটি বলা সম্ভব নয়। কারণ এ সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নেই দেশে আজকের এ অবস্থা। তাছাড়া এরই মধ্যে তার অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে আসলে সরকার কী চায়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও গোপন নয়। তারপরও বলব, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের মাধ্যমে ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আমরা ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাসী। তবে সবার আগে অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করে একটি সমঝোতায় আসতে হবে।


প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি জনসভার অনুমতি দেয়া ইতিবাচক রাজনীতির ইঙ্গিত বলে মনে করছেন কি?


মির্জা ফখরুল : হ্যাঁ, একটা ব্যাপার তো আছে। সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সবসময় সরকার একটা নৈতিক সংকটের মধ্যে আছে, টেনশনে থাকে। তাই তারা এবার মনে করেছে যে, বিএনপি এমন কোনো কর্মসূচি দেবে না যা তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সেটা একটা কারণ ছিল। আরেকটা কারণ, সরকারের ওপর দেশী-বিদেশী চাপ। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার স্পেস দেয়ার চাপ ছিল।


প্রশ্ন : সংকট নিরসনে নেপথ্যে কোনো সংলাপ হচ্ছে কি?


মির্জা ফখরুল : আমরা সংকট নিরসনে বারবার সংলাপ-সমঝোতার কথা বলে আসছি। সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। জনসভার অনুমতি দেয়া নিঃসন্দেহে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে আমার জানামতে, নেপথ্যে এখনও কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। প্রকাশ্যে হোক বা নেপথ্যে হোক, সংলাপ দরকার।


প্রশ্ন : ২০১৯ সালের আগে সরকার জাতীয় নির্বাচন দেবে বলে মনে করেন কি?


মির্জা ফখরুল : আসলে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। আগাম নির্বাচন দেয়ার জন্য দেশী-বিদেশী চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে সরকার সে ধরনের চিন্তা করতে পারে। না হলে তারা কেন নির্বাচন দেবে। কোনোদিনই দেবে না। এখন থেকেই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করা দরকার। সরকারের উচিত হবে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন করা। কারণ, সরকারেরও বৈধতা বা আস্থাহীনতার অভাব রয়েছে।


প্রশ্ন: তাহলে চাপ সৃষ্টির জন্য কি আবারও রাজপথে নামবেন?


মির্জা ফখরুল : গণতান্ত্রিক পন্থায় আমরা অতীতেও রাজপথে আন্দোলন করেছি। ভবিষ্যতেও সেরকম আন্দোলন থাকতেই পারে। কারণ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।


প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে দুটি আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। আপনি কী মনে করেন?


মির্জা ফখরুল : আন্দোলনে বিএনপি হয়তো চূড়ান্ত সফলতা পায়নি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। চূড়ান্ত সফলতা না আসায় হয়তো কেউ কেউ এ জন্য বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করছেন। কিন্তু সবার মনে রাখা উচিত ওই সময় দেশে কী ঘটেছিল। গণতান্ত্রিক সব পথ ওই সময় রুদ্ধ করা হয়েছে। আর বাস্তব অবস্থা হল, ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে নজিরবিহীন আন্দোলন হয়েছে, যা স্বাধীনতার পর কখনও হয়নি। ঢাকার বাইরে সারা দেশ ওই সময় অচল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সরকারের দমনপীড়ন, হামলা-মামলা ওই সময় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিএনপির তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট কায়দায় সরকার সবকিছু দমন করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কেউ বিশ্বাসই করত না নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া দরকার। যুক্তরাজ্যের সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি নির্দলীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। এটি আমাদের আন্দোলনের সফলতার একটি অংশ।


প্রশ্ন : আন্দোলন সফল না হওয়ার জন্য অতিমাত্রায় বিদেশী কূটনীতিক নির্ভরতার অভিযোগ রয়েছে।


মির্জা ফখরুল : এটা বিএনপির বিরুদ্ধে একটা অপপ্রচার। কূটনীতিকদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার প্রশ্নই ওঠে না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অতীতে বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, এমনকি জাতিসংঘ ভূমিকা রেখেছে। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে তাদের সঙ্গে আমাদের সবসময় যোগাযোগটা রাখতেই হয়। তাদের বিষয়গুলো অবহিত করতে হয়। কিন্তু তাদের ওপর নির্ভর করে তো আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না।


প্রশ্ন: ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা আছে। দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কোনো বিশেষ উদ্যোগ আছে কি?


মির্জা ফখরুল : ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের দূরত্ব যতটা না, তার চেয়ে বেশি প্রপাগান্ডা। বিএনপি ভারতবিরোধী এমন একটা তকমা লাগানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। ভারতের সঙ্গে এখন বিএনপির দূরত্ব আছে বলে মনে করি না। কারণ, ভারত চায় বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের উন্নয়ন হোক, বিএনপির চাওয়াও তাই। বিজেপি সরকারে আসার পর বিএনপির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।


প্রশ্ন: জোটে টানাপড়েন ও ভাঙন সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?


মির্জা ফখরুল : প্রথমত. জোট ভাঙতে সরকার অনেক আগে থেকে চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্যজনক, আওয়ামী লীগের মতো এত বড় ও পুরনো দল, যারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে, তারা সামরিক সরকারের মতো দল বা জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে। এর আগেও তারা কয়েক দফা চেষ্টা করেছে। শওকত হোসেন নীলুকে জোট থেকে বের করে নিয়েছে। তবে নীলু চলে গেলেও তার দল যায়নি। এবার ইসলামী ঐক্যজোটের কয়েকজন নেতা গেছেন, কিন্তু তাদের দল আমাদের সঙ্গে আছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অতীতেও আমরা এমনটা দেখেছি। বিরোধী দলে থাকলে হালুয়া-রুটি একটু কম থাকে। সম্ভাবনা থাকে না। যারা হালুয়া-রুটি খেতে চান এবং সেজন্য জোটে আসেন, তারা হতাশ হয়ে যেখানে হালুয়া-রুটি আছে সেদিকে চলে যান।


প্রশ্ন : জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারেও নানামুখী চাপ আছে। এ ব্যাপারে আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কি?


মির্জা ফখরুল : জামায়াত ছেড়ে দিতে আমাদের কাছে কোনো চাপ নেই। এটা সরকারি লোকেরা বলে। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আদর্শগত কোনো জোট হয়নি। তারা আলাদা দল, আমরা আলাদা। এটা নির্বাচন ও আন্দোলনের জোট। আওয়ামী লীগও একসময় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে।


প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও এ সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আপনাদের দলের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।


মির্জা ফখরুল : এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বহুবার বলেছি। বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না বা তারা এ ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে কাজ করছে এমনটা বলে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিত অপপ্রচার করছে। এটা টোটালি ফলস অ্যান্ড লাই। আমরা সবসময় বলে এসেছি, আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চাই; কিন্তু সেই বিচার হতে হবে সম্পূর্ণভাবে স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক মানের এবং কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া।


প্রশ্ন : স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে কি?


মির্জা ফখরুল : দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের ভয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বাইরে বের হতে পারছে না। তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ে কাউন্সিল বা সভা ডাকা যাচ্ছে না। এরপর পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পৌর নির্বাচন শেষ হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবে। আর দ্রুত জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে।


প্রশ্ন : যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনতে তৃণমূলের দাবির প্রতি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?


মির্জা ফখরুল : তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হবে। বিগত আন্দোলনে যারা রাজপথে ছিলেন তাদেরই মূল্যায়ন করা হবে। বিএনপির মতো বড় দলে সমস্যা কমবেশি থাকবেই। পুরোপুরি মসৃণ সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ পারেনি।


প্রশ্ন : দীর্ঘদিনেও আপনাকে ভারমুক্ত না করার কারণ কী মনে করেন? দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সবুজ সংকেত নেই বলে গুঞ্জন আছে।


মির্জা ফখরুল : এটা দলের ব্যাপার। আর আমাদের যে গঠনতন্ত্র আছে তাতে মহাসচিব নির্বাচিত হন কাউন্সিলের মাধ্যমে। কাউন্সিল হলেই এ সমস্যার সমাধান হবে। আমাকে মহাসচিব করতে হবে এর কোনো মানে নেই। দল যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই নির্বাচিত করবে। এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ঠিক নয়। আমাদের দলে সমন্বয় আছে। দলের চেয়ারপারসন, সিনিয়ির ভাইস চেয়ারম্যানসহ সিনিয়র নেতাদের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে।


প্রশ্ন : বলা হয়, বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল- আপনারও কি তাই মনে হয়?


মির্জা ফখরুল : বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এটা ঠিক নয়। আমাদের সংগঠন শক্তিশালী। সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গণমাধ্যমকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন করুক। তখন দেখা যাবে বিএনপির জনভিত্তি আছে কি-না। মজার ব্যাপার দেখেন, সরকার এত দুর্নীতি করছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করছে, যা ইচ্ছা তাই করছে- সে ব্যাপারে গণমাধ্যম চুপ। তারা শুধু আছে বিএনপির কোথায় খুঁত রয়েছে তা খুঁজে বের করতে। এটা দুঃখজনক। বিএনপি যে প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সেটাকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। অতীতেও বিএনপি প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে টিকে রয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুদক্ষ নেতৃত্ব এবং নেতাকর্মীদের দলের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের কারণে।


প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ


মির্জা ফখরুল : ধন্যবাদ আপনাকেও।


সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।


এআই

Print