প্রত্যাশার প্রাপ্তি হউক ছিটমহলবাসীর

এম এন জোবাইর
টাইম নিউজ বিডি,
১০ জানুয়ারি, ২০১৭ ১২:৫৩:১৬
#

২০১৫ সালের ১লা আগষ্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময়ের পর থেকে বাংলাদেশ ভূখন্ডে একীভূত অংশে দিন দিন উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে চলছে। আর অবসান হয় এখানকার অধিবাসীদের ৪৪ বছরের অপেক্ষার। যার ফলে এসব বিলুপ্ত ছিটমহলের হাজার হাজার অধিবাসীর মধ্যে আস্থার ভাব সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে ভোগ করছেন সূফলও।


পঞ্চগড়ে অন্তর্ভুক্ত ৩৬টি ছিটমহলে জনসংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৮৬৭ জন। এই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো এখন বাংলাদেশের অংশ। এখন অনেকটা বদলে গেছে এখানকার ছিটমহলের চিত্র। কয়েকটি পুরুনো ছিটমহলের নাম বদলে নতুন নামও দেয়া হয়েছে। পুটিমারী ছিটমহল এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম নগর এবং গাড়াতি ছিটমহলের নাম দেয়া হয়েছে রাজমহল।


ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সবখানেই কিছু না কিছু সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। মৌলিক অধিকারের স্বাদ পেয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলের হাজারো নতুন বাংলাদেশি। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হল পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিদের বাসস্থান। স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সেলাই মেশিন, টিউবওয়েলসহ সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পেয়েছে নতুন বাংলাদেশিরা।


Right 2.


                                                                                      ছবি: ডা. এম এইচ শুভ


কথা হয় পঞ্চগড়ের কাজলদিঘি ছিটমহলের দিনবাজার এলাকার সিরাজুল ইসলাম (৩৩) এর সাথে। তিনি জানালেন, এক সময় যোগাযোগের যেই প্রধান মাধ্যম রাস্তাঘাটের অবস্থা ছিল বেহাল। আর ছিটমহল বিনিময়ের পর থেকে এসব রাস্তাঘাট দিন দিন অনেক উন্নত হচ্ছে। কোন মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন কার্ড নিয়ে প্রতিনিয়ত পড়তে হত বিড়ম্বনায়। এখন সেটা বলা যায় অনেকটা পরিত্রানের পথে।


তিনি আরো জানান, কোন ধরনের চাকরীতে আবেদন করতে গেলে সেটা ছিটের বাসীন্দা হবার কারণে প্রায় বাতিল হয়ে যেত। আর এসব ছিটে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হত, বিচারের ব্যবস্থা না থাকার কারণে শক্তিবলে অনেকেই অনেক বড় অন্যায় করেও পার পেয়ে যেত। আইন হবার কারণে এখন আর সেই অন্যায়ের সুযোগ পায়না অপরাধীরা।


Right 3


                                                                                       ছবি: ডা. এম এইচ শুভ


একই এলাকার লাইলা আক্তার (২৬) নামে এক গৃহবধূ জানান, এক সময় বিদ্যুতের আলো ছিল আমাদের কাছে স্বপ্নের মতই। এখন প্রায় প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ চলে আসায় সেই স্বপ্ন আর স্বপ্ন নেই। এখন বিদ্যুতের আলোর মাধ্যমে সংসারের অনেক কাজ আমরা রাতেও সমাধান করতে পারি।


স্কুলের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে তিনি জানালেন, ছিটের বাসীন্দা হবার কারণে বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করতে গেলে পোহাতে হত নানা ভোগান্তি। আবার কোনরকম কষ্টে ভর্তি করালেও স্কুল থেকে কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা বা উপবৃত্তি দেয়া হতনা। সেই সাথে বইয়ের টাকা দিতে হত তাদের।


তিনি আরো জানালেন, এক সময় যেখানে স্কুল ছিলনা সেখানে উপবৃত্তির প্রশ্নয় আসেনা। আর এখন বাচ্চাদের পড়ার জন্য আমরা স্কুল পেয়েছি। তার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে দেয়া হচ্ছে উপবৃত্তি। আরো আনন্দের বিষয়, এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনবোধে দেয়া হচ্ছে সাইকেল। যাতে করে তাদের মাঝে স্কুলে যাবার আগ্রহটা পায়।


Right4


                                                                                       ছবি: ডা. এম এইচ শুভ


সুজন ইসলাম (১৮) নামে একজন জানায়, ছিটের বাসীন্দা হবার কারণে অন্যের কাছে ব্যক্তি মর্যাদা বলতে কিছুই ছিলনা তাদের। কিন্তু এখন সেই অমর্যাদার বিলুপ্তি ঘটেছে একমাত্র ছিটমহল বিনিময়ের কারনেই।


স্বাস্থ্য সেবা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও এখানকার বাসীন্দারা এক সময় এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে এখন সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে হাসপাতাল আর স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করায় স্বাস্থ্য সেবার বিশেষ এই মৌলিক অধিকার অর্জন করার খুব সন্নিকটে এখানকার বাসীন্দারা।


পঞ্চাষোর্ধ এই এলাকার এক বৃদ্ধ জানালেন, এখানকার অসচ্ছল প্রায় প্রতিটি পরিবারকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও সরকারের উদ্যোগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেয়া হচ্ছে অনেক পরিবারকে। পাশাপাশি তালিকাভূক্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে মাসে ৪শ’ টাকা হিসেব করে বছরে ৪ হাজার ৮শ’ টাকা বয়স্ক ভাতা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে এসব ছিটমহলে বিধবা ভাতাও চালু করেছে সরকার।


যদিও এসব প্রাপ্তির মাঝেও এখনো জীবন চলার আরো অনেক প্রয়োজনীয় চাহিদার অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। এই নতুন বাংলাদেশীদের প্রত্যাশা, সরকার যদি সঠিক সময়ে তাদের প্রয়োজনে সাড়া দেন তাহলে তারাও সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অংশীদার হবার পাশাপাশি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে এই দেশে।


বি: দ্র: এখানে ছিটমহল বলতে সাবেক ছিটমহগুলোকে বুঝানো হয়েছে।


এমএনজে

Print