বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নতুন মেরুকরণ, সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

মো: কামরুজ্জামান [বাবলু]
টাইম নিউজ বিডি,
০৩ জানুয়ারি, ২০১৭ ০৯:১৪:৩৬
#

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ ও যুবকদের জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার পর এবার নারীদের নতুনরুপে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার ঘটনায় টনক নড়েছে বাংলাদেশ সরকারের। বিশেষ করে দেশে প্রথমবারের মতো নারী আত্মঘাতি হামলার ঘটনায় নতুন শঙ্কায় পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং জঙ্গিদের আসল মদদদাতাদের খুঁজে বের না করা পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।


তবে, এই সমস্ত ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে সরকারের সর্বোচ্চ মহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে একাধিকবার দাবি করা হয়েছে। এখনো সরকারের সব মহল একই দাবিতে অনঢ় রয়েছেন। অবশ্য, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে বিচ্ছিন্নভাবে যে একেবারেই কারো সম্পৃক্ততা নেই সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউই।


প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আইএসের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জঙ্গি সন্দেহে ও বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় এ পর্যন্ত যাদেরকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে এবং নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই কাজটি করছেন।


ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগার সূত্রে আরো জানা যায়, জঙ্গিবাদের অভিযোগে যারা কারাগারে আছে, তাদেরকে অন্য কয়েদীদের থেকে একেবারে আলাদা রাখা হচ্ছে। কারা নিরাপত্তা রক্ষীসহ সবাই তাদেরকে সমীহ করে চলেন। তাদের যে কোন দাবি যথাসম্ভব দ্রুত বাস্তবায়ন করে থাকে কারা কর্তৃপক্ষ। তাদেরকে কোনভাবেই উত্যক্ত করতে চায় না কেউ।


এদিকে, পরিচয় গোপণ করার স্বার্থে পুলিশের এক সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত যে কোন আসামীকে আটক বা গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে নিয়ে অথবা আদালতে তোলার আগেই তথ্যের জন্য পুলিশ হেফাজতে যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাতে তেমন একটা রাখ-ঢাক থাকে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বা সদস্যরা সরাসরি কথা বলে থাকেন আটককৃতদের সাথে। কিন্তু জঙ্গিবাদের অভিযোগে যাদেরকে বিভিন্ন সময়ে আটক করা হয়েছে বা হচ্ছে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাস্ক পড়ে আসেন। তারা কেউই অভিযুক্ত জঙ্গিদের সামনে খোলামুখে আসেন না।


এমনটি কেন করা হয়- জানতে চাইল ওই সূত্র জানায়, জঙ্গিরা দিনে দিনে যেভাবে আত্মঘাতি ও ভয়ানক হয়ে উঠছে এবং বাইরে এদের নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। তাই কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। কারণ সবারই পরিবার-পরিজন রয়েছে, গ্রামের বাড়িতে নিকটাত্মীয়রা থাকেন।


সবশেষ নারী আত্মঘাতি হামলার ঘটনা ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্যকে নিজ বাসায় সিনেমাটিক স্টাইলে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সতর্কতা আরো বেড়েছে বলেও সূত্র জানায়। জঙ্গিদের নির্মূলে পুলিশের তৎপরতা যেমন বাড়ছে তেমনি নিজেদের নিরাপত্তার চিন্তাও বেড়েছে। তবে, পুলিশের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য তথ্য-প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।


এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কি বা জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন কিভাবে সম্ভব-এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, সবার আগে জরুরী জঙ্গিদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করা। এদেরকে কারা উৎসাহ দিচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। কাদের দ্বারা এভাবে প্রভাবিত হয়ে এরা নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, সেই মাস্টারমাইন্ড কারা, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। কি এমন কথা তাদেরকে শুনানো হয়েছে যা শুনে তারা মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত নিচ্ছে তা বের করতে হবে। অন্যথায় জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।


সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাহফুজ উল্লাহ বলেন, দেশে যখন স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে না এবং মানুষের বাক স্বাধীনতা খর্ব করা হয় তখন এরকম নানা শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তাই মানুষকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, দেশে কার্যকর গণতন্ত্র ফিরি্য়ে আনতে হবে।


পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক অবশ্য সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা ও নাশকতার বিভিন্ন ঘটনায় নব্য জেএমবি জড়িত বলে মনে করছেন। আর এদের মূলোৎপাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। দেশের সর্বস্তরের মানুষকেও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে বলেও মন্তব্য তার। তবে, বাংলাদেশে কোন আইএস নেই বলে আবারো জোরের সাথে জানান পুলিশের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা।  


উল্লেখ্য, গতবছরের (২০১৬) ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরায় জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে। তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের জিম্মি উদ্ধার অভিযানে ছয় জঙ্গির সবাই নিহত হন। রেস্তোরাঁর আটক আরেক কর্মী জাকির হোসেন পরে হাসপাতালে মারা যান।


পরবর্তীতে 'হামলাকারীদের' ছবি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’। পুলিশের দেয়া তথ্যে দেখা যায়, হামলাকারী জঙ্গিদের প্রত্যেকের বয়স ২২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। হামলাকারীদের অধিকাংশই দেশের নামী-দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নিব্রাস ইসলাম নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র, মীর সাবিহ মুবাশ্বের স্কলাসটিকার ছাত্র এবং রোহান ইমতিয়াজ স্কলাসটিকার সাবেক ছাত্র।


গত ২৫ ডিসেম্বর (২০১৬) রাজধানী ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই দক্ষিণখান থানার আশকোনায় এক জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানকালে আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এক নারী। শাকিরা নামের ওই নারী তাৎক্ষণিক মারা যায় এবং তার সাথে থাকা চার বছরের শিশু সাবিনাকে মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাংলাদেশে কোন নারীর আত্মঘাতি হামলার ঘটনা এটাই প্রথম।


সবশেষ গত বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর যখন সবাই নতুন বছরের আগমন উৎসব নিয়ে ব্যস্ত তখন গাইবান্ধা-১ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই হত্যাকাণ্ডের জন্য চরমপন্থীদের দায়ী করেন। অপরদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এটাকে সন্ত্রাসবাদের নতুন মাত্রা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।


এছাড়াও রাজধানীর কলাবাগানে জাহাজবাড়ি হিসেবে খ্যাত এক ভবনে জঙ্গি-বিরোধী পুলিশি অভিযানে নয় জঙ্গির মৃত্যু, নারায়নগঞ্জে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে অন্যতম শীর্ষজঙ্গি তামিম চৌধুরী নিহত, মিরপুরে অভিযানে জঙ্গি মেজর মুরাদ নিহত, বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা করে মুয়াজ্জিনকে হত্যা এবং জাপানি ও চীনা নাগরিকসহ কয়েকজন বিদেশীকে হত্যাসহ নানা ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট)-এর উপস্থিতির প্রসঙ্গটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহির্বিশ্বের চাপও বাড়তে থাকে সরকারের ওপর।


কেবি

Print