বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা ও চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন করতে হবেঃ সাক্ষাতকারে ড. মাইমুল আহসান খান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

টাইম ডেস্ক
টাইম নিউজ বিডি,
১৮ জানুয়ারি, ২০১৭ ১১:১৩:০৯
#

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতিত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের শরণার্থীর মর্যাদা প্রদান, নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে তাদেরকে আশ্রয় দান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোরালো ভূমিকা রাখার ওপর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রশ্নটি জড়িত বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. মাইমুল আহসান খান। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং চাপ মোকাবেলার সাহস রাখতে হবে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জুরিসপ্রুডেন্স ও ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল ল-এর এই অধ্যাপক ‘দি সাউথ এশিয়ান মনিটর’-কে (http://www.southasianmonitor.com) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন। ফুলব্রাইট ফেলো (Fulbright Fellow) অধ্যাপক ড. মাইমুল আহসান খান জুরিসপ্রুডেন্স, ইসলামিক আইন, মানবাধিকার, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের লিবারেক ইউনিভার্সিটিসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের নানা দিক নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন ড. খান। ঢাকা থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কামরুজ্জামান বাবলু।


মনিটর: মিয়ানমারের সেনা ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হাতে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনেকেই আশ্রয়ের জন্য মুসলিম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসেন। কিন্তু তাদেরকে শরণার্থীর মর্যাদা প্রদান কিংবা নিজ ভূখন্ডে আশ্রয় দিতে রাজি নয় বাংলাদেশ। সীমান্ত থেকেই অনেককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এমনই পটভূমিতে কেউ বলছেন বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া উচিত, আবার কেউ বলছেন আশ্রয় না দেয়াটাই বাংলাদেশের জন্য ভালো। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?


খান: প্রথম কথা হচ্ছে, আপনাকে আমি আশ্রয় দিতে পারলাম না, এতে কি আপনার একার ক্ষতি হলো নাকি আমি যে আশ্রয় দিতে পারলাম না তাতে আমারও বিরাট ক্ষতি হলো? বিষয়টি এভাবে দেখতে হবে। আপনাকে ১০ জন লোক আমার বাড়ির সামনে পিটিয়ে মারছে, আর সেই মুহূর্তে আমি আপনাকে আমার ঘরে আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করতে পারলাম না। আমার এই অক্ষমতা কি প্রমাণ করে না যে কালকে আমার ওপর যখন এমনটা করা হবে তখন অন্যরাও কেউ এগিয়ে আসবেন না? এখানে উচিত অনুচিতের বিষয়টি বড় নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বা ইন্টারন্যাশনাল ল’ তে উচিত অনুচিতের চেয়ে বড় হলো কী করা সম্ভব, আর কী করা সম্ভব নয়, কে কী করতে চায় এবং কী করতে চায় না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কথায় আছে Winners have thousands mothers and losers have none. অর্থাৎ ‘বিজেতাদের জন্য রয়েছেন হাজারো মা, পরাজিতদের জন্য নেই কেউ’। এটাই সব ক্ষেত্রের এক নির্মম বাস্তবতা।


মনিটর: তার মানে-উদ্বাস্তু হয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে আশ্রয় দিতে না পারা ও শরণার্থীর মর্যাদা না দেয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে দুর্বল বা অক্ষম দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে?


খান: এটাই প্রমাণিত হলো যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে অনেক দুর্বল। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখনো বুঝে না। গত ৪০ বছর ধরে এই ইস্যুকে বাংলাদেশ কখনো বোঝা হিসেবে, কখনো সমস্যা হিসেবে নিয়েছে। বিষয়টি বার বার আমাদের কাঁধে উঠছে অথচ আমরা প্রতিবেশী কাউকে প্রভাবিত করতে পারছি না, আন্তর্জাতিক কোন সম্প্রদায়কেও সাথে নিতে পারছি না, আর কোন সমস্যারই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারছি না। তার মানে হচ্ছে – রাষ্ট্র শক্তি হিসেবে আমাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত।


অনেক সময় বলা হয়, আমরা এটাতে সাইন করিনি, ওটাতে সাইন করিনি, সেজন্য আমাদের দায়িত্ব বর্তায় না। এগুলো একেবারেই মূর্খের কথা ও বালখিল্য কথাবার্তা। আন্তর্জাতিক ল’তে কে কোনটাতে সাইন করলো, আর কে কোনটাতে সাইন করলো না – এটা দিয়েই যদি সব হতো তাহলে পৃথিবীব্যাপী এত যুদ্ধবিগ্রহও হতো না, আবার এতো যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধও হতো না। নিয়ম ভঙ্গ করেই যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ হয়, আবার নিয়ম ভঙ্গ করেই যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়। কোন যুদ্ধটা নিয়ম মেনে শুরু হয়েছে?


মনিটর: রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কোন কার্যকর ভূমিকা রাখুক কিংবা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার সক্ষমতা বহির্বিশ্বকে দেখাক- সেটা এশিয়ার অপরাপর বড় শক্তিধর দেশ বিশেষ করে ভারত কতটা ইতিবাচকভাবে নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?


খান: ভারত বাংলাদেশের কেন ভালো চাইবে? এতে ভারতের লাভ কী? আপনাকে রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে বুঝতে হবে আরেকটা নতুন সত্তা সৃষ্টি হয়েছে। এখন এটা শত্রু-মিত্র ঠিক করে নেবে নিজের স্বার্থে। আন্তর্জাতিক বলয়ে বলা হয়, এখানে চিরস্থায়ী কোন শত্রুও নেই এবং চিরস্থায়ী কোন বন্ধুও নেই। আপনি কোন ইস্যুতে কাকে বন্ধু বানাতে পারবেন, আর কোন ইস্যুতে কাকে শত্রু বানিয়ে ফেলবেন সেটা আপনার ওপর নির্ভর করে।


চীন আমাদের এখন খুব বন্ধু হতে চাইছে, অথচ এই চীনই তো আমাদের সাথে সবচেয়ে বড় শত্রুতা করেছিল ১৯৭১ সালে। কাজেই আন্তর্জাতিক বলয়ে সক্ষমতার বিষয়টি অনেক বড়। এটা শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটা কূটনীতিরও একটা বিরাট বিষয়।


মনিটর: বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত ও চীনের অবস্থান কি তাহলে অভিন্ন? উভয় দেশই কি তাদের নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে?


খান: প্রথমে দেখুন চীনের উত্থান। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে সেই সময়ের চাইনিজ প্রেসিডেন্ট বলতো আমরা কখনোই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দি¦ হবো না। আমরা তো আমেরিকার অর্থনীতির মাত্র এক-দশমাংশ বা দশভাগের একভাগ। আর জাপান হচ্ছে আমেরিকার অর্থনীতির অর্ধেক। ভবিষ্যতে আমাদের যদি কম্পিটিশন হয় তাহলে খুব বেশি হলে তা জাপানের সাথে হলেও হতে পারে। মাত্র ১০-১২ বছর আগে আমি নিজেই পড়িয়েছি Law and economic development in China and India। তখন আমেরিকার এক প্রফেসর আমাকে খুব কটাক্ষ করেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন – আপনি চীন ও ভারতকে এক সাথে তুলনা করছেন কেন? চীনের তো কোন ভবিষ্যৎই নেই। ভারতের সামনে রয়েছে বিরাট ভবিষ্যৎ। চীনের মানুষ তো ক্ষুধা আর রোগ-শোকে মারা পড়বে। পঞ্চাশের দশকে চীনে বিপ্লবের আগে সেখানে যে দুর্ভিক্ষাবস্থা ছিল সেই অবস্থার মধ্যে আবারো নিপতিত হতে যাচ্ছে দেশটি। চীনের উত্থানের কথা বলে আপনি তো বোকামি করছেন। বেশকিছু আমেরিকান শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের উপস্থিতিতে তিনি আমাকে এই কথাগুলো বলে তুচ্ছ জ্ঞান করছিলেন। আমেরিকার সব ভাবনা ভুল প্রমাণ করে চীন সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে এবং বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। সবাই নিজ নিজ জায়গায় থেকে তার স্বার্থ দেখবে এটাই তো স্বাভাবিক।


মনিটর: ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, রেলওয়ে ও বিদ্যুতখাতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সেক্টরে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ২৬টি ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


খান: আপনি এই ২৪ বা ২৫ বিলিয়ন ডলারকে এত বড় করে দেখছেন কেন? চীনের সাথে এশিয়া ও ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত আনতে চীন যে সিল্ক রোড প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে তার বাজেট প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এখন চীন যেই সড়ক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছে তাতে চীনের বিভিন্ন শহরের সাথে সরাসরি লন্ডনের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। চীন বর্হিবিশ্বে প্রতিবছর ১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য রাখে। কাজেই বাংলাদেশের জন্য ২৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ চীনের কাছে কিছুই না। প্রশ্ন হলো-আমরা এই অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা অর্জন করেছি কীনা। আমার মনে হয় এই বিপুল অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য আমরা এখনো একবারে অপ্রস্তুত।


ভারত আমাদের বড় ও সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী এটা ঠিক। কিন্তু নানা কারণে এখন আমাদের চীনকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় দেয়া ভারতের ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সহায়তা চুক্তি ম্লান হয়ে গেছে চীনের কাছে। ভারত ও চীনের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। তাই চীন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে বোঝাতে চাইবে ২ বিলিয়ন ডলার কিছুই না। আমি তোমাকে দিব, কত চাও- ২৪ বিলিয়ন, ৪০ বিলিয়ন, ৬০ বিলিয়ন? এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। চীন ভারতকেও দিচ্ছে ১০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানকে দিয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। প্রকৃত অর্থে এটা আসলে চীনের এক ধরনের বিনিয়োগ যার ফল সে সুদে-আসলে ফেরত পাবে।


মনিটর: চীন কি তাহলে তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চাইছে?


খান: চীনের বর্তমান অর্থনীতি রীতিমতো এক মিরাকল। এক গবেষণায় দেখা গেছে বিগত কয়েক বছরে চীনে সিমেন্ট ও রডসহ এই জাতীয় জিনিস যে পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিগত ১০০ বছরেও আমেরিকায় তা হয়নি। এ থেকেই চীনের উন্নয়ন কাজের ধারণা পাওয়া যায়। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১২৮ কোটি মানুষ রয়েছেন যা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার তিনগুণেরও বেশি। আমেরিকা, কানাডা ও গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলে যে পরিমাণ বিদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করছে তার থেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিচ্ছে চীন একাই। তিন কোটিরও বেশি চীনা নাগরিক বর্তমানে ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে পারছেন। পর্যটন খাতে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন।


মনিটর: চীন ও ভারতের সাথে সমানতালে কৌশলগত সম্পর্ক রেখে এগিয়ে যাওয়ার মতো কূটনৈতিক দক্ষতা বাংলাদেশের আছে কী?


খান: তাত্ত্বিকভাবে হয়তো এটা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এটা অত সহজ নয়। কেননা কূটনৈতিকভাবে আমরা এখনো অতটা সক্ষমতা অর্জন করিনি। অন্যদেরকে কনভিন্স করার মতো কূটনৈতিক শক্তি এখনো আমাদের অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে চীন ও ভারতের ওপর আমাদের প্রভাব এখনো ততটা শক্তিশালী নয়। এক্ষেত্রে আমি আবারো বলতে চাই আমাদের মানব সম্পদের কথা। আমাদের মানব সম্পদই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।


আর ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা করে চলেছে তা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে। এই বাঁধের মাধ্যমে তারা শুধু আমাদেরই ক্ষতি করে নাই, তাদের নিজেদের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেরও ক্ষতি করেছে। আর সে কারণেই এখন ভারতেরই বিভিন্ন স্টেট থেকে এই বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতা আসছে। চীনের যেমন এখন প্রধান সমস্যা পরিবেশ দূষণ, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে ভারতের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে পানি। ভারতের চিন্তা এত অল্প পানি দিয়ে তারা কিভাবে এত লোকের খাদ্য উৎপাদন করবে, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালাবে।


পানি নিয়ে ভারত প্রথম ঝগড়াটা বাঁধিয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে। উজানের পানি বন্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ১৯৬০ সালে চুক্তি হয়েছিল। Indus Water Treaty-শিরোনামে স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি অনুসারে ভারত উজানের পানির ২০ শতাংশের বেশি আটকে রাখতে পারবে না। বাকি ৮০ শতাংশ স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হবে। অন্যথায় নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা এমনকি আরব সাগরের পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এর ফলে গোটা অঞ্চলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা সৃষ্টি দেয়। এরপরও এক পর্যায়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (জওহরলাল নেহরু) ঘোষণা দেন যে এই চুক্তি আর আমাদের পক্ষে মেনে চলা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের আরো পানি দরকার। ওই মুহূর্তে চীন ঘোষণা দিয়ে বসে – চীনের উজান থেকে ভারতে যেসব নদী প্রবাহিত হয়েছে তাতেও বাঁধ দিয়ে পানি আটকিয়ে দেয়া হবে। চীনের এমন ঘোষণায় ভারতের টনক নড়ে। ভারত বুঝতে পারে পাকিস্তানের পানি আটকিয়ে দিলে এর বিনিময়ে তাকে চড়া দাম দিতে হবে।


মনিটর: ফাঁরাক্কা বাঁধসহ বাংলাদেশের উজানে অর্ধশতাধিক নদীতে ভারত বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতিবিদরা দল-মতের উর্ধ্বে উঠে একযোগে তার প্রতিবাদ করতে পারছেন না কেন?


খান: বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ। পলি জমতে জমতে এই দেশের সৃষ্টি। আর এ কারণেই এই দেশকে পলিমাটির দেশ বলা হয়। পলি মাটির মতোই এদেশের মানুষের মানসিকতা। তাদের মধ্যে স্থিরতার খুব অভাব। একবার তারা জীবন-মরণ বাজি রেখে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি করলো, পরক্ষণেই আবার তারা পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেল, অত:পর বাংলাদেশ সৃষ্টি করলো। একবার এদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, পরক্ষণেই আবার ৯০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে সমর্থন করা শুরু করে। জলবায়ু আর পলিমাটির প্রভাবেই হয়তো এখানকার মানুষের মানসিকতা এতো দ্রুত পরিবর্তনশীল।


এবার আসা যাক ভারতের ফারাক্কা বাঁধসহ উজানের পানি আটকানো প্রসঙ্গে। খোদ ভারতীয় দর্শনেই এটা একটা বড় অপরাধ। ভারতের চানক্য আইন ও মানু আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে একজন ব্রাহ্মণ কোন কিছুর ওপরই কৃত্রিম বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে না। সেটা হোক পানি, হোক বাতাস বা অন্য কিছু। যদি কেউ এমনটা করে তাকে বলো সে যেন মন্দিরে না আসে। কারণ সে অপবিত্র। তার মানে হলো পানির প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করলে হিন্দুদের সর্বোচ্চ জাত ব্রাহ্মণ পর্যন্ত অপবিত্র হয়ে যায়। তাই ফারাক্কা বাঁধসহ কোন বাঁধ দেয়ারই অধিকার নেই ভারতের। কিন্তু বাংলাদেশের দ্বিধাবিভক্ত ও সংকীর্ণ রাজনীতিবিদরা এ বিষয়ে ভারতের ওপর কখনই কোন কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে কীনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।


মনিটর: গত নভেম্বর (২০১৬) চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় সংক্রান্ত এক চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষরের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই কড়া। এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?


খান: চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনাসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশের এখন আর না করার উপায় নেই। তাতে ভারতের প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন। বাংলাদেশ যদি আজ বলে আমরা সাবমেরিন কিনবো না, তো কাল চীন বলবে পদ্মা সেতুতে আমরা আর কাজ করবো না। চলমান অন্যান্য প্রকল্পেও আমরা আর কাজ করবো না। বাংলাদেশকে এ সব বিষয় মাথায় রাখতে হবে। চীন বাংলাদেশকে সম্প্রতি যেসব প্রস্তাব দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বুলেট ট্রেন সংযোগ লাইন স্থাপন। এতে করে ঢাকা থেকে যে কেউ চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুনমিং যেতে পারবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে, বড়জোর তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। অথচ আমাদেরকে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতেও তিন ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এটা হলে যে কেউ কম খরচে চীনে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিতে পারবেন। তাদের ভাবনা থাকতে পারে কেন বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন, চীনের হাসপাতালে কেন নয়। চীনের প্রতিদ্বন্দি¦ ভারত, তাই এমনটা ভাবা তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক।


মনিটর: কিন্তু এই ধরনের যে কোন প্রকল্পে ভারতের পক্ষ থেকে যে বাঁধার সৃষ্টি হবে তা উপেক্ষা করা কি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে?


খান: আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ ধরনের বাধায় বেশি কিছু হয় না। আফগানিস্তানের ওপর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু তাতে শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। পরে আমেরিকা এসেও একই ধরনের নানা চাপ সৃষ্টি করছে। এটা আসলে সংশ্লিষ্ট দেশের চলমান বাস্তবতার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। মালয়েশিয়ার কথাই ভাবুন, অনেকেই চাননি মালয়েশিয়া উন্নতি করুক, কিন্তু তাতে আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির মোহাম্মদকে দমিয়ে রাখা যায় নি, আটকানো যায়নি মালয়েশিয়ার উন্নয়নের গতি। বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং চাপ মোকাবেলার সাহস রাখতে হবে।সূত্র : south asian monitor


এআই/এমবি

Print