স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র: সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম আইনি দলিল

অবিভক্ত পাকিস্তান আমলে চব্বিশ বছরের সকল সংগ্রাম ও আন্দোলন মূলত: একটি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর সংবিধানের দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে দুই যুগেও যখন তিন তিনবার একটি কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবিকল্প সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এর মাঝে বিভিন্ন সময়ে জোর তত্পরতাও দেখাতে হয়েছে বাংলার দামালদের। বিশেষ করে ৫২ তে ভাষা আন্দোলন, ৬৬ তে ছয় দফা, ৬৮ তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গণআন্দোলন ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মত আন্দোলন করতে হয়েছে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দাদের।

পরবর্তীতে ২৫ মার্চ কালো রাতে অতর্কিত হামলা হওয়ার পর মুক্তি আন্দোলন ব্যতিত আর কোন পথ খোলা ছিল না।

২৬ মার্চ প্রথম বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। তবে এ ঘোষণা খুব বেশি মানুষের মনে সাড়া জাগাতে পারেনি। ২৭ মার্চ শনিবার ১৯৭১ রাত ৮টায় মেজর জিয়া বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এ ঘোষণার বক্তব্য নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিলে ২৮ মার্চ সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

তাঁর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপাঠটি ছিল নিম্নরুপ: :‘আমি মেজর জিয়া মহান জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। দেশের সর্বত্র পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। প্রিয় দেশবাসী, আপনারাও যে যেখানে আছেন, হাতের কাছে যা কিছু পান তাই নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ইনশাল্লাহ, জয় আমাদের সুনিশ্চিত। সেই সাথে আমরা বিশ্বের সকল মুক্তিকামী দেশ থেকে আন্তরিক সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করছি। জয় বাংলা।’

এর পর থেকে অগোছালোভাবে যুদ্ধ শুরু হয়। ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামের সহযোগিতায় তাজউদ্দীন আহমেদ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করেন।

১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল জারিকৃত মাত্র পাঁচশত দশ শব্দের এ ঘোষণাপত্র জনগণের মাঝে আশা জাগাতে সক্ষম হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান ও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার আইনি দলিল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত মাত্র তিনটি শব্দ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে যে, “বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম”। অর্থাৎ- গণবিমুখ ও নিপীড়নকামী পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর মডেল ছুঁড়ে ফেলে যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নির্ণয় করা হয়েছে- বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। এই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা। এই চেতনার সফল ও সার্থক বাস্তবায়ন হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সেই দলিল গড়ে উঠার ইতিহাস আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বাংলাদেশের সংবিধান মূলত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ও বাস্তবায়নের পথ নির্দেশক সুবিস্তৃত দলিল।

পরে তা ১০ এপ্রিল রাতে স্বাধীনতার এই ঘোষণা আকাশবাণীর একটি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এ ঘোষণার পরপরই মুক্তিযুদ্ধ একটি নতুন মাত্রা পায়। মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে গতিশীল হয়ে ওঠে, মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হন। কতোটা উৎসাহিত হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা তা মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের লেখায় বোঝা যায়। তিনি লেখেন, ‘এই ঘোষণা সর্বস্তরের মানুষ শুনতে না পেলেও আমাদের মনোবল বেড়ে যায় প্রচণ্ড রকম। এই ঘোষণা শোনার পর আমাদের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঐ সময় আমরা যে কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম তা আজও প্রকাশ করতে পারবো না। মনে হয়েছিলো ওই মুহূর্ত থেকেই প্রকৃত অর্থে আমি একজন বাঙালি, একজন স্বাধীন নাগরিক। আমার প্রাণপ্রিয় দেশটির নাম বাংলাদেশ।

নিম্নে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ দেয়া হলো:

মুজিবনগর, বাংলাদেশ

তারিখ: ১০ এপ্রিল ১৯৭১

যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং

যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল; এবং

যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের  ৩ মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহবান করেন; এবং

যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং

যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং

যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখন্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান; এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যা এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনা দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করে তুলেছে; এবং যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;

সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি;

এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্ণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং তাঁর কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।

বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব।

আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম।

স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী